বাংলাদেশি চলচ্চিত্রের সোনালি অধ্যায়ের জনপ্রিয় নায়ক ও নৃত্য পরিচালক ইলিয়াস জাভেদ মারণব্যধি ক্যান্সারের কাছে হার মেনে বুধবার (২১ জানুয়ারি) চলে গেছেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮২ বছর। তাঁর প্রয়াণে দেশের চলচ্চিত্র অঙ্গনে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া।
বুধবার সন্ধ্যা ৬টা ৩৫ মিনিটে রাজধানীর উত্তরার ১২ নম্বর সেক্টরের একটি কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়। শিল্পী সমিতির কার্যনির্বাহী সদস্য ও অভিনেতা সনি রহমান জানান, প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয় এফডিসিতে। সেখানে সহশিল্পী ও ভক্তদের শ্রদ্ধা নিবেদনের পর উত্তরা ১৪ নম্বর সেক্টরের একটি মসজিদে দ্বিতীয় জানাজা হয়। পরে তাঁকে ১২ নম্বর সেক্টরের কবরস্থানে সমাহিত করা হয়।
চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির সভাপতি ও অভিনেতা মিশা সওদাগর জানান, জাভেদ দীর্ঘদিন ধরেই ক্যানসারে আক্রান্ত ছিলেন। ২০২০ সাল থেকে তিনি গুরুতর অসুস্থতায় ভুগছিলেন এবং এর আগে একবার স্ট্রোকও করেছিলেন। বাসায় নার্স রেখে চিকিৎসা চলছিল। বুধবার সকালে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হয়, সেখানে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

নৃত্য পরিচালক থেকে নায়ক হয়ে ওঠা
নায়ক জাভেদের আসল নাম রাজা মোহাম্মদ ইলিয়াস। তিনি ১৯৪৪ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের পেশাওয়ারে জন্মগ্রহণ করেন। পরে পরিবারসহ পাঞ্জাবে বসবাস শুরু করেন। ষাটের দশকে চলচ্চিত্রাঙ্গনে তাঁর যাত্রা শুরু হয় নৃত্য পরিচালক হিসেবে। কায়সার পাশার পরিচালনায় উর্দু ছবি ‘মালান’-এ প্রথম নৃত্য পরিচালনার কাজ করেন তিনি।
১৯৬৪ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত উর্দু ভাষার চলচ্চিত্র ‘নয়ি জিন্দেগি’ দিয়ে নায়ক হিসেবে তাঁর অভিনয়জীবনের সূচনা। ১৯৬৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘পায়েল’ সিনেমার মাধ্যমে তিনি দর্শকের নজর কাড়েন। এই ছবিতে তাঁর বিপরীতে অভিনয় করেন শাবানা।
১৯৭০ থেকে ১৯৮৯—প্রায় দুই দশক জাভেদ ছিলেন ঢাকাই সিনেমার জনপ্রিয় নায়কদের একজন। তিনি দুই শতাধিক চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য ছবির মধ্যে রয়েছে ‘মালকা বানু’, ‘অনেক দিন আগে’, ‘শাহজাদী’, ‘নিশান’, ‘রাজকুমারী চন্দ্রবান’, ‘কাজল রেখা’, ‘সাহেব বিবি’ প্রভৃতি। বিশেষ করে ‘নিশান’ চলচ্চিত্রে তাঁর অভিনয় তাঁকে আলাদা পরিচিতি এনে দেয়।

নাচে নতুন ভাষা ও ধারার প্রবর্তক
নায়ক হিসেবে জনপ্রিয়তার পাশাপাশি জাভেদের সবচেয়ে বড় অবদান ছিল বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে নাচের আধুনিক ধারার সূচনা। সে সময় সিনেমার নাচ ছিল সীমিত ভঙ্গি ও সহজ অভিব্যক্তিনির্ভর। এই গণ্ডি ভেঙে নাচে গতি, ছন্দ ও নান্দনিকতা যোগ করেন জাভেদ।
নৃত্যে দক্ষতা বাড়াতে তিনি মুম্বাই গিয়ে কিংবদন্তি নৃত্যগুরু সাধু মহারাজ ও শম্ভু মহারাজের কাছে শাস্ত্রীয় ও আধুনিক নাচের তালিম নেন। তাঁর সহপাঠী ছিলেন প্রখ্যাত কোরিওগ্রাফার প্রয়াত সরোজ খান, যিনি জাভেদকে ‘গুরুভাই’ বলে সম্বোধন করতেন।
দেশে ফিরে তিনি অভিনয়ের পাশাপাশি নৃত্য পরিচালনায় পুরোপুরি মনোযোগ দেন। তাঁর কোরিওগ্রাফিতে সিনেমার গানগুলো হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত ও দর্শকপ্রিয়। ফোক নাচ থেকে আধুনিক শহুরে নাচ-সব ক্ষেত্রেই তিনি নতুনত্ব আনেন।
কবরী, শাবানা, ববিতা, রোজিনা, অঞ্জু ঘোষসহ প্রথম সারির প্রায় সব নায়িকাই তাঁর নির্দেশনায় নাচে দর্শক মাতিয়েছেন। নায়করাজ রাজ্জাক, আলমগীর, সোহেল রানা, ওয়াসিম, ফারুক, জাফর ইকবাল, ইলিয়াস কাঞ্চনসহ অসংখ্য নায়ক তাঁর কাছে নাচের তালিম নেন। এক সময় এফডিসিতে নাচ মানেই ছিল জাভেদের নাম।
সহশিল্পীদের স্মৃতিচারণ
জাভেদের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন অভিনেতা ও প্রযোজক সোহেল রানা। তিনি বলেন-জাভেদ আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। তিনি পাকিস্তানে জন্মালেও স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এই দেশ ও এখানকার মানুষকে তিনি প্রাণ দিয়ে ভালোবেসেছেন। গত ২০–৩০ বছরে বাংলাদেশের যত নৃত্য পরিচালক তৈরি হয়েছে, তাঁদের সবারই ওস্তাদ ছিলেন জাভেদ।
নিজের আক্ষেপের কথাও জানান সোহেল রানা-আমি নিজেও অসুস্থ থাকায় দীর্ঘদিন তাঁর বাসায় যাওয়া হয়নি। মাঝে মধ্যে ফোনে কথা হতো। তাঁকে হারানো আমার জন্য খুব কষ্টের।
ঢাকাই সিনেমার সুপারস্টার শাকিব খান ফেসবুকে শোক প্রকাশ করে লেখেন- চলে গেলেন চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি অভিনেতা ও নৃত্যপরিচালক, শ্রদ্ধেয় ইলিয়াস জাভেদ। তাঁর প্রয়াণে আমরা হারালাম শুধু একজন শিল্পীকে নয়, হারালাম একজন অভিভাবকতুল্য মানুষকেও।
অভিনেত্রী রুমানা ইসলাম মুক্তি লিখেছেন-বাংলাদেশ চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় নায়ক ও নৃত্য পরিচালক ইলিয়াস জাভেদ মামা আজ সকালে মৃত্যুবরণ করেছেন। ‘নিশান’সহ বহু সুপারহিট সিনেমায় তাঁর অভিনয় দর্শকের মনে চিরস্থায়ী ছাপ রেখে গেছে।
চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির সভাপতি মিশা সওদাগর জানান, জাভেদ দীর্ঘদিন ধরে ক্যানসারে আক্রান্ত ছিলেন এবং এর আগে একবার স্ট্রোকও করেছিলেন। ২০২০ সাল থেকেই তিনি গুরুতর অসুস্থতায় ভুগছিলেন।
এক যুগের বিদায়
নায়ক, নৃত্যশিল্পী ও নৃত্য পরিচালক-এই তিন পরিচয়েই ইলিয়াস জাভেদ ছিলেন এক সময়ের সুপারস্টার। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে নাচের যে আধুনিক ও পরিপূর্ণ ধারা তিনি নির্মাণ করেছিলেন, তা আজও অমলিন।
সোনালি দিনের এই শিল্পীর প্রয়াণে চলচ্চিত্রাঙ্গনে যে শূন্যতা তৈরি হলো, তা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। বাংলাদেশের সিনেমার ইতিহাসে ইলিয়াস জাভেদ থাকবেন এক উজ্জ্বল ও অবিস্মরণীয় নাম হয়ে।