ঈদুল ফিতরের আগেই পরীক্ষামূলকভাবে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালুর ঘোষণা দিয়েছে বর্তমান সরকার। সচিবালয়ে বৈঠক শেষে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রী আব্দুল আউয়াল মিন্টু জানান, প্রথম পর্যায়ে হতদরিদ্র পরিবারগুলোকে এই কার্ড দেওয়া হবে এবং পর্যায়ক্রমে পাঁচ কোটি পরিবারকে আওতায় আনার লক্ষ্য রয়েছে। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই তথ্য নিশ্চিত করেছেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন এবং কৃষি, খাদ্য, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী আমিনুর উর রশিদ।
সরকারের পক্ষ থেকে এটি একটি নতুন সামাজিক সুরক্ষা উদ্যোগ হিসেবে তুলে ধরা হলেও, নীতিগতভাবে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ধারণাটি নতুন নয়। এর আগে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেই ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)-এর মাধ্যমে ‘স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ড’ চালু ও আংশিক বাস্তবায়ন করা হয়েছিল।
২০২৩ সালেই শুরু ‘স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ড’
২০২৩ সালের ৯ নভেম্বর সারা দেশে টিসিবির ‘স্মার্ট পরিবার কার্ড’ বিতরণ কার্যক্রম শুরু হয়। সে সময় বাণিজ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বে থাকা টিপু মুনশি রাজধানীর মালিবাগে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। টিসিবির তথ্য অনুযায়ী, এক কোটি নিম্ন আয়ের পরিবারকে এই কার্ডের আওতায় আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল।
কার্ডধারীরা প্রতি মাসে নির্ধারিত দামে চাল, সয়াবিন তেল, মসুর ডাল, চিনি ও পেঁয়াজ কিনতে পারতেন। উদাহরণ হিসেবে, প্রতি লিটার সয়াবিন তেল ১০০ টাকা, চাল ৩০ টাকা কেজি এবং মসুর ডাল ৬০ টাকা কেজি দামে বিক্রি করা হতো। বাজারদরের তুলনায় এসব পণ্যে উল্লেখযোগ্য ভর্তুকি ছিল।
টিসিবির পক্ষ থেকে জানানো হয়, স্মার্ট কার্ডে সিকিউরিটি হলোগ্রাম, কিউআর কোড ও কেন্দ্রীয় ডাটাবেজ সংযুক্ত থাকবে। একই পরিবারে একাধিক কার্ড রোধে এনআইডি ও মোবাইল নম্বর যাচাইয়ের ব্যবস্থাও রাখা হয়। কার্ড তৈরির দায়িত্বে ছিল স্পেকট্রাম সলিউশনস লিমিটেড।
‘গেম চেঞ্জার’ হিসেবে উপস্থাপন
২০২৩ সালের নভেম্বরে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান এই উদ্যোগকে ‘ওয়ান কার্ড, ওয়ান অ্যাপ্রোচ’ মডেলের অংশ হিসেবে তুলে ধরেন। তার ভাষায়, বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি এক প্ল্যাটফর্মে আনতে পারলে অপচয় ও দুর্নীতি কমবে।
টিসিবির চেয়ারম্যান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আরিফুল হাসান জানান, এক কোটি পরিবারের একটি কেন্দ্রীয় ডাটাবেজ তৈরি হলে অন্যান্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিও একই কার্ডের মাধ্যমে পরিচালনা করা সম্ভব হবে। অর্থনীতিবিদ ড. মাহফুজ কবিরও তখন মন্তব্য করেন, এটি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
ডিসেম্বর ২০২৩-এ রাজধানীর তেজগাঁওয়ে আরও ২০ লাখ পরিবারকে স্মার্ট কার্ড দেওয়ার কার্যক্রম উদ্বোধন করা হয়। লক্ষ্য ছিল ২০২৪ সালের জুনের মধ্যে এক কোটি পরিবারকে কার্ডের আওতায় আনা।
বর্তমান ঘোষণার প্রেক্ষাপট
বর্তমান সরকার ঈদের আগেই পরীক্ষামূলকভাবে ফ্যামিলি কার্ড চালুর কথা বলছে এবং পাঁচ কোটি পরিবারকে অন্তর্ভুক্ত করার লক্ষ্য ঘোষণা করেছে। তবে ২০২৩ সালের কর্মসূচিতে এক কোটি পরিবারকে কেন্দ্রীয় ডাটাবেজে অন্তর্ভুক্ত করার কাজ শুরু হয়েছিল এবং পণ্য বিতরণও চলছিল।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমান উদ্যোগটি যদি পূর্ববর্তী কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে সম্প্রসারণ হয়, তাহলে এটি একটি ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখা যেতে পারে। তবে যদি পুরো কাঠামো পরিবর্তন করে নতুনভাবে নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়, তাহলে সেটি আলাদা উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি নিয়ে রাজনৈতিক কৃতিত্বের প্রশ্ন প্রায়ই সামনে আসে। কিন্তু ভর্তুকিপ্রাপ্ত পণ্য বিতরণ ও কেন্দ্রীয় ডাটাবেজভিত্তিক কার্ড ব্যবস্থা—এই ধারণা বাংলাদেশে অন্তত ২০২৩ সাল থেকেই আংশিক বাস্তবায়নের পথে ছিল।
প্রশ্ন রয়ে গেল
বর্তমান সরকার যে পাঁচ কোটি পরিবারকে কার্ড দেওয়ার লক্ষ্য নিয়েছে, সেটি পূর্ববর্তী এক কোটি পরিবারের কাঠামোর সম্প্রসারণ কি না—এ বিষয়ে এখনো বিস্তারিত নীতিমালা প্রকাশ হয়নি। একই সঙ্গে, আগের ডাটাবেজ ও অবকাঠামো ব্যবহার করা হবে কি না, তাও স্পষ্ট নয়।
তবে নথিপত্র বলছে, ‘ফ্যামিলি কার্ড’ বা ‘স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ড’ ধারণাটি একেবারে নতুন নয়; বরং আগেই চালু হয়ে আংশিক বাস্তবায়ন হয়েছিল।