১৯৫২ সালে কলকাতায় জন্ম নেওয়া জয়শ্রী কবিরের চলচ্চিত্রজীবনের সূচনা হয় ১৯৭০ সালে, বিশ্বনন্দিত নির্মাতা সত্যজিৎ রায়ের কালজয়ী চলচ্চিত্র ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’-তে অভিনয়ের মাধ্যমে। অতিনাটকীয়তা নয় বরং সংযত ও বাস্তবধর্মী অভিনয়ের মাধ্যমে তিনি চরিত্রকে জীবন্ত ও বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছিলেন। এটি কোনো সাধারণ সূচনা নয় বরং এক ধরনের নন্দনতাত্ত্বিক ঘোষণা।
১৯৭৬ সালে মহানায়ক উত্তম কুমারের বিপরীতে ‘অসাধারণ’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করে জয়শ্রী কবির বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। উত্তম কুমারের মতো প্রতিষ্ঠিত ও প্রভাবশালী অভিনেতার পাশে দাঁড়িয়েও তিনি নিজস্ব অভিনয়স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখতে পেরেছিলেন।

তবে তাঁর অভিনয়জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও স্মরণীয় অধ্যায়টি গড়ে ওঠে স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে। পরিচালক আলমগীর কবিরের সঙ্গে ‘সূর্য কন্যা’, ‘সীমানা পেরিয়ে’, ‘রূপালি সৈকতে’ ও ‘মোহনা’র মতো চলচ্চিত্রে কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে জয়শ্রী কবির বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে এক নতুন সংবেদনশীলতা যোগ করেন। বিশেষ করে ১৯৭৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘সূর্য কন্যা’ আজ বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক কালজয়ী নাম। এই চলচ্চিত্রে তাঁর অভিনয় ছিল আত্মপরিচয়, সামাজিক বাস্তবতা ও নারীর আত্মমর্যাদার গভীর প্রকাশ। গত বছর ছবিটির ৫০ বছর পূর্তি উদযাপন প্রমাণ করে যে-এই অভিনয় সময়ের কাছে হার মানেনি।

এই সময়েই বুলবুল আহমেদের সঙ্গে তাঁর জুটি দর্শকদের হৃদয় জয় করে নেয়। ‘সীমানা পেরিয়ে’, ‘পুরস্কার’ ও ‘রূপালি সৈকতে’-এই চলচ্চিত্রগুলো আজও দর্শকের স্মৃতিতে উজ্জ্বল। কারণ এই চলচ্চিত্রগুলোতে প্রেম ছিল চিৎকারমুখর নয়, সংলাপনির্ভরও নয় বরং মানবিক বোঝাপড়া, দ্বিধা ও নীরব আকর্ষণের ভেতর দিয়ে নির্মিত। এই জুটির সাফল্য আসলে অভিনয়ের সহজতা ও বাস্তবতার জয়।

জয়শ্রী কবিরের অভিনয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তাঁর মানবিক সংযম। তিনি চরিত্রকে রোমান্টিকীকরণ করেননি, আবার নাটকীয় করেও তোলেননি। তাঁর অভিনয়ে নারীরা কেবল প্রেমিকা বা ত্যাগের প্রতীক নয়; তাঁরা আত্মসচেতন, দ্বিধাগ্রস্ত, আত্মমর্যাদাসম্পন্ন মানুষ। তিনি চরিত্রকে কেবল অভিনয় করতেন না; চরিত্রের ভেতরে প্রবেশ করতেন। সাধারণ নারী, সংগ্রামী মানুষ কিংবা আত্মমর্যাদাসম্পন্ন নারীর ভূমিকায় তিনি ছিলেন সমানভাবে বিশ্বাসযোগ্য। তাঁর অভিনয়ে ধরা পড়ে একটি সময়, একটি সমাজ ও পরিবর্তনশীল শহরের নারীকণ্ঠ। মহান মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশের বদলে যাওয়া সমাজ, শহর ও মানসিকতার নারীকণ্ঠ তিনি নীরবে ধারণ করেছেন।

এত অল্প চলচ্চিত্রে অভিনয় করেও জয়শ্রী কবির আজও স্মরণীয়! কারণ, তিনি পরিমাণের রাজনীতিতে যাননি। তিনি জনপ্রিয়তার দৌঁড়ে নিজেকে ভাঙেননি। যে সময় বাংলা চলচ্চিত্রে অতিনাটকীয়তা, আবেগের প্রদর্শনী ও চটুলতার আধিপত্য ছিল, সেই সময় তিনি বেছে নিয়েছিলেন সংযম, নীরবতা ও চরিত্রের ভেতরে ঢুকে যাওয়ার কঠিন পথ। তাঁর প্রতিটি চরিত্র ছিল সময়ের সাক্ষ্য, সামাজিক বাস্তবতার প্রতিফলন।
জয়শ্রী কবির তাই কেবল একজন অভিনেত্রী নন; তিনি একটি মানদণ্ড। তিনি মনে করিয়ে দেন, অভিনয় আসলে দৃশ্যমান হওয়ার শিল্প নয়; অনুভবযোগ্য হওয়ার শিল্প। বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে তাঁর নাম তাই সংখ্যার কারণে নয়, গভীরতার কারণেই উচ্চারিত হবে। তিনি ছিলেন অল্প উপস্থিতির শিল্পী কিন্তু দীর্ঘ স্মৃতির অধিকারী। আর ঠিক এই কারণেই জয়শ্রী কবির সময় পেরিয়েও প্রাসঙ্গিক, প্রয়োজনীয় এবং অবিস্মরণীয়।