সর্বশেষ

চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের মুকুটহীন সম্রাট

প্রয়াণ দিবসে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র সংস্কৃতির নীরব স্থপতি মুহম্মদ খসরুকে স্মরণ

প্রকাশিত: ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২৩:০৭
বাংলাদেশের চলচ্চিত্র সংস্কৃতির নীরব স্থপতি মুহম্মদ খসরু—যিনি অর্ধশতাব্দী ধরে চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনকে প্রাণ দিয়েছেন, প্রজন্মের পর প্রজন্মকে বিশ্বসিনেমার সঙ্গে পরিচয় করিয়েছেন। খ্যাতি ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতির বাইরে থেকে তিনি গড়ে তুলেছেন রুচিমান দর্শক ও বিকল্পধারার নির্মাতা। তাঁর প্রয়াণ দিবসে জানাই গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি।
প্রয়াণ দিবসে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র সংস্কৃতির নীরব স্থপতি মুহম্মদ খসরুকে স্মরণ

১.

বাংলাদেশের চলচ্চিত্র আন্দোলনের পথিকৃৎ মুহম্মদ খসরু । মুহম্মদ খসরু, বাংলাদেশের চলচ্চিত্র আন্দালনের এক মুকুটহীন সম্রাট। আজীবন অন্যের জন্যই আলো জ্বালানোর সলতে ছিলেন। আমরা জীবনের কাছে কৃতজ্ঞ এই জন্য যে আমাদের প্রজন্ম আহমদ ছফা, মুহম্মদ খসরুর মতো সোনার মানুষদের দেখেছিল, কাছে পেয়েছিল। এক জীবনে শুধু একটি মাত্র বিষয়কে অবলম্বন করে হৃদয়ে ধারণ করে নিজেকে আত্মোৎসর্গ করতে পারে,নিষ্ঠায় ভালোবাসায়, মুহম্মদ খসরু বোধ করি তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। আমাদের অনেকের, যারা মেধা ও মননের গভীর অনুশীলনে ব্যাপৃত,কী সাহিত্য,কী চলচ্চিত্র ইত্যাদির মননমীল প্রসারে নিয়োজিত থাকা সত্ত্বেও একাধিক অঙ্গনে সুকৃতির ও স্বীকৃতির মোহবন্ধে নিবিষ্ট হয়,এমনকি পেশাগত বিষয়টি প্রধান হয়ে দাঁড়ায়, মুহম্মদ খসরুর ক্ষেত্রে তা হয়নি। মুহম্মদ খসরুর জন্মই হয়েছিলো যেন নির্মল চলচ্চিত্র আন্দোলনের পিতা রূপে। নির্মল চলচ্চিত্র আন্দোলনের সূচনা করে বহুমাত্রিক সৃজনশীল চলচ্চিত্র দর্শনের অপার আগ্রহ ও রুচিবোধ প্রজন্ম-প্রজন্মান্তরে বিস্তৃত করে দিতে পারেন তিনিই হতে পারেন একজন পিতৃতূল্য পথিকৃৎ। মুহম্মদ খসরু সেই কারণে চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের পথিকৃৎ-পিতা।

 

 

২.

বাংলাদেশের সুস্থধারার চলচ্চিত্র আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ মুহম্মদ খসরু। ২০১৯ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি মঙ্গলবার দুপুর ১২টায় রাজধানীর বারডেম হাসপাতালে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। আজ খসরু ভাই নেই। এই প্রজন্মের অনেকেই মুহম্মদ খসরুকে চেনে না। জীবিত খসরু মিডিয়ায় সাক্ষাৎকার দিয়ে কখনও নিজেকে চেনাতে চেষ্টা করেননি। তিনি অন্যের মুখে আলো ফেলেছেন, কিন্তু নিজের মুখে পড়া আলো থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রেখেছিলেন অত্যন্ত সুচিন্তিত সিদ্ধান্তেই। তিনি আলাদা। আলাদা মেজাজে, ক্ষ্যাপা স্বভাবের। তিনি সমাজের কাছে ‘অরুচিশীল’ খিস্তি-খেউর করেই অন্যের রুচিবোধ তৈরিতে রেখেছেন সবচেয়ে বড় অবদান। তিনি পদ,পদবী কিংবা খ্যাতির জন্য মাতাল হননি। অর্থ, বিত্ত, সামাজিক অবস্থানের জন্য কোনো ছড়ি ঘোরাননি। কাপড়-চোপড় বেশ-ভুষায় কখনও ‘বনিয়াদি’ ভাব আনার চেষ্টা করেননি। তিনি জানতেন যারা সত্যিকারের চলচ্চিত্রের মানুষ তারা তাকে খুঁজে নেবেন। হ্যাঁ, মুহম্মদ খসরু এদেশে সেই মানুষ যার হাতেই তৈরি হয়েছেন এদেশের অনেক খ্যাতিমান চলচ্চিত্রকার। তারেক মাসুদ একবার বলেছিলেন, ‘আমরা সবাই খসরু ভাইয়ের পকেট থেকে বের হয়েছি।’ মনে পড়ে ২০১১ সালে তারেক মাসুদের স্মরণ সভায় এক চলচ্চিত্রকার বলেছিলেন যে খসরু ভাই তাঁদের বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে হাত ধরে নিয়ে যেতেন চলচ্চিত্র দেখাতে। জার্মান কালচারাল সেন্টারে শুধু তাঁদের নিয়ে ক্ষান্ত হতেন না, দরজা ধরে দাঁড়িয়ে থেকে তাঁদের পাহারা দিতেন, যেন তারা সিনেমা শেষ হবার আগে বের না হতে পারে। এই রকম করেই খসরু ভাই বড় করেছেন আজকের খ্যাতিমান চলচ্চিত্র নির্মাতাদের অনেককেই।

 

৩.

মুহম্মদ খসরু ভারতের হুগলি জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পৈতৃক বাড়ি কেরানীগঞ্জের রুহিতপুরের মোহনপুর গ্রামে। তার বাবা হুগলী জুট মিলের কর্মকর্তা ছিলেন, সেই সূত্রে তারা থাকতেন হুগলীতে। কিন্তু সেখানে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার কারণে ৫০ দশ‌কে তার পরিবার ঢাকায় চলে আসে। সেই থেকে তিনি ঢাকায়। 

 

তিনি দীর্ঘ সময় চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বাইরে তাঁর পড়ালেখা ছিল অগাধ। কখনো লেখক, কখনো সম্পাদক, আবার কখনো দক্ষ সংগঠক হিসেবে তিনি ছিলেন নন্দিত। জীবনের বেশির ভাগ সময় নিভৃতচারী হিসেবেই কাটিয়েছেন তিনি।

 

 

৪.

মুহম্মদ খসরু চলচ্চিত্র বিষয়ক কালজয়ী পত্রিকা ‘ধ্রুপদি’ সম্পাদনা করতেন। চলচ্চিত্র মহলে সেটি ছিল সবচেয়ে গৃহীত ও নন্দিত পত্রিকা। তাঁর উদ্যোগে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সংসদের তত্ত্বাবধানে প্রতিষ্ঠিত হয় ফিল্ম স্টাডি সেন্টার। বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সংসদের আন্দোলনের ফলে প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ ফেডারেশন অব ফিল্ম সোসাইটিজ এবং জাতীয় ফিল্ম আর্কাইভ। এ প্রতিষ্ঠানগুলোর পেছনে তাঁর যথেষ্ট অবদান ছিল। মুহম্মদ খসরু বাংলাদেশ চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন ইনস্টিটিউটের প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করেন। তাঁকে নিয়ে কথাসাহিত্যিক শাহাদুজ্জামান ফিল্মফ্রিতে লিখেছেন, ‘মুহম্মদ খসরুকে যারা ব্যক্তিগতভাবে চেনেন, তারা জানেন যে মানুষ হিসেবে তিনি ক্ষেপাটে, রাগী, মুখে তাঁর অবিরাম খিস্তি। তাঁর সব রাগ, ক্ষোভ ওই চলচ্চিত্রকে ঘিরেই। এই মানুষ বেঁচে আছেন সংসার করার জন্য নয়, সম্পদ অর্জনের জন্য নয়, খ্যাতি কুড়াবার জন্য নয়, শুধু একটি শিল্পমাধ্যমকে ভালোবাসার এবং সেই ভালোবাসা অন্যের মধ্যে বিলিয়ে দেওয়ার জন্য।’

 

৫.

১৯৬৩ সালে ‘পাকিস্তান চলচ্চিত্র সংসদ’ প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম মুহম্মদ খসরু। সৎ, শুদ্ধ ও নির্মল চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন, সেগুলোর পঠন-পাঠনের মাধ্যমে আস্বাদন, অনুধাবন ও উপলব্ধি করা, আলোচনা-সমালোচনা করা, চলচ্চিত্র বিষয়ক পত্রিকা প্রকাশ ও প্রচার, সর্বোপরি সমঝদার ও রুচিমান দর্শক তৈরির যে সূত্রপাত হয়েছিল ১৯৬৩ সালে, মুহম্মদ খসরু গত ৫০ বছর সেই ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছিলেন। ‘পাকিস্তান চলচ্চিত্র সংসদ’ স্থাপনের সময় আরও ছিলেন আনোয়ারুল হক খান, বাহাউদ্দিন চৌধুরী, মোশাররফ হোসেন চৌধুরী, ওয়াহিদুল হক, আবদুস সবুর, সালাহ্উদ্দিন প্রমুখ। চলচ্চিত্র নিয়ে পত্র-পত্রিকায় গুরুগম্ভীর লেখালেখি ও গবেষণার ধারাবাহিকতা শুরু হয় ১৯৬৮ সালে। পাকিস্তান ফিল্ম সোসাইটি থেকে মুহম্মদ খসরুর সম্পাদিত চলচ্চিত্রের কাগজ ‘ধ্রুপদি’ যখন প্রকাশিত হতো, সেই সময়ে চলচ্চিত্রের পত্রিকা সম্পাদনা কিংবা প্রকাশ ছিল প্রায় অসম্ভব কাজ। তখন থেকে আজ পর্যন্ত ‘ধ্রুপদি’ দুই বাংলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রের কাগজের স্বীকৃতি পায়। মুহম্মদ খসরু চলচ্চিত্র বিষয়ক কালজয়ী পত্রিকা ‘ধ্রুপদী’র সম্পাদক হিসেবে চলচ্চিত্র মহলে খ্যাতিমান। বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের এই পথিকৃত প্রায় ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলচ্চিত্রের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তার উদ্যোগে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সংসদের তত্ত্বাবধানে প্রতিষ্ঠিত হয় ফিল্ম স্টাডি সেন্টার। মুহম্মদ খসরু বাংলাদেশ চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন ইন্সটিটিউটের প্রশিক্ষক হিসাবেও কাজ করেন।

 

 

৬.

মুহম্মদ খসরু চলচ্চিত্রের প্রতি আগ্রহী মানুষজনকে প্রচুর অনুপ্রেরণা দিতেন, বিভিন্ন চলচ্চিত্রের বিষয়াদি খিস্তিও করতেন। তবুও সিরিয়াস চল‌চ্চিত্রের বিষয়ে আগ্রহী মানুষজন তাকে ঘিরে তৎপর ছিল। চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের এই প্রবাদতুল্য মানুষটি উৎসাহিত করেছেন দেশের বর্তমান সময়ের খ্যাতনামা অনেক চলচ্চিকারদের যা চলচ্চিত্রকারদের মুখে মুখে কিংবা তাদের লেখায় পাওয়া যায়। অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন চলচ্চিত্রের ফেরিঅলা তারেক মাসুদও। এভাবে তিনি তার কর্মময় সময়ে হয়ে উঠেছিলেন যাপনে-চিন্তায় বহু মানুষের প্রেরণা। তাদের মধ্যে কেউ কেউ পরে চল‌চ্চিত্র সংসদ আন্দোলন থেকে আলাদা হয়ে নিজেদের মতো কাজ করেছেন, তাদের সবার নিজেদের সেই সিনেমা বানানোর চেষ্টা এখন ‘বিকল্পধারা’ হিসেবে পরিচিত। লেখক ও গেবেষক সাজেদুল আউয়ালের ‘কালি ও কলম’ পত্রিকায় ‘চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের পঞ্চাশ বছর: অর্জন ও অতৃপ্তি’ শীর্ষক লেখাটি পর্যালোচনা করলে বুঝা যায় মুহম্মদ খসরু কিভাবে ভাবতেন চলচ্চিত্র নিয়ে। চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের এই প্রবাদতুল্য মানুষটি উৎসাহিত করেছেন দেশের খ্যাতনামা অনেক চলচ্চিত্রকারদের। তারেক মাসুদ তাঁদের অন্যতম। 

 

৭.

চলচ্চিত্রকে মানুষের অধিকারের পক্ষে কাজে লাগাতে লেখালেখি করেছেন তিনি। তাঁর বইগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘বাংলাদেশের চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলন’, ‘বাংলাদেশে চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের ভূমিকা’, ‘সাক্ষাৎকার চতুষ্টয়’। ‘ধ্রুপদি’ ছাড়াও তিনি সম্পাদনা করেছেন ‘চলচ্চিত্রপত্র’, ‘ক্যামেরা যখন রাইফেল’, ‘সূর্যদীঘল বাড়ী’ বিশেষ সংখ্যা।

 

 

৮.

১৯৭৫ সালে ভারত-বাংলাদেশের যৌথ প্রযোজনার ‘পালঙ্ক’ ছবিটি নির্মাণের সময় মুহম্মদ খসরু ভারতীয় চলচ্চিত্রকার শ্রী রাজেন তরফদারের সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করেন। তার চলচ্চিত্র নির্মাণের স্বপ্ন দীর্ঘদিনের, হাসান আজিজুল হক রচিত গল্প ‘নামহীন গোত্রহীন’ অবলম্বনে একটি চিত্রনাট্যও তিনি তৈরি করেছিলেন, কিন্তু কোনো প্রযোজক পাননি। রাষ্ট্রীয় অনুদানের জন্য জমাও দিয়েছেন দুই বার, কিন্তু অনুদান মেলেনি। বাংলাদেশে চলচ্চিত্র সংস্কৃতির বিকাশে দীর্ঘ ৫০ বছর নিরবচ্ছিন্ন অবদানের জন্য মুহম্মদ খসরু ‘হীরালাল সেন’ আজীবন সম্মাননায় ভূষিত হন। এ ছাড়া বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে ‘সুবর্ণ জয়ন্তী পদক’ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চলচ্চিত্র সংসদ থেকে আজীবন সম্মাননা-২০১৭ দেওয়া হয় তাঁকে।

 

৯.

বাংলাদেশে সর্বপ্রথম স্বল্পদৈর্ঘ্য ছবি নির্মাণ শুরু করার পেছনেও তাঁর অবদান রয়েছে। এছাড়া তিনি ১৯৭০-এর দশকে বিখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক ঋত্বিক ঘটকের একটি সাক্ষাৎকার গ্রহণ করে তাঁর ‘ধ্রুপদী’ পত্রিকায় প্রকাশ করেন- যা সে সময় বেশ সাড়া ফেলেছিল। পরে উপমহাদেশের বিভিন্ন পত্রিকায় পুনর্মুদ্রিত হয়েছিল। মুহম্মদ খসরু ‘ধ্রুপদী’ নামে সিনেমার কাগজ সম্পাদনা করতেন। চলচ্চিত্র মহলে ‘ধ্রুপদী’কে বলা হয় বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র পত্রিকা। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তাঁর ভ্রমণকাহিনি ‘পায়ের তলায় সর্ষে’তে লিখেছেন মুহম্মদ খসরু আর ‘ধ্রুপদী’কে নিয়ে, ‘আমি চমৎকৃত হলাম বাংলাদেশ ফিল্ম সোসাইটি আন্দোলনের খানিকটা পরিচয় পেয়ে। ঢাকার একটি টিনচালের ঘরে মুহম্মদ খসরু নামে এক অতি উৎসাহী যুবক তার বন্ধুবান্ধবদের নিয়ে শুরু করেছিল এই আন্দোলন। বিদেশের শ্রেষ্ঠ দেখা বা না দেখা চলচ্চিত্রগুলির সঙ্গে বুদ্ধিজীবীদের পরিচয় করিয়ে দেওয়াই এদের উদ্দেশ্য ছিল। এখন চলচ্চিত্র আন্দোলনের অনেকগুলি সংস্থা হয়েছে। জেলায় জেলায় তা ছড়িয়ে পড়েছে। এই ফিল্ম সোসাইটির ছেলেরাই নতুন ছবি বানাবার স্বপ্ন দেখে। একদিন এদের কারুর হাত থেকেই বেরিয়ে আসবে বাংলাদেশর সার্থক চলচ্চিত্র। বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সংসদ থেকে ধ্রুপদী নামে একটি পত্রিকাও বেরোয়, যার সম্পাদক ওই মুহম্মদ খসরু। পত্রিকাটির রুচি, অঙ্গসজ্জা ও রচনাগুলির মান যথেষ্ট উঁচু।’ ‘ধ্রুপদি’ ছাড়াও তিনি সম্পাদনা করেছেন ‘চলচ্চিত্রপত্র’, ‘ক্যামেরা যখন রাইফেল’, ‘সূর্যদীঘল বাড়ী’ বিশেষ সংখ্যা।

 

 

১০.

জাগতিক কোনো মোহ তাঁকে বাঁধতে পারেনি। সম্পদ, খ্যাতি, পুরস্কার—৭৩ বছরের এক জীবনে একটা মুহূর্তের জন্যও এসব কিছুই টানেনি তাঁকে। একটা মানুষ এক জীবনের পুরোটাই উগরে দিয়ে গেলেন সিনেমা বয়ে বেড়ানোর কিছু মানুষ তৈরিতে। কেন? এর উত্তর দিয়ে কথাসাহিত্যিক শাহাদুজ্জামান ফিল্মফ্রিতে লিখেছিলেন, ‘মুহম্মদ খসরুকে যাঁরা ব্যক্তিগতভাবে চেনেন, তাঁরা জানেন যে মানুষ হিসেবে তিনি খ্যাপাটে, রাগী, মুখে তাঁর অবিরাম খিস্তি। তাঁর সব রাগ, ক্ষোভ ওই চলচ্চিত্রকে ঘিরেই। এই মানুষ বেঁচে আছেন সংসার করার জন্য নয়, সম্পদ অর্জনের জন্য নয়, খ্যাতি কুড়াবার জন্য নয়, শুধু একটি শিল্পমাধ্যমকে ভালোবাসার এবং সেই ভালোবাসা অন্যের মধ্যে বিলিয়ে দেওয়ার জন্য।’

 

১১.

সিনেমাকে ভালোবেসে একটা মানুষ বেঁচে থাকলেন। তারপর জীবনের স্বাভাবিক নিয়মে বেঁচে থাকা শেষে ২০১৯ সালের আজকের দিনে, মঙ্গলবারে দুপুর ১২টায় রাজধানীর বারডেম হাসপাতাল থেকে তিনি চলে গেলেন। তাঁর যে জীবন, সে জীবনকে বলা যেতে পারে একটা মোমবাতির মতো। অন্ধকারে যে জ্বলে জ্বলে ক্ষয়েছে আর চারপাশটা আলোকিত করেছে। মুহম্মদ খসরু কখনও তথাকথিত লাভের আশায় চলচ্চিত্রকে ভালোবাসেননি। অনুদান পাননি, রাষ্ট্রীয় কোনো পদক পাননি। তবুও তিনি আমাদের চলচ্চিত্র চর্চার ইতিহাসে অমর হয়ে থাকবেন। চলচ্চিত্র সংসদ কর্মী ও মুহম্মদ খসরুর সহচর কামরুল মিথুনের ভাষায় বলতে চাই, মুহম্মদ খসরু, অমরত্ব পোষা কুকুরের মতো যার পায়ে পায়ে চলে।

 

 

১২.

সুলতানা কামালের স্মৃতিচারণে…

 

মানবাধিকারকর্মী ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা সুলতানা কামাল ‘মুহম্মদ খসরুর চলে যাওয়া’ শিরোনামে শ্রদ্ধাঞ্জলি জানিয়ে লিখেছেন, উনিশে ফেব্রুয়ারি বেলা একটার দিকে আমি দোতলা থেকে নেমে আমাদের অফিস ঘরে যেতে আমার এক সাবেক সহকর্মী ডেইলি স্টার পত্রিকার বেশ পুরোনো একটা বিশেষ সংখ্যা এনে আমার হাতে দিল। সংখ্যাটির তারিখ ১ জুলাই ২০১১। আমার মা সুফিয়া কামালের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে প্রকাশিত। ভেতরে মায়ের নানা ছবির সঙ্গে পরিবারের সদস্যদেরও ছবি রয়েছে তাতে। একটি ছবি সুফিয়া কামালের পরিবারের নামে ছাপা হয়েছে। সেটা আমাদের বাড়িতেই তোলা। আমার মা-বাবার সঙ্গে সেই ছবিতে পরিবারের বলতে আছি আমরা দুই বোন আর বড় বোনের ছেলে। আছেন বন্ধু আবুল মোমেন। রয়েছেন যাঁর জন্য সে ছবিটা তোলা হয়েছিল—ভারতের (পুনা) বিখ্যাত চলচ্চিত্রবোদ্ধা সতীশ বাহাদুর আর এককালের সবার পরিচিত আর প্রিয় চলচ্চিত্রকর্মী মুহম্মদ খসরু। খসরু বহুদিন ধরে আমাদের জীবন থেকে উধাও। কত বছর কেটে গেছে নানা ভালো-মন্দে। খসরু আর আমাদের বর্তমান দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে নেই। নিজের গ্রামের বাড়িতে চলে গিয়ে সবার থেকে নিজেকে কেমন যেন আড়াল করে ফেলল ও । ছবির মানুষগুলোকে সহকর্মীদের চেনাতে গিয়ে খসরু প্রবলভাবে ফিরে এল মনের স্মৃতিপটে। কী আশ্চর্য! যখন সবকিছু ছেড়ে দিয়ে, সবাইকে পেছনে ফেলে না-ফেরার দেশে যাত্রা করল, তখনই এমনভাবে খসরু আমার মনের দরজায় কড়া নেড়ে গেল!

 

অপরাজেয় বাংলার সামনে খসরুকে শায়িত রেখে কিছু কথা বলতে দাঁড়িয়েছিলাম। আমার কথা বলার সামর্থ্য যেন কোথায় হারিয়ে গিয়েছিল। যা বলতে চেয়েছিলাম কিছুই বলতে পারলাম না। খসরুর কাছে যে আমার, আমাদের অনেক ঋণ! সেই তারুণ্যে খসরু আমাদের উদ্দীপিত করেছিল চলচ্চিত্র বলে যে শিল্পটি আছে তার পরিচয় নিতে, স্বাদ পেতে। বইয়ের দোকানে সময় কাটাতে কাটাতে বইকে সুহৃদ বানিয়ে নিয়েছিল খসরু। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ধার ধারেননি, বহু শিক্ষিত নামধারীকে বহু পেছনে ফেলার যোগ্যতা অর্জন করে নিয়েছিল সে। ওর শিক্ষা প্রকৃত অর্থেই ছিল নিজেকে গড়ে তোলার প্রত্যয়, প্রগতির পথে নিজেকে এগিয়ে নেওয়ার বাহন। এসব করতে করতে খসরু একাই একটা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছিল। পঞ্চাশের দশক থেকেই সুফিয়া কামাল আর কামালউদ্দীন খানের তারাবাগের আর ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাড়ির বারান্দা প্রগতিশীল মানুষদের জন্য একটা বড় প্রশ্রয়ের জায়গা ছিল। তাদেরই একজন খসরুও সেই বারান্দায় তার অন্যতম কর্মক্ষেত্রের সন্ধান পেয়েছিল। আর সেই সুবাদে হয়ে উঠেছিল আমার অন্তরঙ্গ বন্ধুদের একজন। আমার মায়ের বিশেষ স্নেহের পাত্র খসরু আমাদের পরিবারের প্রায়-সদস্য হিসেবে গণ্য হতো।

 

 

শিল্প মন্ত্রণালয়ের ক্ষুদ্রশিল্প সংস্থায় আলোকচিত্রীর কাজ করত সে। ব্যক্তিগত জীবনে প্রচণ্ড সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে খসরুকে। কিন্তু সেই কষ্ট অতিক্রম করে খসরু তার সঙ্গীদের নিয়ে পাকিস্তান ফিল্ম সোসাইটি প্রতিষ্ঠা করেছিল সুস্থ চলচ্চিত্র শিল্পচর্চার সঙ্গে সঙ্গে সুস্থ সমাজ গড়ার ব্রতে। খসরুর সঙ্গে পরিচয় হওয়ার বিস্তারিত বিবরণ স্মরণে আনতে পারি না; কিন্তু এটুকু বলতে পারি ওর হাত ধরেই এ শিল্পকে জানার সুযোগটুকু পেয়েছিলাম। ক্রমে ক্রমে বিশ্বের এক বিরাট ঐশ্বর্যের সন্ধানের যাত্রায় প্রণোদিত হতে পেরেছিলাম। চলচ্চিত্রশিল্পের ইতিহাস, ব্যাপ্তি, তার কৌশলগত উৎকর্ষ, এর মধ্য দিয়ে জীবনবোধের স্পর্শ পাওয়া—সে এক বিশাল অথচ বিরল অভিজ্ঞতা। আইজেনস্টাইন, রেনোয়াঁ, গদার, পোলানস্কি, কুরোসাওয়া, সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক, মৃণাল সেনরা যেন হয়ে উঠলেন পরম আত্মীয়।

 

শুধু ছবি দেখা বা দেখানো নয়, চলচ্চিত্র সংসদকে ঘিরে সাংগঠনিকভাবে মানুষকে একে অপরের কাছে নিয়ে আসা, চলচ্চিত্রবিষয়ক পত্রিকা ধ্রুপদি বের করা, সবকিছুতে খসরু ছিল অবিসংবাদিত নেতা আমাদের কাছে। কাজ আদায় করে নিতে খসরুর মতো কঠোর ‘টাস্ক মাস্টার’ আর কাউকে পাইনি আমার জীবনে। অবহেলার কোনো ক্ষমা ছিল না ওর কাছে। ধ্রুপদির জন্য কীভাবে গদারের ছবির ওপর ভয়ংকর উচ্চমানের এক লেখা অনুবাদ করিয়ে নিয়েছিল কাইজার চৌধুরী আর আমাকে দিয়ে! কত কাঠখড় পুড়িয়ে সতীশ বাহাদুরের মতো বিদগ্ধ চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্বকে এনে ঢাকা আর চাটগাঁয়ে ‘ফিল্ম অ্যাপ্রিসিয়েশন’ কোর্স করিয়েছিল।

 

 

এরই ফাঁকে কখন যেন আমাদের পরিবার খসরুর ভরসার জায়গাটি হয়ে উঠেছিল। কঠিন কষ্টের ভেতরেও ওর জীবনযাপনে ও একটা সহজ আর মজার ভঙ্গি বজায় রেখে চলত। মনে পড়ে ছোট বোন টুলু বা আমাদের বাড়ির সামনে রিকশা দাঁড় করিয়ে ডাক দিয়ে জিজ্ঞাসা করত খাবার আছে কি না। থাকলে বাড়িতে ঢুকবে নয়তো ওরই ভাষায় খাবারের সন্ধানে অন্য কোথাও যাবে! বড় বোনের মেয়ে সিমিনের ওপর ওর ছিল সস্নেহ দাবির সম্পর্ক। যেকোনো সময়ে চা খাওয়াতেই হবে ওর খসরু মামাকে।

 

একই সময়ে আমরা তখন ‘নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়’-এর নিবেদিতপ্রাণ কর্মী। প্রতি সন্ধ্যায় আমরা একত্র হই দলের নানা কাজে। সে সময়ে হাসি-আনন্দ আর মজা করে আমাদের সময় কাটত খসরুর সঙ্গে। খসরুর ভালো লাগা, কষ্ট, বেদনা আর ছবি বানানোর স্বপ্নের কথা কখনো কখনো শুনিয়েছে আমাকে। তা এখন এক শীর্ণ প্রবাহে পরিণত। দীর্ঘদিনের ব্যবধানে খসরুকে একদিন পেলাম বাংলা একাডেমির বইমেলায় আলো-আঁধারিতে একটা খুঁটিতে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে। দেখলাম ওর দাড়ি কেটে ফেলেছে। জিজ্ঞেস করলাম দাড়ি কী হলো। স্বভাবসুলভ হাসি হেসে উত্তর দিল, ‘শিবিরে লয়া গেসে!’ খসরুর সঙ্গে আমার সেই শেষ দেখা, তারপর আবার খসরু অতীত হয়ে গিয়েছিল আমার জীবনে। কিন্তু চলে যাওয়ার সময়টাতে কাকতালীয়ভাবে পরিবারের ছবিতে ভর করে খসরু আবার যেন আমার বর্তমানে জায়গা করে নিল। খসরুকে স্মরণ করি পরম মমতায়, অনেক শ্রদ্ধায়।

 

লেখকঃ মহুয়া মোহাম্মদ, গণমাধ্যমকর্মী

১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

সব খবর