এবারের ঈদুল ফিতর ঘিরে প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পাচ্ছে পাঁচটি নতুন সিনেমা। বৈচিত্র্যময় গল্প, ভিন্নধর্মী নির্মাণ এবং তারকাবহুল উপস্থিতিতে সিনেমাগুলো নিয়ে দর্শকদের মধ্যে তৈরি হয়েছে আগ্রহ। সাহিত্যনির্ভর কাহিনি থেকে শুরু করে অ্যাকশন, থ্রিলার, নারীকেন্দ্রিক ড্রামা মিলিয়ে এবারের ঈদের চলচ্চিত্র বাজারে রয়েছে বৈচিত্র্যের ছাপ।
তবে মুক্তির কৌশলে দেখা যাচ্ছে স্পষ্ট বিভাজন—ঢাকাই সিনেমার শীর্ষ নায়ক শাকিব খানের ছবি সিঙ্গেল স্ক্রিনে আধিপত্য বিস্তার করছে, আর বাকি তিনটি সিনেমা ঝুঁকছে মাল্টিপ্লেক্স নির্ভরতায়।
শাকিব খানের ‘প্রিন্স’: প্রেক্ষাগৃহে সর্বাধিক দখল
নব্বই দশকের ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডকে কেন্দ্র করে নির্মিত ‘প্রিন্স: ওয়ানস আপন আ টাইম ইন ঢাকা’ সিনেমাটি এবারের ঈদের সবচেয়ে বড় রিলিজ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। পরিচালক আবু হায়াত মাহমুদের প্রথম সিনেমা এটি।

শাকিব খান অভিনীত এই অ্যাকশনধর্মী সিনেমায় গ্যাংস্টার চরিত্রে তার উপস্থিতি ইতোমধ্যেই দর্শকের মধ্যে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সিনেমাটিতে আরও অভিনয় করেছেন তাসনিয়া ফারিণ, জ্যোতির্ময়ী কুণ্ডু ও ভারতের অভিনেতা দিব্যেন্দু ভট্টাচার্য।
পরিবেশক সূত্রে জানা গেছে, সিনেমাটি প্রায় ১৩০টি প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পাচ্ছে, যা এবারের ঈদে সর্বোচ্চ। ‘এ’ ক্যাটাগরির এই সিনেমাটি মূলত প্রাপ্তবয়স্ক দর্শকদের জন্য নির্মিত।
‘রাক্ষস’: সহিংস প্রেমের গল্প
মেহেদী হাসান হৃদয় পরিচালিত ‘রাক্ষস’ সিনেমাটি অ্যাকশন ও সহিংসতায় ভরপুর এক ভিন্নধর্মী প্রেমের গল্প তুলে ধরছে। এতে অভিনয় করেছেন সিয়াম আহমেদ ও কলকাতার অভিনেত্রী সুস্মিতা চ্যাটার্জি।

প্রযোজকদের দাবি, দীর্ঘদিন পর ‘ক্রেজি লাভ স্টোরি’ ধাঁচের সিনেমা দেখতে পাবেন দর্শক। গান, অ্যাকশন ও নাটকীয়তার মিশেলে সিনেমাটি তরুণ দর্শকদের লক্ষ্য করে নির্মিত।
‘এ’ ক্যাটাগরির এই সিনেমাটিও প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য উন্মুক্ত।
মাল্টিপ্লেক্সে ভরসা: ‘দম’, ‘প্রেশার কুকার’ ও ‘বনলতা এক্সপ্রেস’
এবারের ঈদের একটি বড় প্রবণতা হলো মাল্টিপ্লেক্স নির্ভরতা। পাইরেসি রোধ, সঠিক আয়ের হিসাব এবং উন্নত প্রদর্শন ব্যবস্থার কারণে তিনটি সিনেমা প্রথম ধাপে শুধুমাত্র মাল্টিপ্লেক্সে মুক্তি পাচ্ছে।
‘দম’: বেঁচে ফেরার লড়াই
রেদোয়ান রনি পরিচালিত ‘দম’ সিনেমাটি একটি মানবিক ও আবেগঘন গল্প। এতে আফরান নিশো, পূজা চেরী ও চঞ্চল চৌধুরী অভিনয় করেছেন।

গল্পে দেখা যায়, অপহৃত এক ব্যক্তির বেঁচে ফেরার সংগ্রাম, শারীরিক নির্যাতন ও পরিবারের কাছে ফেরার আকুতি। সত্য ঘটনা অবলম্বনে নির্মিত এই সিনেমাটি দর্শকের আবেগ স্পর্শ করবে বলে আশা নির্মাতার।
‘ইউ’ গ্রেড পাওয়া এই সিনেমাটি সব বয়সী দর্শকের জন্য উপযোগী।
‘প্রেশার কুকার’: নগর জীবনের নারীর গল্প
রায়হান রাফী পরিচালিত ‘প্রেশার কুকার’ চার নারীর জীবনের সংগ্রামকে কেন্দ্র করে নির্মিত। শবনম বুবলী, নাজিফা তুষি, স্নিগ্ধা চৌধুরী ও মারিয়া শান্ত—এই চার অভিনেত্রীকে ঘিরে এগিয়েছে কাহিনি।

ঢাকার নাগরিক জীবনের চাপ, সামাজিক বৈষম্য এবং নারীর প্রতিদিনের লড়াইকে বাস্তবধর্মীভাবে তুলে ধরা হয়েছে সিনেমাটিতে।
নির্মাতা সিনেমাটিকে উৎসর্গ করেছেন প্রয়াত চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদকে। এটি ‘এ’ ক্যাটাগরির সিনেমা।
‘বনলতা এক্সপ্রেস’: সাহিত্য থেকে পর্দায়
তানিম নূর পরিচালিত ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ নির্মিত হয়েছে হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস ‘কিছুক্ষণ’ অবলম্বনে। ট্রেনযাত্রার মধ্যে বিভিন্ন মানুষের গল্প, সম্পর্ক, রাজনীতি ও আবেগের মিশ্রণে সাজানো হয়েছে সিনেমাটি।

মোশাররফ করিম, চঞ্চল চৌধুরী, জাকিয়া বারী মম, আজমেরী হক বাঁধনসহ বড় একটি অভিনয়শিল্পী দল এতে কাজ করেছেন।
‘ইউ’ গ্রেড পাওয়া এই সিনেমাটি সব বয়সী দর্শকের জন্য উন্মুক্ত এবং নির্মাতা একে ‘খাঁটি বাংলাদেশি’ গল্প হিসেবে তুলে ধরেছেন।
কেন বাড়ছে মাল্টিপ্লেক্স নির্ভরতা?
প্রযোজকদের মতে, পাইরেসি বড় একটি সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে মুক্তির কয়েকদিনের মধ্যেই সিনেমা অনলাইনে ছড়িয়ে পড়ে।
‘দম’ সিনেমার প্রযোজক শাহরিয়ার শাকিল জানিয়েছেন, সিঙ্গেল স্ক্রিনে নির্ভরযোগ্য বণ্টন ব্যবস্থা ও আধুনিক টিকিটিং না থাকায় তারা প্রাথমিকভাবে মাল্টিপ্লেক্সে মুক্তির সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
একই মত দিয়েছেন ‘বনলতা এক্সপ্রেস’-এর নির্মাতা তানিম নূর। তার মতে, ধীরে ধীরে মুক্তি দিয়ে দর্শক টানাই এখন নিরাপদ কৌশল।
দর্শক প্রত্যাশা ও সম্ভাবনা
প্রদর্শক ও হল মালিকরা এবারের ঈদ নিয়ে আশাবাদী। দীর্ঘদিন পর অনেক বন্ধ প্রেক্ষাগৃহ আবার চালু হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ‘প্রিন্স’ ও ‘রাক্ষস’ শুরুতে বেশি দর্শক টানতে পারে, তবে ‘দম’, ‘প্রেশার কুকার’ ও ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ ধীরে ধীরে দর্শক বাড়াবে—অর্থাৎ এগুলো ‘লং রেসের’ সিনেমা হতে পারে।
সব মিলিয়ে, বৈচিত্র্যময় কনটেন্ট ও নতুন কৌশলের কারণে এবারের ঈদের সিনেমা বাজারে ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে।