সর্বশেষ

বছর শেষে বাংলাদেশ

বাংলাদেশের চলচ্চিত্র : আশা, অর্জন ও প্রশ্নের বছর

বিনোদন ডেস্ক বিডি ভয়েস
প্রকাশিত: ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৪:৩০
বাংলাদেশের চলচ্চিত্র : আশা, অর্জন ও প্রশ্নের বছর

২০২৫ সালে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র অঙ্গনে একাধিক ইতিবাচক খবর আলোচনায় আসে। ‘দেলুপি’, ‘রইদ’ ও ‘মাস্টার’-এই তিনটি বাংলাদেশি চলচ্চিত্র ইউরোপের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে জায়গা করে নেয়। বিষয়বস্তু ও নির্মাণভাষার কারণে সিনেমাগুলো সমালোচকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের সিনেমার উপস্থিতি নতুন করে দৃশ্যমান হয়। এটি প্রমাণ করে যে স্বল্প বাজেট ও সীমিত অবকাঠামোর মধ্যেও বাংলাদেশের নির্মাতারা বিশ্বমানের চলচ্চিত্রভাষা আয়ত্ত করতে সক্ষম হচ্ছেন।

 

একই সঙ্গে ঈদ ও বছরের অন্যান্য মৌসুম মিলিয়ে মুক্তির মিছিলে ছিল একাধিক ঢালিউড সিনেমা। গত কয়েক বছরে দর্শক ফেরার যে আভাস দেখা যাচ্ছিল, ২০২৫ সালে তা কিছুটা হলেও দৃঢ় হয়। তবে এই ইতিবাচক প্রবণতার পাশাপাশিই সরকারি অনুদানে নির্মিত চলচ্চিত্র নিয়ে বিতর্ক ও সমালোচনাও কম ছিল না যা একটি গণতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক পরিসরে স্বাভাবিক ও প্রয়োজনীয় বিতর্ক হিসেবেই বিবেচিত হওয়া উচিত।

 

 

২০২৪–২৫ অর্থবছরে সরকারি অনুদানের চলচ্চিত্র ঘিরে ব্যাপক প্রশ্ন ওঠে। ৩২টি চলচ্চিত্রে প্রায় ৯ কোটি টাকা অনুদান দেওয়া হলেও একদিনের তথাকথিত পিচে ৯৫ জনের সাক্ষাৎকার, অনুদান কমিটির একাধিক সদস্যের পদত্যাগ এবং অনুদানপ্রাপ্তদের পরিচয় ঘিরে স্বার্থের সংঘাতের অভিযোগ পুরো প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে। বিশেষ করে ‘মুক্তিযুদ্ধ ক্যাটাগরি’থেকে প্রকল্প বাদ পড়ার অভিযোগ এবং পদত্যাগ করা সদস্যদের অনুপস্থিতিতেই অনুদান প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার বিষয়টি আজও স্পষ্ট ব্যাখ্যার অপেক্ষায়।

 

এই প্রেক্ষাপটে ৪ জুলাই বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সংস্কার রোডম্যাপ এক বিবৃতিতে সরকারি চলচ্চিত্র অনুদান প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার দাবি জানায়। বিবৃতিতে বলা হয়, জনগণের করের টাকায় পরিচালিত এই প্রক্রিয়া অবশ্যই পক্ষপাতহীন হতে হবে। একই সঙ্গে জুরিবোর্ড ও বিভিন্ন কমিটিতে ‘আমলাদের আধিক্য’ থাকায় চলচ্চিত্র বোর্ড কার্যত সিদ্ধান্তহীন হয়ে পড়ছে-এমন অভিযোগও সামনে আসে। এই বিতর্ক স্পষ্ট করে দেয়, কেবল অর্থ বরাদ্দ নয়, নীতিগত সংস্কারই এখন সময়ের দাবি।

 

ব্যবসায়িক ও আলোচনার দিক থেকে ২০২৫ সালে যে পাঁচটি ঢালিউড সিনেমা সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছে, সেগুলো হলো-বরবাদ, জংলি, উৎসব, তাণ্ডব ও দাগি। সম্মিলিতভাবে এসব সিনেমা দেশের বাজার থেকে আনুমানিক ৬০ কোটির কাছাকাছি আয় করেছে। যদিও দেশে কার্যকর বক্স অফিস সিস্টেম না থাকায় প্রকৃত হিসাব আজও অস্পষ্ট। ‘বরবাদ’ দর্শক টেনেছে এর সামাজিক ক্ষোভ ও রাজনৈতিক ইঙ্গিতপূর্ণ গল্পের কারণে। ‘জংলি’ ঢালিউডের পরিচিত অ্যাকশন ফর্মুলার বাইরে গিয়ে ভিজ্যুয়াল স্কেলের ইঙ্গিত দেয়। ‘উৎসব’ শহুরে মধ্যবিত্ত দর্শকের সঙ্গে আবেগী সংযোগ তৈরি করে। ‘তাণ্ডব’ তারকানির্ভর উচ্চাভিলাষী প্রজেক্ট হলেও গল্পের গভীরতা নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়ে। আর ‘দাগি’ সমাজের প্রান্তিক মানুষের মনস্তত্ত্ব তুলে ধরে তুলনামূলক পরিণত নির্মাণের দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। এই পাঁচটি সিনেমাই দেখিয়ে দেয়—ঢালিউড এখনো শিল্প ও বাণিজ্যের ভারসাম্য খুঁজছে, তবে চেষ্টা থেমে নেই।

 

তবে এই আলোচনার আড়ালেই ২০২৫ সাল আরেকটি কঠিন বছর পার করেছে দেশীয় চলচ্চিত্র। রাজনৈতিক অস্থিরতা, দর্শক সংকট ও প্রেক্ষাগৃহের দুরাবস্থা নিয়ে কেটে গেছে বারোটি মাস। বিদায়ী বছরে প্রায় ৪৭টি সিনেমা মুক্তি পেলেও ব্যবসায়িক সাফল্য ঘুরপাক খেয়েছে মূলত দুই ঈদ কেন্দ্রিক চার–পাঁচটি সিনেমায়। সারাবছর তারকাবহুল উপস্থিতি ও নতুন মুখের আগমন থাকলেও সামগ্রিকভাবে হল মালিক, প্রযোজক ও শিল্পীদের বাস্তবতায় শোনা গেছে হতাশার গল্পই।

 

 

স্টার সিনেপ্লেক্সের তথ্যমতে, দর্শক ও টিকিট বিক্রির দিক থেকে বরবাদ, তাণ্ডব, উৎসব, দাগি ও জংলি-এই পাঁচটি সিনেমা তুলনামূলকভাবে এগিয়ে ছিল। পাশাপাশি দেলুপি, সাবা ও  বাড়ির নাম শাহানা বক্স অফিসে বড় সাফল্য না পেলেও নির্মাণশৈলী ও অভিনয়ের কারণে সমালোচকদের প্রশংসা কুড়িয়েছে।

 

তবু পরিচালকদের দৃষ্টিতে বছরটি আশাব্যঞ্জক নয়। পরিচালক সমিতির সভাপতি শাহীন সুমনের ভাষায়, “গত কয়েক বছর ধরেই একই সংকট ও স্থবিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বাংলা চলচ্চিত্র। বিক্ষিপ্ত সাফল্য হলেও সামগ্রিক চিত্র বদলায়নি”। তাঁর মতে, পর্যাপ্ত সিনেমা হলের অভাব, বড় বিনিয়োগে প্রযোজকদের অনীহা এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সুদৃষ্টির ঘাটতিই এই সংকটকে দীর্ঘস্থায়ী করছে।

 

এই ভগ্নদশার প্রভাব পড়েছে শিল্পীদের জীবনেও। কাজের সংকটে চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন অঙ্গনের একাধিক পরিচিত মুখ গত এক বছরে দেশের বাইরে পাড়ি জমিয়েছেন। চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মিশা সওদাগরের ভাষায়- “এখন সত্যি বলতে কাজ নেই। একজন শিল্পীর জীবন চালানোর জন্য যে পরিমাণ কাজ দরকার, তা পাওয়া যাচ্ছে না। দেশের বাইরে গেলে অন্তত  কোনো কাজ করে জীবন চালানো সম্ভব”।

 

সব মিলিয়ে ২০২৫ সাল ঢালিউডের জন্য এক দ্বৈত বাস্তবতার বছর। একদিকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও সীমিত পরিসরে দর্শক ফেরার ইঙ্গিত, অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণ, অবকাঠামো ও শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা। এই দুই প্রবণতার সংঘাত থেকেই হয়তো আগামী দিনের বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের নতুন পথরেখা নির্মিত হবে। যদি প্রশ্নগুলোর মুখোমুখি হওয়ার সাহস আমরা সত্যিই রাখি।

সব খবর

আরও পড়ুন

তারকা জীবনের বাইরে মেঠো পথ আর বাটা মশলার টান

সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল গ্রামবাংলার জয়া আহসান তারকা জীবনের বাইরে মেঠো পথ আর বাটা মশলার টান

ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে বিশ্ব সিনেমার মিলনমেলা

৯১ দেশের ২৪৫ সিনেমার প্রদর্শনী ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে বিশ্ব সিনেমার মিলনমেলা

ইরানি পরিচয়ের খোঁজে বাহরাম বেজাইয়ের ক্যামেরা

যিনি সিনেমাকে চিন্তার ভাষা বানিয়েছিলেন ইরানি পরিচয়ের খোঁজে বাহরাম বেজাইয়ের ক্যামেরা

থেমে থাকি না, নিরন্তর চেষ্টা করি: শাকিব খান

তারকা খবর থেমে থাকি না, নিরন্তর চেষ্টা করি: শাকিব খান

যৌন মুক্তির প্রতীক থেকে প্রাণী অধিকার আন্দোলনের মুখঃ এক বৈচিত্র্যময় জীবনের অবসান

ফরাসি সিনেমার আইকন ব্রিজিত বার্দোর চিরবিদায় যৌন মুক্তির প্রতীক থেকে প্রাণী অধিকার আন্দোলনের মুখঃ এক বৈচিত্র্যময় জীবনের অবসান

বড়দিনে দেখতে পারেন যে ১০ সিনেমা

বড়দিনে দেখতে পারেন যে ১০ সিনেমা

স্থবির এফডিসি যেন ভূতের আড্ডাখানা

স্থবির এফডিসি যেন ভূতের আড্ডাখানা

দেশপ্রেম, থ্রিল আর রণবীরের দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তন

ধুরন্ধর দেশপ্রেম, থ্রিল আর রণবীরের দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তন