১
বিশ্বনেতাদের চাপের কাছে নতি স্বীকার করে পাকিস্তান বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দেয়ার ঘোষণা দেয়। বঙ্গবন্ধুর এই মুক্তির ঘোষণায় যুদ্ধদিনের বাঙালির সমস্ত দুঃখ-কষ্ট, বেদনা- বঞ্চনা সব দূর হয়ে যায়। তারা আনন্দের জোয়ারে ভাসতে থাকে। তারা অপেক্ষার প্রহর গুনতে থাকে কখন তাদের নেতা আসবেন, কখন মুক্তির দিশারী আসবেন, কখন আসবেন জাতির পিতা।
বঙ্গবন্ধু সরাসরি দেশে এলেন না। তিনি যে কত দূরদর্শী আর বড় মাপের বিশ্বনেতা তাঁর প্রমাণ দিলেন লন্ডন ও দিল্লী হয়ে দেশে ফিরে। বঙ্গবন্ধু লন্ডনে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথ আর ভারতের রাষ্ট্রপতি ভি ভি গিরি ও প্রধামন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে দেখা করে সার্বিক পরিস্থিতি বুঝলেন এবং বাংলাদেশ নিয়ে বিশ্বনেতাদের মতামত নিলেন- এ এক অনন্য সাধারণ বুদ্ধিমত্তা বঙ্গবন্ধুর।
২
১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি। শীতের সকাল- তখন বাজে ৯টা। আকাশবাণী কলকাতা কেন্দ্রের সকাল বেলার সংবাদ পাঠক বলছেন, ‘পাকিস্তানের কারাগার থেকে বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে মুক্তি দেয়া হয়েছে এবং তিনি আজ ভোর সাড়ে ৪টায় পিআইএর একখানা বিশেষ বিমানে করে এক অজ্ঞাত স্থানের দিকে যাত্রা করেছেন।’
দুপুরের দিকে জানা গেল, বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে বিমানটি লন্ডনের পথে। রাতে বিবিসির সংবাদ থেকে জানা গেল, লন্ডনে বঙ্গবন্ধু উঠেছেন ক্ল্যারিজ হোটেলে। ৯ জানুয়ারি দৈনিক ইত্তেফাক বড় বড় হরফে হেডলাইন করল, ‘বঙ্গবন্ধু এখন লন্ডনে’। বঙ্গবন্ধু সেই হোটেল থেকে টেলিফোনে কথা বললেন অস্থায়ী রাষ্ট্রপ্রধান সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ, বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব, শেখ কামাল, শেখ জামাল, শেখ হাসিনা, শেখ রেহানা, শেখ রাসেলসহ পরিবার-পরিজনের সঙ্গে। বঙ্গবন্ধু তাদের জানালেন, ১০ জানুয়ারি তিনি দেশে আসবেন।
৩
বঙ্গবন্ধু তাঁর 'অসমাপ্ত আত্মজীবনী'তে লিখেছেন, 'আমি পালিয়ে থাকার রাজনীতিতে বিশ্বাস করি না। কারণ আমি গোপন রাজনীতি পছন্দ করি না, আর বিশ্বাসও করি না।’ ( পৃষ্ঠা ১৩৪)
বাঙালির প্রিয়তম নেতা যেদিন পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে লন্ডন হয়ে দেশে ফিরে আসছেন সেদিন মানুষের আনন্দ নানা মাত্রায় রঙিন হয়ে উঠেছিল। দেশের প্রতিটি ঘর, মহল্লা, গ্রাম, লোকালয়ে বয়ে গিয়েছিল আনন্দের বন্যা। মানুষের সেসব আনন্দের উচ্ছ্বাস প্রকাশ পায় গণমাধ্যমের পাতায়। এদিন ‘এ খবর স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার: আকুল ইচ্ছার উত্তর: আনন্দে কাঁদিয়া ফেলার’ শিরোনামে ইত্তেফাক একটি অসাধারণ প্রতিবেদন ছাপায় যা দারুণ সাড়া ফেলে মানুষের মধ্যে। ইত্তেফাক লিখছে, 'সে খবরটি ছিল আনন্দের। আর স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার। সে খবরটি ছিল তীব্র ব্যাকুল প্রতীক্ষার উপহার। সে খবরটি ছিল উল্লাসের। আর আনন্দে কাঁদিয়া ফেলার। সে খবরটি ছিল বাংলার সাড়ে সাত কোটি মানুষের আকুল ইচ্ছার উত্তর।
জাতির পিতা আসিবেন। হয়তো আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই। তিনি এখন লন্ডনে। রাস্তায় একজন দুইজন করিয়া পথ চলা মিছিলে পরিণত হইল। গগনবিদারি স্লোগান উঠিল। আবার মিষ্টি বিতরণের পালা শুরু হইল। কয়েকটি মিছিল গেল ধানমন্ডির দিকে। কয়েকটি বঙ্গবন্ধুকে সম্বর্ধনা জানানোর প্রস্তুতি নিতে ছত্রভঙ্গ হইল। কিন্তু সারাদিন জনতা একটি আনন্দের খবরের আলোচনাতেই মুখর থাকিলেন।’
৪
১০ জানুয়ারি, ১৯৭২।
কেমন ছিল সেদিনের বাংলার আকাশ! প্রকৃতি!
সেদিন ছিল নির্মল, ঝকঝকে রোদ্দুরের এক ঝলমলে দিন। সকাল থেকে রেসকোর্সের ময়দানসহ সারা শহরে আনন্দের বার্তা ছড়িয়ে গেল- তিনি আসছেন, মহামানব আসছেন। তেজগাঁও বিমানবন্দরের আশেপাশে কানায় কানায় পরিপূর্ণ- সবাই আকাশের দিকে তাকিয়ে আছেন- কখন আকাশের গায়ে বিমানের দেখা মিলবে। একসময় সেই কাংখিত বিমানের দেখা মিলল। বিমান থেকে নেমে বঙ্গবন্ধু দেখলেন তার জন্য অপেক্ষা করছে বাংলার অগনিত মুক্তিপ্রিয় স্বপ্নবাজ মানুষ। বঙ্গবন্ধুকে দেখে সবার চোখ সজল হয়ে ওঠে। তারা দেখতে পেলেন বিমান থেকে নামছেন হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালিকে।
সেদিন বঙ্গবন্ধুর বিমানে তাঁর সফরসঙ্গী হিসেবে আরও কয়েকজনের সঙ্গে ছিলেন প্রখ্যাত সাংবাদিক, কলামিস্ট আতাউস সামাদ। গবেষক, সাংবাদিক আবুল মকসুদ তাঁর এক লেখায় উল্লেখ করেছেন, "ওই বিমানে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে এসেছিলেন বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার প্রতিনিধি সাংবাদিক আতাউস সামাদ। বিমান থেকে নিচে তাকিয়ে বঙ্গবন্ধু যখন দেখতে পান অগণিত মানুষ, তিনি বিচলিত বোধ করেন এবং স্বগতোক্তির মতো বলেন, ‘এই মানুষগুলোকে আমি খেতে দিতে পারব তো!’
সন্ধ্যাবেলা আতাউস সামাদ আমাদের বললেন, বিমানে বঙ্গবন্ধু বারবারই শুনতে চাইছিলেন কোথায় কোথায় কী কী ধরনের ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে ক্ষয়ক্ষতি করেছে পাকিস্তানি বাহিনী। তিনি চিন্তিত ছিলেন কীভাবে দেশকে পুনর্গঠন করে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনবেন।
বিমানবন্দর থেকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আসতে দীর্ঘ সময় লাগে। একটি খোলা জিপে বঙ্গবন্ধু ছিলেন। আকাশবাণীর দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায় ধারাবিবরণীতে ছিলেন। একটু পরপরই একটি রবীন্দ্রসংগীত হচ্ছিল, ‘ভেঙেছ দুয়ার, এসেছ জ্যোতির্ময়, তোমারি হউক জয়।' "