সর্বশেষ

পরিসংখ্যান ব্যুরো ও ইউনিসেফের জরিপ

অনূর্ধ্ব-৫ বছর বয়সী শিশুদের ৪১ শতাংশই জন্মনিবন্ধনের বাইরে

প্রকাশিত: ২১ নভেম্বর ২০২৫, ০৭:০০
অনূর্ধ্ব-৫ বছর বয়সী শিশুদের ৪১ শতাংশই জন্মনিবন্ধনের বাইরে

দেশে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে ৪১ শতাংশের জন্মনিবন্ধন নেই। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউনিসেফের যৌথ জরিপে দেখা গেছে, জাতীয়ভাবে জন্মনিবন্ধনের হার বর্তমানে ৫৯ শতাংশ, যা ২০১৯ সালে ছিল ৫৬ শতাংশ। কিছুটা অগ্রগতি হলেও এটি এখনো সর্বজনীন নিবন্ধনের লক্ষ্যের অনেক নিচে। সরকারের অঙ্গীকার অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে শতভাগ জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন নিশ্চিত করতে হবে।

 

জরিপে দেখা যায়, নবজাতক ও কম বয়সী শিশুদের নিবন্ধনের হার তুলনামূলক কম। ০-১১ মাস বয়সী শিশুদের মাত্র ৪৩ শতাংশের জন্মনিবন্ধন সম্পন্ন হয়। ১২-২৩ মাস বয়সে এ হার বেড়ে ৫৫ শতাংশ, ২৪-৩৫ মাসে ৬৩ শতাংশ এবং ৩৬-৪৭ মাসে ৬৫ শতাংশে পৌঁছায়। অর্থাৎ বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিবন্ধনের হার কিছুটা বাড়লেও জন্মের পরপরই নিবন্ধন নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।

 

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ও নিবন্ধন দপ্তরের মধ্যে কার্যকর সংযোগ না থাকায় জন্মের পর শিশুর নিবন্ধন নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। হাসপাতালে জন্ম নেওয়া শিশুদেরও খুব কম অংশের নিবন্ধন হয়। দেশে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন করতে পারে না; পরিবারকে আলাদা দপ্তরে গিয়ে নিবন্ধন করতে হয়। অথচ এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অনেক দেশে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষই নিবন্ধনের দায়িত্ব পালন করে, ফলে প্রায় শতভাগ সাফল্য অর্জন সম্ভব হয়েছে।  

 

নিবন্ধিত সব শিশুর জন্মসনদ নেই। জাতীয়ভাবে অনূর্ধ্ব-৫ বছর বয়সী নিবন্ধিত শিশুদের মধ্যে জন্মসনদ আছে মাত্র ৪৭ শতাংশের। অর্থাৎ প্রতি দুজন নিবন্ধিত শিশুর একজনের জন্মসনদ নেই।  

 

রাজশাহীতে জন্মনিবন্ধনের হার সবচেয়ে বেশি, ৭১ শতাংশ। এরপর সিলেট বিভাগে ৬৪ শতাংশ। ঢাকা বিভাগে হার সর্বনিম্ন, মাত্র ৫৩ শতাংশ। বরিশালে ৫৪, চট্টগ্রামে ৫৯, খুলনায় ৫৭, ময়মনসিংহে ৬০ এবং রংপুরে ৬২ শতাংশ শিশু নিবন্ধিত হয়েছে।  

 

মায়ের শিক্ষাগত যোগ্যতা ও আর্থসামাজিক অবস্থার ওপর নিবন্ধনের হার নির্ভর করছে। মাধ্যমিক বা তার বেশি শিক্ষিত মায়েদের শিশুদের মধ্যে নিবন্ধন হার বেশি। জরিপে দেখা যায়, প্রায় ৯০ শতাংশ অভিভাবক জানেন জন্মনিবন্ধন কীভাবে করতে হয়। কিন্তু ইউনিয়ন পরিষদে ঝামেলামুক্ত সেবা না পাওয়া, খরচ ও দারিদ্র্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। অধিকাংশ শিশু স্বাস্থ্যকেন্দ্রে জন্ম নিলেও সেখানে নিবন্ধন না হওয়ায় জন্মের সময়ই সনদ পাওয়ার সুযোগ হাতছাড়া হচ্ছে।  

 

চাঁদপুরের মতলব দক্ষিণ উপজেলার এক ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গোলাম মোস্তফা বলেন, তাদের কার্যালয়ে অভিভাবকরা সহজেই নিবন্ধন সম্পন্ন করতে পারেন। তবে সার্ভার সমস্যা বা কারিগরি ত্রুটি থাকলে বিলম্ব হয়। জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয় জানিয়েছে, প্রতিদিন গড়ে ৪০-৫০ হাজার জন্মনিবন্ধন সম্পন্ন হচ্ছে। তবে ভাসমান ও স্থায়ী ঠিকানাবিহীন পরিবারের শিশুদের নিবন্ধন এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।  

 

শিশুপল্লী প্লাসের কর্মকর্তা আব্দুর রব বলেন, জন্মনিবন্ধন গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটি এখনো সংস্কৃতিতে প্রতিষ্ঠা পায়নি। মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের আন্তরিকতার অভাব, দারিদ্র্য, খরচ, সেবা কেন্দ্রে পৌঁছার অসুবিধা এবং স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে নিবন্ধন প্রক্রিয়ার সংযোগ না থাকা—এসব কারণে জন্মনিবন্ধন পিছিয়ে আছে। ফলে শহরের ভাসমান শিশুরা প্রয়োজনীয় নথি ও স্থায়ী ঠিকানার অভাবে রাষ্ট্রীয় সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।  

 

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নির্বাহী কর্মকর্তা আক্তার উন্নেছা শিউলী বলেন, ঢাকায় অধিকাংশ মানুষ অস্থায়ীভাবে বসবাস করেন। জন্মনিবন্ধনের নিয়ম অনুযায়ী স্থায়ী ঠিকানায় নিবন্ধন করতে হয়। ফলে এখানে হার কম। তিনি জানান, অফিসে নারীদের উপস্থিতি কম হলেও তারা নারী-পুরুষ উভয়কেই সেবা দেন।  

 

রেজিস্ট্রার জেনারেল মো. যাহিদ হোসেন বলেন, ভাসমান জনগোষ্ঠীর নিবন্ধনের জন্য স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান ও উন্নয়ন সংস্থার সঙ্গে কাজ করা হচ্ছে। কর্মীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এ দায়িত্ব পালন করছে। তিনি জানান, স্কুলে ভর্তি হতে হলে জন্মসনদ বাধ্যতামূলক হওয়ায় আনুষ্ঠানিকভাবে স্কুলে যাওয়া সব শিশুর জন্মনিবন্ধন রয়েছে।  

 

দেশে জন্মনিবন্ধনের হার কিছুটা বাড়লেও এখনো ৪১ শতাংশ শিশু নিবন্ধনের বাইরে। জন্মসনদ না থাকায় তারা রাষ্ট্রীয় সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ২০৩০ সালের মধ্যে শতভাগ জন্মনিবন্ধন নিশ্চিত করতে হলে স্বাস্থ্যসেবা ও নিবন্ধন ব্যবস্থার মধ্যে কার্যকর সংযোগ স্থাপন, ভাসমান জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্তি এবং ইউনিয়ন পরিষদে ঝামেলামুক্ত সেবা নিশ্চিত করা জরুরি।

সব খবর