সর্বশেষ

হীরেন নাগ

নীরব অন্তর্দৃষ্টি ও সুরেলা বাস্তবতার এক চলচ্চিত্রকার

প্রকাশিত: ২৮ নভেম্বর ২০২৫, ০৯:৩০
ভারতীয় বাংলা ও হিন্দি চলচ্চিত্রে মানবিকতা, নরম বাস্তবতা ও সংযত আবেগের এক অনন্য নির্মাতা ছিলেন হীরেন নাগ। স্মৃতির আড়ালে থাকা এই পরিচালক উত্তম কুমার থেকে মাধুরী দীক্ষিত—বিভিন্ন প্রজন্মের অভিনয়শিল্পীদের সঙ্গে কাজ করে মানুষের অন্তর্দ্বন্দ্ব, সম্পর্কের সূক্ষ্ম টানাপড়েন এবং সুরেলা আবহকে চলচ্চিত্রে অসাধারণভাবে ফুটিয়ে তুলেছিলেন। তাঁর নির্মাণশৈলী আজও বাংলা–হিন্দি সিনেমার ইতিহাসে সুরেলা মানবিকতার এক নীরব ছাপ রেখে গেছে।
নীরব অন্তর্দৃষ্টি ও সুরেলা বাস্তবতার এক চলচ্চিত্রকার

ভারতীয় চলচ্চিত্র ইতিহাসে এমন বহু পরিচালক আছেন যাঁদের নাম আজ স্মৃতির আড়ালে। কিন্তু তাঁদের নির্মাণ শৈলী ও শিল্পবোধ পরবর্তী প্রজন্মকে নিঃশব্দে প্রভাবিত করে গেছে। হীরেন নাগ ছিলেন একজন প্রতিভাবান ভারতীয় বাঙালি চলচ্চিত্র পরিচালক, যিনি বাংলা ও হিন্দি উভয় জগতে সমান দক্ষতায় কাজ করেছেন এবং মানবিক কোমলতা ও সুরেলা বাস্তবতা তাঁর চলচ্চিত্রে অনবদ্যভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। তাঁর জন্মস্থান, শৈশব বা বেড়ে ওঠার জায়গা সম্পর্কে জনবহুল, বিশ্বাসযোগ্য তথ্য পাওয়া যায় না। হীরেন নাগ প্রথম বাংলা ছবির সঙ্গে যুক্ত হন ১৯৫২ সালে, যখন তিনি ‘কবি চন্দ্রাবতী’ চলচ্চিত্রের পরিচালক হিসেবে কাজ করেন। আর ১৯৮৭ সালে শেষ মুক্তিপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র ‘টুনি বৌ’। পরিচালনার পাশাপাশি তিনি কিছু চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্যও লিখেছিলেন। ব্লকবাস্টার চলচ্চিত্র  ‘থানা থেকে আসছি’, ‘আঁখিও কে ঝরখোঁ সে’ এবং ‘অবোধ’ পরিচালনা করে তিনি বিশেষ পরিচিতি অর্জন করেন।

 

হীরেন নাগের পরিচালনায় বাংলা চলচ্চিত্রের মধ্যে ১৯৬৫ সালে নির্মিত ‘থানা থেকে আসছি’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। উত্তম কুমার, মাধবী মুখোপাধ্যায় অভিনীত এই মনস্তাত্ত্বিক গল্পে হীরেন নাগ মানুষের ভিতরের দ্বন্দ্ব, অপরাধবোধ এবং সামাজিক প্রতিক্রিয়াকে সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে তুলে ধরেন। তিমীর বারান ভট্টাচার্যের সুর এই চলচ্চিত্রের গাম্ভীর্যকে আরও দৃঢ় করেছে। কাহিনির গতি,আলো–ছায়ার ব্যবহার এবং চরিত্রগুলোর মানসিক চাপ-এসব মিলিয়ে এর কাহিনী বাংলা চলচ্চিত্রে শিল্পগতভাবে একটি শক্ত অবস্থান তৈরি করে।

 

এছাড়া ‘জীবন মৃত্যু’ হল একটি জনপ্রিয় বাংলা চলচ্চিত্র যা যৌথভাবে পরিচালনা  করেন হীরেন নাগ ও বিশ্বনাথ রায়। এই চলচ্চিত্রটি ১৯৬৭ সালে মুক্তি পেয়েছিল। এর মুখ্য চরিত্রে অভিনয় করেন উত্তম কুমার ও সুপ্রিয়া দেবী। ১৯৭০ সালে একই নামে হিন্দি রিমেক তৈরি হয় যার মুখ্য চরিত্রে অভিনয় করেন ধর্মেন্দ্র এবং রাখী।

 

 

হীরেন নাগ-এর একটি জনপ্রিয় বাংলা চলচ্চিত্র ‘অন্ধ অতীত’ । ১৯৭২ সালে চলচ্চিত্রটি মুক্তি পায়। এখানে সংগীত পরিচালনা করেছিলেন শ্যামল মিত্র। চলচ্চিত্রটির মুখ্য চরিত্রে অভিনয় করেন উত্তম কুমার ও সুপ্রিয়া চৌধুরী। বাংলা চলচ্চিত্রে ১৯৭৫ নির্মিত ‘প্রিয় বান্ধবী’ আরেকটি উল্লেখযোগ্য কাজ, যেখানে উত্তম কুমার, সুচিত্রা সেন ও ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়-এর মতো শিল্পীরা তাঁর সঙ্গে কাজ  করেছেন।

 

হিন্দি ভাষায় হীরেন নাগের সবচেয়ে পরিচিত কাজ ‘গীত গাতা চল’; এটি ১৯৭৫ সালে নির্মিত। সচিন পিলগাওকর ও সারিকা অভিনীত এই চলচ্চিত্রে প্রেম, যাত্রাপথ এবং সঙ্গীত এই তিনের মেলবন্ধনে পরিচালক হীরেন এক অনন্য আখ্যান নির্মাণ করেন। রবীন্দ্র জৈনের সুরারোপিত ‘গীত গাতা চল’ গানটি তখনকার ভারতীয় সঙ্গীতজগতে নতুন সুরেলা ধারা সৃষ্টি করেছিল। গানের সহজ অথচ গভীর শব্দচয়ন, পাখির ডাকের মতো সুর এবং যাত্রাপথের দৃশ্য-সব  মিলিয়ে প্রেমকে যে নির্দোষ দীপ্তিতে দেখানো হয়েছে, তা নাগের শিল্পদৃষ্টিরই বহিঃপ্রকাশ।

 

১৯৮৪ সালের চলচ্চিত্র ‘অবোধ’ হীরেন নাগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ; যা   একই সঙ্গে শিল্পগত ও ঐতিহাসিক তাৎপর্য বহন করে। কারণ এই চলচ্চিত্রে প্রথম  বড় পর্দায় অভিনয় করেন বলিউডের ধক ধক গার্ল মাধুরী দীক্ষিত। তখন মাধুরীর  বয়স ছিল মাত্র ১৬ বছর। মাধুরী দীক্ষিতের চরিত্রের নাম ছিল গৌরী। যদিও চলচ্চিত্রটি বাণিজ্যিকভাবে তেমন সফলতা পায়নি কিন্তু মাধুরী দীক্ষিতের অভিনয় দর্শককে মুগ্ধ করে। মাধুরীর বিপরীতে দেখা গিয়েছিল তাপস পালকে। এই চলচ্চিত্রের গল্পে  হীরেন প্রেম, বিবাহ ও নারী–মানসিকতার সূক্ষ্ম দিকগুলোকে অত্যন্ত সংযত ভাষায় তুলে ধরেন যা তাঁর নির্মাণ শৈলীর প্রধান শক্তি। রবীন্দ্র জৈনের ‘তুঝে দেখনে কো তরস্তি হ্যায় আঁখে ’ কিংবা ‘ঘনি ঘনি মরিয়া’ গানগুলো এই চলচ্চিত্রকে আবেগের স্তরে সমৃদ্ধ করেছে। মাধুরী তার দীর্ঘ সফল চলচ্চিত্র জীবনের ক্যারিয়ার নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে ২০২২ সালে কলকাতায় এক অনুষ্ঠানে বলেন-“আমার প্রথম চলচ্চিত্রের হিরো ছিলেন তাপস পাল। তিনি বাংলার মানুষ ছিলেন। আমাদের পরিচালক হীরেন নাগও এখানকার লোক। আমি তাঁদের ভুলে যাই কী ভাবে! কলকাতায় আসতে পেরে আমি খুবই খুশি।”

 

 

হীরেন নাগের পরিচালনায় অভিনয়শিল্পীরা সাধারণত খুব মৃদু, সংযত অভিনয় করতেন-যা তাঁর ছবিগুলোকে এক বিশেষ বাস্তবতা দিত। তিনি নাটকীয়তা বা অতিরঞ্জনে ভরসা করতেন না। গল্প বলতেন অত্যন্ত সংযত, স্বাভাবিক ও মানবিক ভঙ্গিতে। দৈনন্দিন জীবনের ছোট ছোট অনুভূতি, সম্পর্কের টানাপড়েন, ভুল বোঝাবুঝি ও প্রেমের নিরাভরণ আবেগ তাঁর চলচ্চিত্রের কাহিনীতে এমনভাবে উঠে  আসে, যেন দর্শক নিজের জীবনেরই অংশ দেখছে।

 

নাগ কখনো চমকপ্রদ ভিজ্যুয়াল ব্যবহার করেননি বরং নরম আলো–ছায়া, স্থির ফ্রেম ও সংযত ক্যামেরাচালনার মাধ্যমে চরিত্রকে প্রাধান্য দিয়েছেন। ক্যামেরা তাঁর কাছে ছিল মানুষের অন্তর্জগত প্রকাশের মাধ্যম -যেখানে চরিত্রের সংকোচ, দ্বিধা, লজ্জা, প্রেম বা বেদনা খুব শান্তভাবে ফুটে ওঠেছে।

 

আজ তিনি হয়তো খুব আলোচিত নাম নন কিন্তু ‘থানা থেকে আসছি’, ‘প্রিয় বান্ধবী’, ‘গীত গাতা চল’ কিংবা ‘অবোধ’-এইসব চলচ্চিত্রের নির্মাণশৈলীতে যে সুরেলা মাধুর্য ও মানবিক বোধ মিশে আছে, তা তাকে ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে একটি স্বতন্ত্র স্থানে প্রতিষ্ঠা করেছে। সহজ ভাষা, সংযত ছন্দ, সুরের  কোমল ব্যবহার এবং চরিত্রের অভ্যন্তরীণ অনুভূতি-এই চারটি উপাদান মিলিয়ে  তিনি ভারতীয় চলচ্চিত্রে এক বিশেষ নির্মল, সুরেলা বাস্তবতার ধারা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তাঁর নির্মাণ আজো মনে করিয়ে দেয় চলচ্চিত্রের কাহিনীর সবচেয়ে শক্তিশালী উপাদান হলো ‘মানবিকতা’।

সব খবর