বাংলাদেশের শৈল্পিক ধারার চলচ্চিত্রের অন্যতম অগ্রগণ্য অভিনেত্রী, বাংলা চলচ্চিত্রের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র জয়শ্রী কবির গত ১২ জানুয়ারি ২০২৬ লন্ডনের এসেক্সে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৩ বছর। দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ ছিলেন তিনি। তাঁর প্রয়াণে চলচ্চিত্রাঙ্গনে নেমে এসেছে গভীর শোক।
জয়শ্রী কবিরের জন্ম ১৯৫২ সালের ২২ জুন কলকাতায়। তাঁর বাবা অমলেন্দু দাশগুপ্ত। পারিবারিকভাবে তাঁদের আদি নিবাস বাংলাদেশের চট্টগ্রাম জেলার রাউজান উপজেলার নোয়াপাড়া গ্রামে। কলকাতার সাউথ পয়েন্ট স্কুলে পড়াশোনার সময় ১৯৬৮ সালে তিনি মিস ক্যালকাটা উপাধি অর্জন করেন। এরপর ১৯৭০ সালে সত্যজিৎ রায় পরিচালিত ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে বড় পর্দায় তাঁর অভিষেক ঘটে। এই ছবিতে তাঁর অভিনয় দর্শক ও সমালোচকদের প্রশংসা কুড়ায় এবং বাংলা চলচ্চিত্রে তাঁর যাত্রা শুরু হয় এক অনন্য উচ্চতায়।

চলচ্চিত্র জীবনের শুরুতে তাঁর প্রথম স্বামী ছিলেন প্রবীর রায়। এই সংসারে তাঁদের একজন কন্যাসন্তান রয়েছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর, ১৯৭৫ সালে আলমগীর কবির পরিচালিত ‘সূর্যকন্যা’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের সূত্রে তিনি বাংলাদেশে আসেন। পরবর্তীতে আলমগীর কবিরের সঙ্গে তাঁর বিবাহ হয়।
এরপর তিনি বাংলাদেশে নিয়মিত অভিনয় শুরু করেন এবং এক দশকেরও বেশি সময় ধরে শৈল্পিক ও মানসম্মত চলচ্চিত্রে অভিনয় করে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। তাঁদের সংসারে লেনিন কবির সৌরভ নামে একজন পুত্রসন্তান রয়েছে, যিনি বর্তমানে সিঙ্গাপুরে একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে কর্মরত।

জয়শ্রী কবিরের উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’, ‘সব্যসাচী’, ‘সূর্যকন্যা’, ‘সীমানা পেরিয়ে’, ‘রূপালী সৈকতে’, ‘মোহনা’, ‘পুরস্কার’ ও ‘দেনা পাওনা’। দুই বাংলায় মিলিয়ে তিনি প্রায় ৪০টি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। ব্রিটিশ ফিল্ম ইনস্টিটিউট (বিএফআই) বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা ছবির তালিকায় তাঁর অভিনীত একাধিক চলচ্চিত্র অন্তর্ভুক্ত করেছে।
তাঁর অভিনয় ছিল সংযত, আবেগঘন এবং চরিত্রের গভীরতা অন্বেষণকারী। তিনি বাণিজ্যিক সাফল্যের চেয়ে শিল্পমানকে প্রাধান্য দিয়েছেন, যা তাঁকে সময়ের অন্য অভিনেত্রীদের থেকে আলাদা করে তুলেছে।
১৯৮৯ সালে আলমগীর কবিরের সঙ্গে বিবাহ বিচ্ছেদের পর তিনি প্রথমে কলকাতায় এবং পরে স্থায়ীভাবে লন্ডনে বসবাস শুরু করেন। সেখানে কিছুদিন বিবিসি বাংলায় কাজ করার পর একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্যের শিক্ষকতা করেন। অভিনয় ও শিক্ষাজীবনের এই দ্বৈত পরিচয় তাঁর জীবনকে করেছে বহুমাত্রিক ও সমৃদ্ধ।

জয়শ্রী কবিরের প্রয়াণে ফেডারেশন অব ফিল্ম সোসাইটিজ অব বাংলাদেশ গভীর শোক প্রকাশ করে জানায়, “তিনি আমাদের অত্যন্ত নিকটজন ছিলেন। তাঁর অবদান বাংলা চলচ্চিত্রে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।”
তাঁর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করে ভাগ্নে জাভেদ মাহমুদ জানান, “লন্ডনে দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ ছিলেন তিনি। তাঁর প্রয়াণ আমাদের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি।”
বাংলা চলচ্চিত্রে জয়শ্রী কবিরের অবদান, তাঁর অভিনয়শৈলী ও সাংস্কৃতিক অবস্থান নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে। তাঁর স্মৃতি, কাজ ও আদর্শ বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে চিরকাল অম্লান থাকবে।