১
এমনিতেই গত দেড় দু'দশক ধরে প্রকাশনা শিল্প চলছিল ধুকে ধুকে- বর্তমানে সে পরিস্থিতির নজিরবিহীন অবনতি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা এই শিল্পের সামগ্রিক দিক বিবেচনায় এনে হতাশা ব্যক্ত করে বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে আর্থিকভাবে একতরফা ক্ষতিগ্রস্ত প্রকাশকরা এ পেশায় আর টিকে থাকতে পারবেন কিনা তা তারা নিজেরাও গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারছেন না। ফলে এ শিল্পের ওপর নির্ভর করা হাজার হাজার মানুষের জন্য অপেক্ষা করছে চরম বিপর্যয়। ফলে বছরের পর বছর ধরে এই শিল্পের সাথে জড়িতরা বাধ্য হয়ে চলে যাচ্ছেন অন্য পেশায়।
কেন এরকম পরিস্থিতির সৃষ্টি হলো?
প্রকাশনা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত দুই আড়াই দশকে প্রকাশনা শিল্পে রাজনীতির মেরুকরণ ঘটেছে। প্রথাগত রাজনীতির মতো এই শিল্পেও গড়ে উঠেছে দলাদলি, মতাদর্শগত রাজনীতি। রাজনৈতিক সুবিধা আদায়ে সমিতির ভেতরে গড়ে উঠেছে দুই তিন ধারার রাজনীতি আর নেতৃত্ব।
জানা যায়, দীর্ঘদিন সমিতির সুবিধাবাদীরা নিজেদের সুবিধার্থে সমিতিকে ব্যবহার করতে গিয়ে ক্ষমতাধরদের কাছে নিজেদের নানাভাবে বন্ধক দেয়। এতে করে প্রকাশনার স্বাভাবিক বিকাশ যেমন ব্যাহত হয় তেমনি প্রকৃত প্রকাশকরাও নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সুবিধাবাদীরা অন্তরালে চলে গেলে নতুন নেতৃত্বের আবির্ভাব ঘটলেও বই বিক্রি করা সাধারণ প্রকাশকদের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয় না। ফলে দেখা দেয় নতুন সমস্যা।
২
অভিজ্ঞজনরা বলছেন, সাম্প্রতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের প্রকাশনা শিল্পে চলছে একটি অশুভ মহলের নজিরবিহীন আধিপত্য তৈরির ন্যাক্কারজনক প্রক্রিয়া। এই মহলটি একুশের বইমেলা নিয়ে নোংরা খেলায় নামে। তারা বইমেলাকে ইসলামী বইমেলার আদলে করার অপচেষ্টায় মেতে ওঠে যার ফলশ্রুতিতে তারা মেলাকে ফেব্রুয়ারি মাস থেকে সরিয়ে নেয়ার চক্রান্ত করে। তারা বলছেন, মৌলবাদীদের তো অশুভ মহলটি ফেব্রুয়ারি, মার্চ, ডিসেম্বর মাসকে সহজভাবে মেনে নিতে চায় না।
সৃজনশীল প্রকাশকদের অনেকেই অভিযোগ করে জানান অশুভ মহলের যাবতীয় কর্মকাণ্ডের সাথে বাংলা একাডেমীর হাত রয়েছে। তারা জানান, বইমেলা, প্রকাশনা শিল্প নিয়ে ইসলামীধারার প্রকাশকদের এই চক্রান্তের সাথে একাডেমীর বর্তমান সভাপতি অধ্যাপক আবুল কাশেম ফজলুল হক ও মহাপরিচালকের প্রচ্ছন্ন সমর্থন রয়েছে।
জানা যায়, প্রকাশকদের এই অশুভ মহলটির নেতৃত্ব দিচ্ছে ইসলামী ধারার কয়েকজন শীর্ষ প্রকাশক। ফলে মূলধারার প্রকাশকদের সাথে তাদের তীব্র দ্বন্দ্ব ও মতবিরোধ দেখা দেয়।
৩
জানা যায়, মূলধারার প্রকাশকদের একটি বড় অংশ রাজনীতির সাথে থাকেন না। তারা সারাবছর তাদের প্রকাশনা বিষয়ক কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। তারা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে ফেব্রুয়ারির বইমেলার জন্য। মূলত ফেব্রুয়ারির বইমেলাকে টার্গেট করে তারা প্রকাশনার পরিকল্পনা করে। মেলায় প্রকাশিত বই সারাবছর দেশের সব জায়গায় সরবরাহ ও বিক্রয় তাদের বিনিয়োগকৃত অর্থের ফিরে আসাকে নিশ্চিত করে তোলে। এক্ষেত্রে প্রকাশনা সংশ্লিষ্টরা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা থাকাকে জরুরি বলে মনে করছেন।
প্রকাশকদের সাথে কথা বললে তারা জানান, রাজনৈতিক আদর্শ থাকতেই পারে তবে সেটা ব্যক্তিপর্যায়েই থাকা উচিত। গত দেড় দশকে প্রকাশকদের কেউ কেউ সুবিধা বাগাতে সরকারি দলের লেজুড়বৃত্তিতে জড়িত হয়ে এই শিল্পকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছেন। নগ্নভাবে দুই ধারার রাজনৈতিক প্রকাশক হতে চান না উল্লেখ করে তারা জানান, প্রকাশনায় যদি এরকম দুই ধারার রীতি চলতে থাকে তাহলে দেশের প্রকাশনা শিল্পের ধ্বংস অনিবার্য। প্রকাশনা থেকে দুই ধারার রাজনীতির বিলোপ চান তারা।