তিনি আমাদের দেশের অন্যতম প্রধান চিত্রশিল্পী। এর বাইরেও তার রয়েছে নানা পরিচয়। তিনি একাধারে মহান ভাষাসংগ্রামী, মুক্তিযোদ্ধা, গল্পকার, কবি, গবেষক, সমালোচক, মুদ্রা সংগ্রাহক, প্রাবন্ধিক। জন্মেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রমনা এলাকায় ১৯৩২ সালের ১৭ আগস্টে। পিতা উপমহাদেশের প্রখ্যাত জ্ঞানতাপস ভাষাবিদ পণ্ডিত মুহম্মদ শহীদুল্লাহ।
বিখ্যাত পিতার ছেলে হিসেবে অনেক চড়াই উৎরাইয়ের ভেতর দিয়ে জীবনকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন। ভাষা আন্দোলনের সূচনা থেকে এর সফল সমাপ্তি পর্যন্ত তিনি ছিলেন এর অগ্রভাগে। গবেষকরা তাকে ভাষা আন্দোলনের সম্মুখসারির একজন রাজসাক্ষী হিসেবেও অভিহিত করেন। বিচিত্র জীবনযাপন, শিল্পের প্রতি নিঃসীম দায়বদ্ধতা তাঁকে আর দশজনের চেয়ে করেছে স্বতন্ত্র। দৃঢ়চেতা, স্পষ্টভাষী আর প্রতিবাদী হিসেবে মুর্তজা বশীরের তুলনা তিনি নিজেই। ফলে সুবিধাবাদীদের দলে তিনি কখনোই ছিলেন না। নিজে একাই নিজের দলে থেকেছেন। অন্যদের মতো কখনো দলবাজি করেন নি- কোনো গোষ্ঠীর কাছে নিজেকে বন্ধক রাখেন নি কখনো। সারাজীবন একাগ্রচিত্তে নিজের কাজটাই করেছেন।

১৯৪৯ সালে তিনি ঢাকা আর্ট ইনস্টিটিউটের দ্বিতীয় ব্যাচের ছাত্র হিসেবে ভর্তি হয়েছিলেন। তার সহপাঠী ছিলেন কাইয়ূম চৌধুরী, রশীদ চৌধুরী, আবদুর রাজ্জাক, আমিনুল ইসলাম। পরের বছর ছাত্র হিসেবে এসেছিলেন বিজন চৌধুরী, প্রাণেশ কুমার মণ্ডলসহ আরো অনেকে। জীবনের শুরু থেকেই মুর্তজা বশীর একটা বিষয় মেনে চলতেন তা হলো, বিখ্যাত বাবার ছেলে হিসেবে তিনি কখনই নিজেকে প্রকাশ করতে চাইতেন না। কালক্রমে তিনি নিজেও চিত্রশিল্পী হিসেবে দেশে-বিদেশে শিল্প সমালোচকদের কাছে স্বতন্ত্র ও বিশিষ্ট হয়ে উঠেছেন। তিনি তার সৃষ্টিতে নিরন্তর নতুন নতুন বিষয় ও ফর্ম তৈরি করে শিল্পবোদ্ধাদের কাছে হয়ে উঠেছেন দশজনের চেয়ে আলাদা। শিল্পকলার পাশাপাশি মৌলিক রচনায়ও তার মুনশিয়ানার পরিচয় মেলে।
এ সাক্ষাৎকার নেয়া হয় ২০১৬ সালের ১৬ আগস্ট বিকেলে শিল্পী মুর্তজা বশীরের ফার্মগেটের মনিপুরি পাড়ার বাসায় তার শয়নকক্ষে।
শিল্পী মুর্তজা বশীরের ৮৫ তম জন্মদিনে নেয়া সাক্ষাৎকারের উল্লেখযোগ্য অংশ পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো।
প্রশ্ন: সৃজনশীল মানুষের একটা বৈশিষ্ট্য থাকবে এটাই তো স্বাভাবিক। কিন্তু আপনি এর বিরুদ্ধে। এর কারণ কী?
মুর্তজা বশীর: দেখুন, আমার এই ব্যাপারটা নিয়ে আমার সঙ্গে ইতিপূর্বে অনেকের অনেক রকমের বিতর্ক হয়েছে। তারা আমাকে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রকমের যুক্তি দিয়ে বোঝানোর বা বলার চেষ্টা করেছে যে, তোমার এই বিষয়টি ঠিক না। আমি তখন তাদের আমার নিজস্ব যুক্তি দিয়ে বলেছি, তোমরা তোমাদের ভুল-ভাল যুক্তি আর ব্যাখ্যায় থাক, আমি ওসবে নেই। সৃজনশীল মানুষ তার নিজস্বতা দিয়ে, একাগ্রতা দিয়ে নিত্যনতুন ভাবনা-চিন্তার সঙ্গে সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করবেন আর তিনি যদি তা না করে একই বৃত্তে, একই ফর্মেটে ঘুরপাক খেতে থাকেন তাহলে তার সৃজনশীলতার পরিধি নিয়ে সন্দেহ দেখা দেয়।
প্রশ্ন: সাম্প্রতিককালে একটি প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। কিছু কবি, লেখক, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী তারা প্রকাশ্যে রাজনৈতিক দলের লেজুড়বৃত্তি করছেন। সম্মাননা, পদকপ্রাপ্তি, সংবর্ধনার জন্য তারা বিভিন্ন ধরনের দলবাজি করছেন। এসব প্রবণতা শিল্পসাহিত্যের ক্ষেত্রে কতটুকু প্রভাব ফেলবে বলে মনে করেন?
মুর্তজা বশীর: ব্যক্তিগতভাবে আমি এসব দলাদলিকে প্রচণ্ড ঘৃণা করি। ওসব দলাদলির মধ্যে আমি নেই। একজন শিল্পী কেন দলাদলির মধ্যে নিজেকে যুক্ত করবেন তা আমার মাথায় ঢোকে না। তারপরও গত ৫০-৫৫ বছরে শিল্পচর্চার ক্ষেত্রে এসব রাজনীতি-দলাদলি তো আর কম দেখলাম না। অনেক দেখেছি। এখনো দেখছি তবে সবাই দলাদলি করছেন আমি সে কথা বলব না। অনেককে আমি এসব দলাদলি করতে দেখি। ক্ষুদ্র প্রাপ্তিযোগের আশায় দলাদলিতে নির্বিঘ্নে নিমজ্জিত এসব সৃজনশীল মানুষকে দেখে আমার খুব অবাক লাগে। কখনো কখনো প্রাপ্তিযোগের আশায় তাদের ঐসব দীনতা দেখে লজ্জিত হই।

শিল্প সাহিত্যে রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তির ব্যাপারটা সব সময়ই ছিল। আপনি যে বলছেন সাম্প্রতিক সময়ে তার প্রবণতা বেশি দেখা যাচ্ছে আমি তারও কোনো খোঁজখবর রাখি না। এসব খোঁজখবর রাখতে আমার ভালোও লাগে না। তবে একটা কথা আমি বেশ গুরুত্ব দিয়ে বলি, যারা শিল্প-সাহিত্যে রাজনীতিনির্ভর তারা কখনো বেশিদিন টিকে থাকতে পারবেন না। পারেনও না। আমি আমার এই ৮৫ বছরের জীবনে এতটুকু বুঝেছি, আমি মুর্তজা বশীর দেশের- আমি কোনো গোষ্ঠীর না, কোনো দলের না।
প্রশ্ন: বাবা-মা আপনার নাম রেখেছিলেন আবুল খায়ের মুর্তজা বশীরুল্লাহ। তো সেই নাম পাল্টে ফেলে কীভাবে আপনি হয়ে গেলেন মুর্তজা বশীর!
মুর্তজা বশীর: ঊনপঞ্চাশ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষা শেষে ঢাকায় ফিরে আমরা মাহুতটুলীতে ভাড়া বাসায় উঠি। আমার বাবা তখন আজিজুল হক কলেজ ছেড়ে ১৯৪৮ সালে পুনরায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সুপার নিউমারি অধ্যাপক হিসেবে যোগ দিয়েছেন। পরে আমরা মাহুতটুলীর বাসা ছেড়ে বেগমবাজারের বাসায় উঠি। আমার বাবার লাইব্রেরিঘরটা ছিল রাস্তার ওপরেই। যদিও ভেতরে আরেকটি বড় ঘরে তার বইপত্র, পড়ার টেবিল ছিল তা সত্ত্বেও তিনি এই ঘরে বসতেন। বাবার কাছে লোকজন এলে তিনি সেখানে তাদের সাথে দেখা করতেন।
একদিন আমি বাবার সামনে দাঁড়িয়েছিলাম। এমন সময় পিয়ন এলো। বাবার কাছে প্রায় প্রতিদিনই বিভিন্ন জায়গা থেকে অনেক চিঠি আসে। তিনি চিঠিগুলো পিয়নের কাছ থেকে বুঝে নেন। পিয়ন যখন একটার পর একটা চিঠি বাবার হাতে তুলে দিতে থাকেন তখন বাবা প্রতিটি চিঠির গায়ে লেখা প্রেরক- প্রাপকের নাম খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেন। এরপর পিয়ন যখন একটা চিঠি বাবার হাতে দিলেন বাবা তখন চিঠির গায়ে লেখা প্রাপকের নাম দেখে চিনতে পারলেন না। বাবা বললেন, না, এই নামে আমার বাড়িতে কেউ থাকে না। পাশে দাঁড়ানো আমি উঁকি দিয়ে প্রাপকের নাম দেখে পিয়নের হাত থেকে চিঠিটা নিলাম। বগুড়া থেকে আমার এক সহপাঠী আমাকে চিঠিটি লিখেছে। আমিই তাকে এই নামে চিঠি পাঠাতে বলেছিলাম। আমি চিঠিটা পিয়নের কাছ থেকে নিয়ে বাবাকে বললাম, এটা আমার চিঠি।
আমার সমস্ত শিক্ষা সার্টিফিকেটে বাবার দেয়া নাম আবুল খায়ের মুর্তজা বশীরুল্লাহ। সঙ্গতকারণে চিঠির গায়ে ঐ নাম না দেখে অন্য নাম দেখে বাবার ঘোরতর সন্দেহ হলো। তিনি আমার দিকে বিস্ময়মাখা দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে বললেন, তুমি আবার কবে থেকে মুর্তজা বশীর হলে!
আমি বললাম, হ্যাঁ আমার নাম মুর্তজা বশীর। আমি আর আপনার নামে পরিচিতি হতে চাই না। এখন থেকে আমি আমার নামে পরিচিত হতে চাই।
১৯৫২ সাল পর্যন্ত মুর্তজা বানান লিখতে আমি ম-এর নিচে দীর্ঘ উকার দিতাম। বাবা কিছু না বলে আমার হাত থেকে চিঠিটা নিয়ে আমাকে বললেন, তুমি তোমার মূর্তজা নাম লিখতে মূর্খদের মতো দীর্ঘ উ-কার ব্যবহার করেছ কেন? এ রকম বানান তো লিখবে মূর্খরা। তুমি কী ওই দলে!
এভাবে আমি আবুল খায়ের মুর্তজা বশীরুল্লাহ থেকে হয়ে গেলাম মুর্তজা বশীর।

প্রশ্ন: আপনার একটি শিল্পকর্ম ডেড লেজার্ড দেখে আপনার বাবা আপনার প্রশংসা করতে গিয়ে বলেছিলেন, 'আধুনিক চিত্রের মতোই আমার ছেলে দুর্বোধ্য’- বাবার এই মূল্যায়নকে আপনি কীভাবে দেখেন।
মুর্তজা বশীর: প্রখ্যাত উর্দু কবি ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ আমাকে ১৯৫৯ সালের শেষে লাহোরে নিয়ে গিয়েছিলেন সেখানে প্রদর্শনী করার জন্য। তার সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল ৪৮ সালে লন্ডনে। আমি দু’বছর লাহোরে ছিলাম। ১৯৬১-র শেষে ঢাকায় ফিরে আসি। তখন বাংলা একাডেমিতে সমকালীন শিল্পীদের একটি প্রদর্শনীতে ডেড লেজার্ড শিরোনামে নামে একটি ছবি ছিল। ছবিটি আমি এঁকেছিলাম সমাজের অবক্ষয়ের রূপক হিসেবে। এ প্রদর্শনী বাবা দেখেছিলেন। এমনকি ইতালি থেকে ফিরে আসার পর ১৯৫৯ সালের মে মাসে আমি যখন করাচিতে একক প্রদর্শনী করি সে সময় করাচিতে আমার বাবাও অবস্থান করেছিলেন। তিনি উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন। একটি আমেরিকান সংস্থা এই প্রদর্শনীর আয়োজক তাই সেখানে কোমল পানীয় সঙ্গে ককটেল পরিবেশন করা হচ্ছিল। আমি কিছুটা শঙ্কিত হয়েছিলাম আমার বাবা এই মদ পরিবেশন কীভাবে গ্রহণ করবেন? কিন্তু দেখলাম এ ব্যাপারে তিনি সম্পূর্ণভাবে স্বাভাবিক ছিলেন।
ঢাকার এই প্রদর্শনী উপলক্ষে একটি আলোচনাসভা হয়। আধুনিক মানুষ ও আধুনিক চিত্রকলা। বক্তা ছিলেন একে ব্রোহী। তিনি আমার পিতাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, শহীদুল্লহ সাহেব, আপনার পুত্র তো একজন আধুনিক শিল্পী।
জবাবে বাবা বলেছিলেন, আধুনিক চিত্রের মতোই আমার পুত্র আমার কাছে দুর্বোধ্য।
প্রশ্ন: বাবা হিসেবে ডক্টর শহীদুল্লাহ'র কোন কথাটি এখনও আপনার মনে পড়ে বা আপনাকে ভাবিয়ে তোলে।
মুর্তজা বশীর: বাবা ১৯৪৩ শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসরের পর বগুড়ায় আজিজুল হক কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে যোগদান করেন। বগুড়া তখন ছোট এক ছিমছাম শহর। কলকাতার সাথে যোগাযোগ ছিল তাদের বেশি ফলে শিক্ষা ও সংস্কৃতির দিক থেকে তারা ছিল অনেক উন্নত। বগুড়াতে যখন যাই আমি ঢাকার নবকুমার ইনস্টিটিউট থেকে অষ্টম শ্রেণি পড়া শেষ করেছি। ১৯৪৬ সালে বগুড়ায় নবম শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছিলাম। পিতা খ্যাতিমান হওয়ার ফলে স্কুলের ছাত্র-শিক্ষকদের মধ্যে আমার একটি স্বতন্ত্র জায়গা তৈরি হয়েছিল। আমার নিজের মধ্যেও বেশ একটা ভাব ছিল। স্কুলে আমি অনেক দুষ্টুমি করতাম।
স্কুলে আমার নানারকম দুরন্তপনার নালিশ স্কুলের প্রধান শিক্ষক বাবু নরেন্দ্রমোহন চৌধুরীর কানে যায়। একদিন তিনি আমাকে ডেকে পাঠালেন। প্রধান শিক্ষকের ঘরে চেয়ারে বসেছিলেন সহকারী প্রধান শিক্ষক ও আমাদের অঙ্কের মাস্টার বাবু নরেন্দ্রমোহন ঢোল। তিনি আমাকে স্নেহ করতেন। আমি প্রধান শিক্ষকের সামনের টেবিলে দু’হাতে ভর দিয়ে দাঁড়ালাম। হেড মাস্টার রাগে ক্ষিপ্ত হয়ে গেলেন এবং আমাকে বললেন, ঠিক হয়ে দাঁড়াও।
আমি ঠিক বুঝতে পারছিলাম না আমার অন্যায়টা কি? তখন কিন্তু বুঝতে পারিনি হেড মাস্টারের টেবিলে দু’হাত রেখে দাঁড়ানোটা বেয়াদবি। নরেন্দ্রমোহন ঢোল আমাকে বললেন, বশির টেবিল থেকে হাত দুটো নামাও। তখনই আমি বুঝতে পারলাম আমার অন্যায়টা কি।
রাগত স্বরে হেডমাস্টার বললেন, আমি তোমার সম্পর্কে তোমার পিতার কাছে নালিশ করব। আমি তখন আমার অহমবোধ থেকে উত্তর দিলাম, আপনি হলেন হেড মাস্টার আর আমার পিতা হলেন অধ্যক্ষ। তার সামনে যাবার যোগ্যতা আপনার নেই।
তিনি বিস্মিত হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে থাকলেন। স্কুলের শিক্ষকদের কাছ থেকে বাবার কানে আমার দুরন্তপনার নালিশ আসত। একদিন বাবা আমাকে ডেকে নিয়ে বললেন, বশীর, তোমার ক্লাসের ইংরেজি গ্রামার বইয়ে তুমি পড়েছো না, প্রিন্সিপাল -প্রিনসিপল, এমিন্যান্ট -ইমিন্যান্ট, নটোরিয়াস অ্যান্ড ফেমাস। তারপর তিনি ইংরেজিতে গম্ভীর গলায় আমাকে বললেন, ইউ আর মাই সান আইদার নটোরিয়াস অর ফেমাস, ডোন্ট বি মিডিওকার।
প্রশ্ন: একটা দীর্ঘজীবন অতিক্রম করে এসেছেন। কত কিছু দেখেছেন। ভাষা আন্দোলনে সম্মুখ সারির যোদ্ধা ছিলেন আপনি। খুব কাছ থেকে দেখেছেন এই আন্দোলনকে। সেই সময়ের কোন ঘটনাকে আপনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়?
মুর্তজা বশীর: সৃষ্টিকর্তার কাছে হাজার শুকরিয়া, তিনি আমাকে দীর্ঘ জীবন দিয়েছেন। এই এক জীবনে তিনি আমাকে দিয়ে অনেক কিছু দেখিয়ে নিয়েছেন। এখন জীবনের ফেলে আসা পেছনের দিকে ফিরে তাকালে অনেক সুখময় ও দুঃখের স্মৃতি ভেসে ওঠে।
আমার জীবনে দুঃখের স্মৃতির চেয়ে আনন্দের স্মৃতির পাল্লাই বেশি। তবে সবচেয়ে বেশি যে স্মৃতি আমাকে এখনো মাঝে মাঝে তাড়িত করে তা হলো ভাষা আন্দোলন। আমি আমার চোখের সামনে দেখেছি ভাষা আন্দোলন কিভাবে শুরু হয়ে চূড়ান্ত জায়গায় গিয়েছে। আমি তার রাজসাক্ষী।
আমি ভাষা আন্দোলনের শুরু থেকে এর সাথে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলাম। আজও খুব স্পষ্টভাবে সবকিছু চোখের সামনে সেলুলয়েডের ফিতার মতো ভেসে ওঠে। আজও পরিস্কার দেখতে পাই, মিছিলের মধ্যে বরকতের শরীরে যখন গুলি লাগল তখন আমিও সেই মিছিলে তার কাছেই ছিলাম। গায়ে গুলি লাগার পরে বরকত অচেতন হয়ে লুটিয়ে পড়েছে। তার শরীর থেকে রক্তের ধারা বয়ে যাচ্ছে। বরকতের রক্তাক্ত শরীর দেখে আমরা হতবিহবল। কি করব বুঝতে পারছিলাম না। বরকতকে বাঁচাতে হবে তাই আমরা দেরি না করে বরকতের রক্তাক্ত দেহ কাঁধে-পিঠে করে দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজে নিয়ে যাই। এই যে তোমার সাথে যখন বরকতের কথা বলছি দেখো আমার ভেতরে একটা অন্য ধরনের অনুভূতি কাজ করছে- বলতে বলতে তিনি আনমনা হয়ে গেলেন।
বরকতকে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার দগদগে স্মৃতিটা আজও আমার কাছে জীবন্ত বলে মনে হয়। এখনও আমার মনে হয়, এই তো সেদিনের ঘটনা। আমার কাঁধে গুলি খাওয়া বরকতের রক্তাক্ত শরীর। আমি বরকতের রক্তাক্ত নিথর শরীর বয়ে নিয়ে ছুটে যাচ্ছি ঢাকা মেডিকেলের দিকে।