সর্বশেষ

ভালোবাসা বাংলা ভাষা

প্রকাশিত: ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৭:০০
ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, জাতির আত্মপরিচয় ও অস্তিত্বের ভিত্তি—এই বিশ্বাসকে সামনে রেখে “ভালোবাসা বাংলা ভাষা” প্রবন্ধে মহুয়া মোহাম্মদ তুলে ধরেছেন বাংলা ভাষার ইতিহাস, সংগ্রাম, সংকট ও সম্ভাবনার বিস্তৃত অন্বেষণ। প্রাচীন দার্শনিক কনফুসিয়াস-এর ভাষাচিন্তা থেকে শুরু করে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, রবীন্দ্রনাথ-এর ভাষা-দর্শন এবং ইউনেস্কো ঘোষিত আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের প্রেক্ষাপট মিলিয়ে লেখাটি বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষা ও শুদ্ধ চর্চার এক শক্তিশালী আহ্বান।
ভালোবাসা বাংলা ভাষা

১.

প্রাচীন চীনের দার্শনিক কনফুসিয়াসকে একবার জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, রাষ্ট্র-প্রশাসকের দায়িত্ব যদি আপনার কাঁধে চাপে তাহলে প্রথমেই আপনি কী করবেন?

উত্তরে কনফুসিয়াস বলেছিলেন- অবশ্যই, প্রথম কাজটি হবে ‘ভাষা’ শুদ্ধ করা।

যে ব্যক্তি এই প্রশ্নটি করেছিলেন, তিনি চমকে গিয়ে জানতে চাইলেন- কেন?

কনফুসিয়াস উত্তরে বললেন; যদি ভাষা শুদ্ধ না হয়, তাহলে যা বলা হলো তা বোঝা যাবে না, যা বলা হয় তা যদি বোঝা না যায় তাহলে যা করা উচিত তা না করাই থেকে যাবে; যা করা উচিত তা যদি না করা হয় তাহলে নীতিবোধ ও শিল্পকলার মান নেমে যাবে; যদি নীতিবোধ ও শিল্পকলার মান নেমে যায় তাহলে দেশ থেকে সুবিচার হারিয়ে যাবে, যদি সুবিচার হারিয়ে যায় তাহলে মানুষ অসহায় সংশয়ের চোরাবালিতে আটকা পড়ে যাবে। সুতরাং, যা বলা হলো তাতে অবশ্যই কোনও স্বেচ্ছাচারিতার সুযোগ থাকবে না। আর এটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

কাজেই সর্বস্তরে শুদ্ধ ভাষা ব্যবহার করা জরুরি। আর তার শুরুটা হোক রাজনীতিবিদদের দিয়েই!

 

২.

মানব সভ্যতার অগ্রগতির ইতিহাসে ভাষাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে বলে নৃবিজ্ঞানী, সমাজবিজ্ঞানী এবং ভাষা গবেষক, পণ্ডিতগণ সংশয়হীনভাবে স্বীকার করেন। ভাষা একটি দেশের সভ্যতার পরিচায়ক- এই উক্তি সম্পর্কে আজকের বিশ্বে কারো কোনো সন্দেহ নেই। কারণ মুখের ভাষা এবং লিখিত ভাষার মাধ্যমেই ব্যক্ত হয় মানুষের সকল অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ; আমাদের রাগ-দুঃখ, সুখ-ভালোবাসা, এমনকি দ্রোহ চেতনাও। ভাষা যে কোনো দেশের শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতিচর্চার প্রধান মাধ্যম। আমরা বাংলাদেশের বাঙালিরা জানি ‘ভাষা’ আমাদের হৃদয়ের কতখানি জুড়ে অবস্থান করছে। কারণ ভালোবাসা মানুষের একটি বিমূর্ত অনুভূতি; অন্তরের এক অনিঃশেষ বহিঃপ্রকাশ। ভালোবাসার কোনো নিরেট বস্তুর মতো রূপ-গন্ধ বা চেহারা নেই; অবয়বহীন ভালোবাসা মানুষের সবচেয়ে সুন্দর-সুস্মিত হৃদয়াবেগের পরিবাহন। আমরা যখন উচ্চারণ করি- আমি দেশের জন্য প্রাণ দিতে পারি, আমি আমার বন্ধুর জন্য প্রাণ দিতে পারি; কেবল তখনই আমরা মনুষ্য পদবাচ্যে উন্নীত হই।

 

‘অন্য দৃষ্টিতে ভাষা বিচার’ নিবন্ধে অধ্যাপক যতীন সরকার লিখছেন, মানুষ এবং পশুর পার্থক্য নির্ণয়ে, আধুনিক বিজ্ঞানের কাছে ভাষা একটি মুখ্য ও অপরিহার্য উপাদানরূপে চিহ্নিত। সে চিহ্নের স্বরূপ-নির্ধারণে বিজ্ঞানের যে শাখা নিয়োজিত, সেটিকেই বলে ভাষাবিজ্ঞান। কিন্তু কোনো বিজ্ঞানই কোনো বিশেষ শাখা-বন্দি নয়, কিংবা অন্য নিরপেক্ষ স্ববিকশিত বৃন্তহীন পুষ্পও নয়। ভাষাবিজ্ঞানও বিভিন্ন বিজ্ঞানের শাখায় শাখায় বিচরণশীল হয়েই তার বিকাশের উপাদান আহরণ করে থাকে। ভাষার প্রকাশ মানুষের মুখে, কিন্তু তার সৃষ্টির উৎস মানুষের মন। মনের অলিতে-গলিতে ভ্রমণশীল মনোবিজ্ঞানের দ্বারস্থ হতে ভাষাবিজ্ঞান তাই বাধ্য। আবার মানুষের মন তো মানুষের সমাজের কারখানায়ই নানা আকার-প্রকারে গঠিত, বিবর্তিত বিকশিত ও পরিণত। গঠন, বিবর্তন, বিকাশ ও পরিণতিতে সমাজ আর মন যেমন পরস্পরসাপেক্ষ, ভাষার পক্ষেও সে সাপেক্ষতা একান্ত অনিবার্য এবং ভাষাবিজ্ঞানের সুষ্ঠুতা অর্থাৎ বৈজ্ঞানিকতার জন্য সমাজবিজ্ঞানের সহায়তা গ্রহণ নিতান্তই অপরিহার্য। তাই ভাষার স্বরূপ সন্ধানে মনোবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান ও ভাষাবিজ্ঞান- এই ত্রয়ীর ঐকত্রিক উপস্থিতি, পারস্পরিক পরামর্শ ও সহযোগিতার আবশ্যকতা স্বীকার না করে পারা যায় না।’ 

 

৩.

আমরা জানি, প্রাণিজগতের মানুষের নিত্যকার জৈবিক আচরণ খুব একটা ভিন্ন নয়; কিন্তু মানুষ সত্যিকার অর্থে মানুষ হয়ে ওঠে প্রেম-প্রীতি-ভালোবাসা এবং অন্তরের-বাইরের শুদ্ধতার মধ্য দিয়ে। আর দেখি সেই শুদ্ধতার টানেই, মায়ের ভাষার অধিকার আদায়ের দাবিতে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বাংলা ভাষা রাষ্ট্রভাষা করার জন্য যে লড়াই শুরু হয়েছিল ও রক্ত ঝরেছিল, ১৯৯৯ সালে তা মর্যাদা পায় ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’-এর। আর তখনই আমাদের অহংকার মায়ের ভাষা বাংলা ভাষার বৈশ্বিক অবস্থান বিষয়ে সঠিক ধারণা পেতে গিয়ে নানা রচনায় ভিন্ন ভিন্ন তথ্য খুঁজে পাই। সারা বিশ্বে বাংলা ভাষায় কথা বলেন এমন জনসংখ্যার ভিত্তিতে কোথাও সপ্তম, কোথাও বা ষষ্ঠ, আবার কোথাও পঞ্চমতম অবস্থানের উল্লেখ পাই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ভাষাবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সৌরভ সিকদার ‘বাংলা ভাষার আত্মঘাতী বিকৃতি’ রচনায় পৃথিবীর চতুর্থ বৃহত্তম ভাষা হিসেবে ‘বাংলা’কে উল্লেখ করেছেন। (দৈনিক সমকাল, ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬)। অবস্থান নিয়ে মত পার্থক্য থাকলেও বাংলা যে পৃথিবীর বুকে মানুষের মধ্যে প্রথম দিকের একটি ভাষা সে নিয়ে কোন সংশয় নেই।

 

সেই বাংলা ও বাঙালির আত্মপরিচয়ের অনুসন্ধান করতে গিয়ে ‘কালের সংগ্রামে বাংলা ভাষা’ প্রবন্ধে শিক্ষাবিদ, লেখক, অর্থনীতিবিদ আকবর আলি খান লিখছেন, ‘বাংলা ভাষার প্রতি বাঙালিদের যে ধরনের আকর্ষণ দেখা যায় তা পৃথিবীর আর কোথাও আছে কি-না সে সম্পর্কে সন্দেহ রয়েছে সমাজবিজ্ঞানীদের। তাই প্রশ্ন ওঠে, বাঙালিরা বাংলা ভাষাকে কেন এত ভালোবাসে? আর কেনই বা বুকের রক্ত দিয়ে সংগ্রামের মাধ্যমে মাতৃভাষাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদায় অভিষিক্ত করে। মার্কিন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জিরিং লিখেছেন, ‘ভাষার সঙ্গে বাঙালির যে ভালোবাসাবাসি তার সঙ্গে জড়িত রয়েছে তীব্র অনুভূতিপূর্ণ আচার-অনুষ্ঠান, তা এমন আবেগপূর্ণ অভিজ্ঞতার জন্ম দেয়, যা পৃথিবীর অন্যান্য অংশে কদাচিৎ দেখা যায়।’ জিরিং এর কারণ খুঁজেছেন বাংলাদেশের ভূগোলের মধ্যে। তার মতে, বর্ষার পানি যখন দেশের বিপুল এলাকা প্লাবিত করে, তখন জনজীবন স্থবির হয়ে পড়ে। এ পরিস্থিতিতে বাঙালিরা ছোট ছোট দলে গাদাগাদি করে বর্ষাকাল কাটিয়ে দেয়। অবিরাম বৃষ্টির কারণে যোগাযোগশূন্য অবস্থায় তারা কবিতা আবৃত্তি করে। আর গান গেয়ে সময় কাটায়। এর ফলে বাঙালিদের সঙ্গে ভাষার নিবিড় সম্পর্ক গড়ে উঠেছে।’

 

৪.

ভাষা একটি প্রবহমান ধারা। ভাষা পরিবর্তনশীল। নদীর জল ধারার মতো চলার পথে যা পায় তাই গ্রহণ করে ফেলে যায় পুরনোকে। সেই ভাষাই টিকে থাকে যে ভাষা অন্য ভাষা থেকে, পরিবর্তনশীল সময় থেকে নতুন শব্দ গ্রহণ করে এর কলেবর বাড়াতে পারে ও পারিপার্শ্বিক অন্য সব বিষয়কে ধারণ করতে পারে। ভাষার জন্ম ইতিহাসের সন্ধান করেছেন পণ্ডিতগণ। ‘অন্য দৃষ্টিতে ভাষা বিচার’ নিবন্ধে ভাষার উৎপত্তি প্রসঙ্গে ভাষাবিজ্ঞানী নোয়েরের বক্তব্য উল্লেখ করে অধ্যাপক যতীন সরকার লিখছেন,'সামাজিক লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য বংশ বৃদ্ধদের প্রাচীন শ্রম এবং সামাজিক প্রযত্ন থেকেই মানুষের ভাষা ও চিন্তার সূত্রপাত।' নোয়েরের কথায় স্পষ্ট উপলব্ধি হয় যে; শ্রম, চিন্তা ও ভাষা একই মালিকায় সূত্রবদ্ধ তিনটি পদ্মরাগমণি। এর যে কোনো একটির অভাব ঘটলে বা অপসারণ করলে সে মালিকা আর গাঁথা হয়ে ওঠে না।  শ্রম, চিন্তা ও ভাষার সম্পর্ক সূত্রটিকে স্পষ্টরূপে অনুধাবন করতে হলে দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ তথা মার্কসীয় দর্শনের শরণাপন্ন হওয়া ছাড়া উপায়ান্তর নেই। সন্দেহ নেই ডারউইনের বিবর্তনবাদ মানুষের উৎপত্তি সম্পর্কে সকল প্রকার ভাববাদী ধারণার উচ্ছেদ ঘটিয়েছে। মার্কস ও অ্যাঙ্গেলস ডারউইনের মতবাদের প্রতি দৃঢ় সমর্থন জ্ঞাপন করেছেন।

 

শুধু তাই নয়, অ্যাঙ্গেলস তাঁর ‘বানর থেকে মানুষের বিবর্তনে শ্রমের ভূমিকা’ শীর্ষক রচনাটিতে ডারউইনবাদকে সমৃদ্ধতরও করে তুলেছেন এবং অ্যাঙ্গেলসের এই রচনাটিতেই মানব বিকাশের ধারায় ‘ভাষা’র উৎপত্তি বিষয়েও স্পষ্ট ও সুষ্ঠু বৈজ্ঞানিক ধারণার প্রাঞ্জল অভিব্যক্তি ঘটেছে। যেমন, অ্যাঙ্গেলস দেখিয়েছেন যে, বৃক্ষশাখা থেকে সমতল ভূমিতে অবতীর্ণ 'মানুষ এমন একটি পর্যায়ে এলো যখন পরস্পরকে কিছু বলার প্রয়োজন তাদের হলো। এই প্রেরণা তার নিজস্ব অঙ্গ সৃষ্টি করল; স্বরের দোলনা দ্বারা ক্রমাগত উন্নততর স্বরগ্রাম সৃষ্টির উদ্দেশ্যে বানরের অপরিণত কণ্ঠনালি ধীর অথচ স্থিরগতিতে রূপান্তরিত হয়েছিল। ক্রমে ক্রমে মুখের প্রত্যঙ্গগুলো একটার পর একটা স্পষ্টধ্বনি উচ্চারণ করতে শিখল।' এবং এমনি করে 'শ্রম থেকে এবং শ্রমের সঙ্গে সঙ্গেই যে ভাষার উৎপত্তি' অ্যাঙ্গেলসের নিবন্ধে বৈজ্ঞানিক যথার্থতা সহকারে সে সত্যই উদ্ঘাটিত। সে সত্যের অনুসিদ্ধান্তরূপে এ সত্যই প্রোজ্জ্বল যে, ভাষা শুধু মানুষের অলস মনোভাবের প্রকাশ মাধ্যমই নয়; হাতিয়ারধারী মানুষের সমষ্টিগত শ্রমের ফলে উৎপন্ন যে ভাষা; সে ভাষার প্রবর্তনাতেই তার হাত ও মাথা (শ্রমশক্তি ও চিন্তাশক্তি) পরিচালিত, জীবনযুদ্ধে সে বিজয়ীর সম্মানে ভূষিত, তারই দাক্ষিণ্যে মানুষ আজ এ গ্রহের অধীশ্বর, জলে-স্থলে ব্যোমে প্রসারিত তার রাজ্যপাট। সমাজ থেকে উৎপন্ন ভাষাই সমাজের পুষ্টি, পরিবর্তন ও বিকাশে ও মুখ্য সহায়িকা শক্তি।

 

অ্যাঙ্গেলসের বক্তব্যের ব্যাখ্যা করেই জোসেফ স্তালিন বলেন- ‘মানুষ পশুস্তর থেকে সামাজিক ব্যক্তির স্তরে উঠেছে মেহনতের সাহায্যে। মেহনত তার মনকে করেছে সমৃদ্ধ, তার ভাষা ও সংস্কৃতিকে করেছে বিকশিত। মেহনতের মধ্যে জরুরি হয়ে ওঠে সাহচার্য। মেহনতের প্রক্রিয়ার মধ্য থেকে পরস্পর সাহচর্যের মাধ্যম বিকাশ লাভ করে সে মাধ্যম ভাষা। এই ভাষা ও সমাজ ও মানবীয় চিন্তার বিপ্লবে বিরাট ভূমিকা গ্রহণ করেছে। ভাব বিনিময় ছাড়া, পরস্পর সাহচর্য ছাড়া জীবিকা উৎপাদন অসম্ভব, সমাজের অস্তিত্ব অসম্ভব। আবার সমাজ থেকে আলাদা হয়ে ভাষা টিকতে পারে না। সুতরাং ভাষাও তার বৃদ্ধি সমৃদ্ধির কানুন বোধগম্য হতে পারে সমাজের এবং জনতার ইতিহাসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করে তার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে। সমাজ ও জনতা ভাষার অধিকারী। সমাজ ও জনতা আবার ভাষার সৃষ্টি ও আধার।’ হাতের সাহায্যে হাতিয়ার ধরে সমষ্টিগত শ্রম দিয়েই মানুষের সমাজের সৃষ্টি। কিন্তু হাত স্বয়ংক্রিয় বা স্বয়ংশাসিত নয়। তার নিয়ন্ত্রণ, শাসন ও চালনায় আছে মাথা। অর্থাৎ চিন্তাশক্তির নির্দেশনায় শ্রমশক্তি পরিচালিত। ভাষা এই চিন্তাশক্তি ও শ্রমশক্তির যৌথ প্রযোজনার সৃষ্টি ও স্রষ্টা দুই-ই। তাই ভাষার বৈজ্ঞানিক উপলব্ধির জন্য শ্রমশক্তি তথা সমাজ-শক্তির নিয়ম প্রণালির অনুধাবনার মতোই চিন্তাশক্তি তথা মনোজগতের প্রকৃতি ও স্বরূপ সন্ধানও সমান জরুরি। অর্থাৎ এখানেই সুস্পষ্ট ও সুতীব্র হয়ে ওঠে ভাষাবিজ্ঞানের জন্য সমাজবিজ্ঞানের সঙ্গে মনোবিজ্ঞানের মেলবন্ধনের অপরিহার্য আবশ্যকতা। (এবং সে সঙ্গে কিছুটা শরীর বিজ্ঞানেরও। মনের আধার শরীর, অন্তত ভাষার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে সংশ্লিষ্ট স্বরযন্ত্র ও স্নায়ুতন্ত্র ভাষাবিচারের একান্ত আবশ্যিক উপাত্ত।)

 

৫.

আমরা অত্যন্ত বেদনার সাথে খেয়াল করছি দূষণ ও বিকৃতিতে আমাদের মায়ের ভাষা, প্রাণের ভাষা, বাংলা ভাষা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে। চারদিকে চলছে ভাষা বিকৃতির উৎসব। পথে নেমে কান পাতলেই শোনা যায় বিকৃত বাংলা উচ্চারণের কথোপকথন। একটি প্রজন্মের বড় অংশ শুদ্ধ বাংলা উচ্চারণে কথা বলতে পারে না। এদের অনেকের কাছেই ইংরেজি ও বাংলার মিশ্রণে তৈরি নতুন ধরনের ভাষা প্রিয় হয়ে উঠছে। সমাজের এ অংশের মানুষগুলো ‘র’ উচ্চারণ করে থাকে ‘ড়’-এর মতো করে। ফলে এদের মুখে ‘আমার’ শব্দটি উচ্চারিত হয় ‘আমাড়’-এর মতো। এ ধরনের হাজারো শব্দ বিকৃত হয়ে মুখে মুখে ঘুরছে। ইংরেজি আন্তর্জাতিক ভাষা। জ্ঞানার্জনের জন্য নিঃসন্দেহে তাকেও রপ্ত করতে হবে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন, ‘ইংরেজি আমাদের জ্ঞানের ভাষা আর বাংলা হলো ভাবের ভাষা।’ ইংরেজির মাধ্যমে আমরা জ্ঞানার্জন করতে পারি; কিন্তু আমাদের ভাব তথা সৃজনশীল চিন্তাচেতনা প্রকাশের মাধ্যম হবে অবশ্যই বাংলা।

 

একইভাবে ইংরেজি ভাষা শেখা বা বলাটা অন্যায় নয়; কিন্তু বাংলার সঙ্গে মিশিয়ে শেখা বা মিশিয়ে বলতে গিয়ে বাংলিশ (!) করে বলাটা অন্যায়। বাংলা ভাষার স্বাতন্ত্র্য আমাদেরই রক্ষা করতে হবে। হাভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্ট চার্লস ডব্লিউ ইলিয়ট বলেছিলেন, ‘অভিজ্ঞতা থেকে আমি এটা বুঝেছি যে, যে কোন ভদ্র মহিলা বা ভদ্রমহোদয়ের প্রকৃত শিক্ষা হচ্ছে নিজ মাতৃভাষা সঠিক ভাবে জানা।’ এখানে একটি নিবন্ধের উল্লেখ করা খুবই প্রাসঙ্গিক মনে করছি। 'ভাষাদূষণ নদীদূষণের মতোই বিধ্বংসী' শিরোনামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের স্বনামধন্য অধ্যাপক, কথাসাহিত্যিক ড. সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের একটি লেখা প্রকাশিত হয় ২০১২ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকায়। সেখানে তিনি একজন শিক্ষক ও সচেতন নাগরিক হিসেবে অতি প্রাসঙ্গিক কারণেই নিজস্ব পর্যবেক্ষণ উপস্থাপন করে বলেন, ভাষার শুদ্ধতা নিয়ে কেউ কথা বললে আজকাল অনেকে তাকে সন্দেহের চোখে, কোনো কোনো সময় করুণার চোখে দেখেন। তাঁদের ধারণা, লোকটি প্রতিক্রিয়াশীল, তারুণ্যবিরোধী, অনাধুনিক এবং হয়তো মধ্যযুগীয়। তাঁরা বলেন, লোকটি ‘আনস্মার্ট’। দুঃখের বিষয়, স্মার্টনেসের সংজ্ঞাটি তাঁরা ভুল জায়গায় প্রয়োগ করেন।

 

চীনে দেখেছি, একটাও হংরেজি শব্দ ব্যবহার না করে অনর্গল কথা বলছে লোকজন। এক ইংরেজি জানা চীনা তরুণকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, আসলেই কি সে ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করছে না, নাকি ইংরেজি শব্দ চীনা উচ্চারণে ইংরেজিত্ব হারিয়েছে। সে হেসে বলেছিল, চীনা ভাষা এতই সমৃদ্ধ যে কদাচিৎ বিদেশি ভাষার আমদানি প্রয়োজন হয়। তথ্যপ্রযুক্তির নতুন নতুন শব্দ-পদকে তারা চেষ্টা করে চৈনিক প্রতিশব্দ দিয়ে প্রতিস্থাপন করতে। তরুণটির ভাষ্য অনুযায়ী এ রকম নতুন শব্দের চীনা প্রতিশব্দ যারা তৈরি করে এবং ব্যবাহার করে তাদেরকে সবাই সমীহের চোখে দেখে। অর্থাৎ তারাই স্মার্ট। এ রকম স্মার্ট হওয়ার জন্য কি না কে জানে, ইংরেজি বিভাগে আমাদের এক চীনা ছাত্রী যখন বাংলা বলে, চেষ্টা করে সুন্দর বাংলায় বলতে। যতটা সম্ভব বাংলা শব্দ ব্যবহার করতে। 

 

৬.

ভাষাভাষীর সংখ্যা ও বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণে বাংলা পৃথিবীর অন্যতম একটি সমৃদ্ধ ভাষা। তবু কবি-সাহিত্যিক, বৈয়াকরণ ও পণ্ডিতবর্গের মতানৈক্য এবং নিজ নিজ ধারণাকে শ্রেষ্ঠ প্রতিপন্ন করার মানসে সৃষ্ট স্বেচ্ছাচারী মনোভাবের কারণে বাংলা ভাষা প্রচণ্ড অস্থির। এ অস্থিরতা ও স্বেচ্ছাচারী মনোভাব বাংলা ভাষার নানা বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে যেমন, তেমনি বানান ভুলেরও অন্যতম কারণ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ভাষাবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সৌরভ সিকদার মনে করেন, প্রযুক্তির অবিশ্বাস্য উন্নতি, বিশ্বায়ন, মুক্তবাজার অর্থনীতি, আকাশ সংস্কৃতি এবং অবাধ তথ্যপ্রবাহের এই সময়ের পৃথিবীর অনেক ভাষাই হারিয়ে যাচ্ছে এবং ভবিষ্যতে যাবে। এই সংকটের মধ্যেও টিকে আছে অজস্র ভাষা। ইউনেস্কো পরিচালিত একটি ভাষা জরিপে দেখা যায়, বর্তমান শতাব্দীর শেষ পর্যন্ত পৃথিবী থেকে চলমান ভাষাগুলোর অর্ধেকের বেশি বিলুপ্ত হয়ে পড়বে।

 

পৃথিবীর চতুর্থ বৃহত্তম ভাষা ‘বাংলা’ নিয়ে সে রকম কোনো সংকট হয়তো নেই; কিন্তু সংকট আছে এর নিজস্বতা নিয়ে, সমস্যা আছে এর বিকৃতি নিয়ে। যেভাবে চলছে তাতে কোথায় গিয়ে ঠেকবে বাংলা ভাষা? এ প্রশ্নটি আজ অনেক বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। যে জাতি নিজের ভাষার জন্য প্রাণ দিল, জন্ম দিল এক রক্তাক্ত ইতিহাসের, সেই জাতিই আবার তার ভাষাকে অবজ্ঞা করছে, বিকৃত করছে- এটা দুঃখজনক। কিন্তু বর্তমান অবস্থা এটাই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের স্বনামধন্য অধ্যাপক, কথাসাহিত্যিক ড. সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের মতে, বাংলা ভাষায় যে বিকৃতি এখন চলছে তা এই ভাষাকে পরাধীন ও নির্জীব করবে এবং ভেতরের সৃষ্টিকল্পনা তিরোহিত করবে। ভাষা যখন তার সৌন্দর্য এবং কাঠামোর গতিশীলতা হারায় অন্য ভাষার অভিধান (রাস্তার ভাষার অভিধানসহ) ছাড়া এক পা চলতে পারে না এবং চললেও খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। এই ভাষায় কি দর্শনের গূঢ় চিন্তাগুলো প্রকাশ করা যায়? না আমাদের সমাজ নিরীক্ষা বা বিজ্ঞানের বিষয়গুলো? কেউ কেউ হয়তো বলবেন, এই মার খাওয়া ভাষা তো মুখের ভাষা, এ তো লিখিত নয়, তাহলে এত ভাবনা কেন? এর উত্তরে বলা যায়,যে জাতির মুখের ভাষা এখন মার খাওয়া,শংকর শ্রেণীর, সে জাতির লেখার ভাষাও দুর্বল হয়ে পড়ে, কারণ এর ব্যবহারকারীদের চিন্তাও তখন অস্বচ্ছ হয়ে পড়ে। এর নমুনা তো ইতিমধ্যেই দেখছি।

 

৭.

আর তাই রক্ত দিয়ে পাওয়া বাংলা ভাষার বিকৃতি ক্রমশ বাড়তে থাকায় আশংকা প্রকাশ করছেন ভাষা গবেষক, বিশেষজ্ঞগণ। এর পেছনে আর্থসামাজিক ব্যবস্থার পরিবর্তন, রাজনৈতিক দূরদর্শিতার অভাব, শিক্ষাব্যবস্থার ত্রুটিসহ আরও অনেক বিষয় সম্পৃক্ত বলে মনে করেন তারা। এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার তাগিদ দিচ্ছেন ভাষা বিশেষজ্ঞগণ। এ ছাড়া বিকৃতির কারণ হিসেবে কিছু নাটকে এ ধরনের ভাষার ব্যবহার, রেডিও জকির ভাষা এবং সম্প্রচার মাধ্যমে প্রচারিত কিছু বিজ্ঞাপনের সংলাপকে চিহ্নিত করেছেন তারা। অভিযোগ উঠেছে মহান জাতীয় সংসদেও কথা বলার সময় অনেকেই শুদ্ধ বাংলা উচ্চারণে কথা বলেন না। এভাবেই বিভিন্ন পর্যায়ে ধাপে ধাপে বিকৃতির ফলে বাংলা ভাষা ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। বাংলা ভাষার এই অবস্থা সম্পর্কে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘এখানে সমাজ শ্রেণীবিভক্ত। গরিবরা শুদ্ধ বাংলা জানে না। মধ্যবিত্তরা ভাষার চর্চা করলেও তারা এখন বিপর্যস্ত অবস্থার মধ্যে আছে। ধনীদের সবাই অনুসরণ করে। কিন্তু তারা ইংরেজি চর্চা করে, বাংলায় মনোযোগ নেই। ভুল ইংরেজি লিখলে লজ্জা পায় কিন্তু ভুল বাংলা লিখলে উল্টো গৌরব বোধ করে। মিডিয়াও অনেকে কিছু বিকৃত করছে। যারা বিত্তবান তাদেরকে লক্ষ্য করেই সব ধরনের প্রচার চলছে। তারা মনে করে, বিজ্ঞাপনের ভাষা স্মার্ট হবে যদি সেখানে মিশেল থাকে। বাণিজ্য ও বিত্ত নষ্ট করছে সব। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও এ অবস্থা চলছে। এ অবস্থা রুখতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিপুলসংখ্যক দক্ষ শিক্ষকও দিতে পারিনি।’

 

এ অবস্থা থেকে উত্তরণের পথ কি হতে পারে- জানতে চাইলে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘সবাইকে নিয়ে সামাজিক আন্দোলনের বিকল্প নেই। আমাদের দেশপ্রেম বাড়াতে হবে। মাতৃভাষা সঠিকভাবে ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।’ সারা পৃথিবীর মানুষ আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদযাপনের মাধ্যমে বাংলা ভাষাকে জানতে ও বুঝতে শিখছে। এটা আমাদের জন্য অনেক বড় একটা খবর। যে ভাষাকে একদিন গলাটিপে হত্যা করার চক্রান্ত হয়েছিল সেই ভাষার সম্মানার্থেই প্রতি বছর পালিত হচ্ছে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’। এর চেয়ে বিস্ময়কর, আনন্দের, খুশির ব্যাপার আর কী হতে পারে। তবু দুশ্চিন্তার ব্যাপার হচ্ছে, এখনো বাংলা ভাষা সর্বস্তরে সমানভাবে গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। ব্রিটিশদের রেখে যাওয়া ক্রীতদাসরা এখনো বাংলার বদলে ইংরেজি আওড়াতে বেশি সম্মানিত বোধ করে। প্রতিক্রিয়াশীল, মৌলবাদীরা এখনো স্বপ্ন দেখে এ দেশে আবার ফিরে আসবে আরবি, ফারসি, উর্দু মিশেল খিচুড়ি ভাষা, বাংলাবিদ্বেষী এই কুলাঙ্গাররা শুধু বাংলা ভাষারই শত্রু নয়, এরা বাংলাদেশেরও শত্রু। এদের যথাযথভাবে প্রতিহত করতে হলে সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রচলন করা এখন সময়ের দাবি। যদিও এই দাবি অনেক আগে থেকেই উঠেছে। যদি আমরা সত্যি সত্যিই বাংলা ভাষাকে দেশের মাটিতে এবং বিদেশিদের কাছে মূল্যবান করে তুলতে চাই, তাহলে এখনই সুযোগ সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রচলন ঘটানো।

 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের স্বনামধন্য অধ্যাপক, কথাসাহিত্যিক ড. সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম যথার্থই বলছেন, ভাষা একটি জাতির প্রাণ- এর অনেক রূপ আছে: আঞ্চলিক, প্রমিত, প্রতিদিনের ব্যবহারের। কিন্তু এর একটা রূপ যদি হয় একেবারে জগাখিচুড়ি, মিশ্র, বিকৃত, মার খাওয়া এবং তরুণদের যদি ব্যাপকহারে তা গ্রহণ করতে হয় তখন একটা উদ্বেগ তৈরি হয় বটে। ব্যাপারটা স্মার্ট না হলেও। বাংলা ভাষার এই বিকৃতি থেকে পরিত্রাণ পেতে শিক্ষক সমাজের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে বলে মনে করেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও কথাসাহিত্যিক মুহম্মদ জাফর ইকবাল। তিনি বলেছেন, ‘একেবারে শুরু থেকেই আসতে হবে সব। বাচ্চাদের ইংরেজি বানান ভুল লিখলে যেমন একটু বকা দিয়ে শেখানো হয়, ঠিক তেমনি বাংলা বানান ভুল হলেও বকা দেয়া উচিত। তাদের সুন্দর বাংলা বলা, লেখার জন্য অনুপ্রাণিত করা উচিত। আমরা বাংলার চর্চা নানাভাবে বাড়াতে পারি। এসএমএস পাঠানো বা ই-মেইল পাঠানো আমরা বাংলাতেও করতে পারি।’

 

তিনি এ ব্যাপারে লেখকদের দায়িত্বের কথা তুলে ধরে বলেন, ‘লেখকরা সুন্দর ভাষায় সুন্দর বর্ণনায় লিখবেন। তারা লেখার পাশাপাশি বাংলাকে অন্যভাবেও তুলে ধরতে পারেন। একজন সাহিত্যিক একটি নাটক লিখে ভিন্নভাবে বাংলাকে তুলে ধরতে পারেন যেখানে তিনি দরকার না হলে আঞ্চলিক শব্দ ব্যবহার করবেন না, প্রমিত ভাষা ব্যবহার করবেন। এভাবেই তারা শুদ্ধ বাংলা ভাষা ছড়িয়ে দিতে পারেন। সবাইকে মনে রাখতে হবে বাংলা ভাষা রক্ষা এবং এর বিকাশের সব দায়িত্ব কিন্তু এখন আমাদের। কারণ কলকাতায় এখন বাংলার চেয়ে যেন হিন্দির কদরই বেশি।’

 

৮.

বাংলা ভাষা, বানান, উচ্চারণ নিয়ে কাজ করছে বাংলা একাডেমি। বাংলা ভাষার এই দুর্দিনের কারণ হিসেবে বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা এবং পাঠদানও অনেকখানি দায়ী বলে মনে করেন বাংলা একাডেমির ভাষা প্রশিক্ষণ উপবিভাগের উপপরিচালক মুর্শিদ আনোয়ার। তিনি বলছেন, ‘একটি শিশু জন্ম নেয়ার পর তার পরিবার ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা থেকে প্রকৃতিগতভাবেই অনেক কিছু শেখে। সমস্যা হয় যখন সে স্কুলে যায়। অনেক শিক্ষক বাংলা শব্দ দিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ বাক্য শেষ করেন না। তারা বাক্যের মধ্যে ইংরেজি শব্দের ব্যবহার করেন। বেশিরভাগ শিক্ষকই এই প্রবণতায় আক্রান্ত। ফলে শিশুরা বিভ্রান্ত হয়। এর পাশাপাশি যারা বিভিন্ন সম্প্রচার মাধ্যমে কথা বলেন, তাদের অনেকেই আকাশ সংস্কৃতিতে আক্রান্ত হয়ে কিছু ভাষার উচ্চারণে বিকৃত কৌশল অবলম্বন করছেন। ফলে পুরো বিষয়টি এখন জীবাণু হিসেবে সংক্রমিত হচ্ছে সারা দেশে।’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ভাষাবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সৌরভ সিকদার ‘বাংলা ভাষার আত্মঘাতী বিকৃতি’ নিবন্ধে আমাদের অনেকের মনের কথাটিই লিথেছেন, ‘সঠিক শিক্ষা ব্যবস্থাই ভাষাকে সমৃদ্ধ করার প্রধানতম উপায়। শিক্ষক হওয়ার প্রধান যোগ্যতা হবে ভাষাজ্ঞান, বিশেষত বাংলা ভাষাজ্ঞান। মনে রাখতে হবে, ভাষাভিত্তিক আন্দোলনের হাত ধরে যে আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল, তার ওপরে ভিত্তি করেই আমাদের এই স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিল। তাই ভাষার শুধু আলোচনা বা নিরীক্ষা না করে, কার্যকরী সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় এখনই।’

 

অপরদিকে, ‘আদর্শ ভাষা সূর্যের মতো’ প্রবন্ধে ভাষা গবেষক ড. গোলাম মুরশিদ বলছেন, বর্তমানে বাংলা ভাষা পরিবর্তনের এমন এক জ্বলন্ত উনুনের ফুটন্ত পাত্রে আছে- আশা করি আদর্শিক রূপ থেকে তা খুব বেশি দূরে সরে যাবে না। কারণ এটা হলো মেরুদণ্ড। মেরুদণ্ড আছে বলেই আমরা সোজা হয়ে হাঁটতে পারি। জোঁকের মতো চলি না। আমরা যদি ভাষা হারিয়ে ফেলি, আমাদের গৌরব হারিয়ে ফেলি তাহলে মেরুদণ্ডহীন জোঁকের মতো আমাদের চলতে হবে। নতুন প্রজন্ম আদর্শ ভাষা থেকে দূরে সরে যাবে না বলেই প্রত্যাশা করি। আদর্শ ভাষা হচ্ছে সূর্যের মতো। আমার ধারণা, পঞ্চাশ বছর পর বাংলায় আরও পূর্ববঙ্গীয় শব্দ আসবে, আরও ইসলামী শব্দ আসবে, কুরুচিপূর্ণ শব্দ আসবে। কিন্তু সে ভাষা মেরুদণ্ড অর্থাৎ সাধু ভাষার ওপরই দাঁড়িয়ে থাকবে। বাংলা ভাষায় ইংরেজি শব্দ ঢুকবে। এ দেশে অনেক ইংরেজি মিডিয়াম শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আছে। যেখানে পড়ে বিদেশমুখী হবে এক দল; আরেক দল উপর শ্রেণীর শাসনকার্য পরিচালনা করবে। কিন্তু তারা বাংলা ভাষাকে খুব বেশি প্রভাবিত করতে পারবে না। বরং একসময় ইংরেজির ব্যবহার আরও কমে যাবে। সংবাদপত্র যদি ভাষারীতি মেনে চলে তাহলে আমাদের মেরুদণ্ড আরও শক্ত হবে। ভাষা নদীর মতন প্রবাহমান; যতই গ্রহনের-বর্জনের কথা বলি না কেন; এর মেরুদন্ডটি যেন আমরা বিসর্জন না দিই- এ ব্যাপারে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে।

 

৯.

গবেষক ড. আকবর আলি খানের মতে, ভাষা নিয়ে আমাদের যে গৌরব, তা দিনে দিনে খর্ব হয়েছে নানাভাবে। গত ৬০ বছরের বাংলা ভাষার ইতিহাস যদি আমরা বিশ্লেষণ করি তাহলে দেখা যাবে যে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধিত হয়েছে; আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত অর্জন সম্ভব হয়নি। যেসব ক্ষেত্রে অগ্রগতি সাধিত হয়েছে তার মধ্যে মূলত সাহিত্যই উল্লেখযোগ্য। আমরা অনেক ভালো গল্প, উপন্যাস ও কবিতা পেয়েছি। কিন্তু বাংলা ভাষার প্রসারের ক্ষেত্রে যে জায়গাটাতে দুর্বলতা রয়ে গেছে, তা হলো বাংলা এখনও জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চার ক্ষেত্রে পিছিয়ে রয়েছে। বাংলাদেশের যেসব মনীষী বিভিন্ন বিষয়ে বিশেষ পারদর্শিতা অর্জন করেছেন, তারা ইংরেজিতেই বেশি লেখেন। ফলে যা হয়েছে তা হলো- আমরা বাংলা ভাষায় সঠিকভাবে উচ্চশিক্ষা দিতে অক্ষম হয়ে পড়েছি। এর একটি কারণ হলো অর্থনৈতিক। আরেকটি কারণ হলো বুদ্ধিবৃত্তিক দাসত্ব। অর্থনৈতিক এ কারণে যে, জ্ঞান-বিজ্ঞানের উন্নত চর্চা করতে হলে যে পরিমাণ বই থাকা প্রয়োজন, সে পরিমাণ বই বাংলা ভাষায় সৃষ্টি হয়নি। আবার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উচ্চশিক্ষায় বাংলার সফল ব্যবহার করতে পারছি না আমরা। যতটুকু ব্যবহার হচ্ছে তার সুফল পাওয়া যাচ্ছে না।

 

ইংরেজি মাধ্যমে পড়লে একজন শিক্ষার্থী যত বই পড়তে পারে- বাংলায় তার কিয়দংশও পারে না। উপরন্তু একই বই বিভিন্ন পর্যায়ে পড়তে হচ্ছে, পড়াতে হচ্ছে। বাংলায় এ ধরনের সব ক্ষেত্রে বহুগুণ বই প্রয়োজন। বাংলাদেশে জ্ঞান-বিজ্ঞানের উচ্চতর চর্চা যেমন বাড়াতে হবে, তেমনি তা প্রকাশে বাংলাকে প্রাধান্য দিতে হবে। যতদিন বাংলায় পর্যাপ্ত বইয়ের সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব না হবে, ততদিন বাংলার প্রতি নির্ভরশীলতাও বাড়ানো যাবে না। তবে সর্বক্ষেত্রে বাংলার প্রাধান্য দেওয়া মানে এই নয় যে, আমরা ইংরেজি শিখব না। ইংরেজি আমরা অবশ্যই শিখব, তবে তা প্রয়োজনে। দেশে একটি মূলধারার শিক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি। শিক্ষার সে ধারাকে কখনই স্থানচ্যুত করা যাবে না। পৃথিবীর কোথাও একই দেশে তিন ধরনের শিক্ষা ব্যবস্থা চালু নেই, যা বাংলাদেশে বিদ্যমান। একটা ভয়ানক সমন্বয়হীনতার ভেতর দিয়ে আমাদের ছেলেমেয়েরা শিক্ষিত হচ্ছে। বাংলা ভাষা সেখানে একটা নড়বড়ে অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে। আমাদের যে বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা আছে তা সঠিকভাবে প্রয়োগ করা সম্ভব হয়নি। বাধ্যতামূলক শিক্ষাকে প্রকৃতই বাধ্যতামূলক করতে হবে। কেউ গ্রহণ না করলে প্রয়োজনে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। সেই বাধ্যতামূলক প্রাথমিক বা মূলধারার শিক্ষা গ্রহণের পরে যদি কেউ ইংরেজি কিংবা ধর্মীয় কিংবা অন্য কোনো বিষয়ে পড়তে চায় পড়ূক। সেটা অবশ্যই ঐচ্ছিক হবে। আর সব ক্ষেত্রে বাংলাকে বাধ্যতামূলক করেই ইংরেজিকে পাশে রাখতে হবে। শিক্ষা ব্যবস্থার এই সমন্বয় প্রতিষ্ঠা যেমন জরুরি তেমন জরুরি ভাষা শিক্ষাকে মাথায় রেখে উপযুক্ত পাঠ্যসূচি তৈরি করা। আমাদের পাঠ্যসূচির যে অংশটুকু বাংলা ভাষা শিক্ষার জন্য কাজ করছে তা কোনোভাবেই যথেষ্ট তো নয়ই বরং অনুপযোগী।

 

১০.

বাংলা ভাষা আন্দোলন আমাদের জাতীয় জীবনের শ্রেষ্ঠ ঘটনা। ভারত ভাগের পর পাকিস্তান নামক নতুন দেশ এবং নতুন ধর্ম সম্প্রদায়ের কেমন এক চেতনায় হয়তো হঠাৎ খুব অল্প সময়ের জন্য ঢেকে গিয়েছিল আমাদের ভাষিক অস্তিত্বের ব্যাপারটা। কিন্তু ভাষা আর মানুষ যে অভিন্ন! মানুষের অস্তিত্বের গূঢ় চেতনায় মাতৃভাষার অবস্থান প্রাণসত্তার মতোই সদা জাগ্রত। ওই ভাষায় কথা বলি, স্বপ্ন দেখি, কাজকর্ম করি, ভালোবাসি, হিংসে করি, বন্ধুত্ব গড়ি, শত্র“তা করি এবং যাপিত জীবনের সব অকাজ কুকাজও করি। এক কথায়, শয়নে-স্বপনে জাগরণে মাতৃভাষা আমাদের ঘিরে রাখে মায়ের নিপাট মমতার মতো। আপন দেহজ অস্তিত্বের রসায়নে মা আর মাতৃভাষার অনুভব অভিন্ন।

 

তাই যখন বাংলাভাষা নিয়ে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় শাসকদের ষড়যন্ত্রের কথা জানা গেল, তখনই গর্জে উঠেছিল বাংলা ভূমির সচেতন তরুণ প্রজন্মের কণ্ঠ। জলদ গম্ভীর কণ্ঠে আওয়াজ তুলেছিল রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই। ধর্ম সম্প্রদায়ের ঐক্য এবং রাষ্ট্র বন্ধনের ঐক্যের সঙ্গে গেঁথে নিয়েছিলাম মাতৃভাষার দাবিকে। তার আনুষ্ঠানিক দাম দিল এই দেশেরই হীরক সন্তান সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার এবং আরও অনেকে। কারাবন্দি হল বহু ছাত্র-শিক্ষক-জনতা। অবিস্মরণীয় সে ইতিহাস। ১৯৫২ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারির মহান আত্মত্যাগ সমস্ত বাংলাভাষীকে এক বিস্ময়কর দিব্য জ্ঞান দিয়েছিল। আমরা ধর্ম ঐক্য, রাষ্ট্রীয় ঐক্য, রাজনৈতিক ঐক্যের উপরে স্থান দিতে শিখলাম নিজের অস্তিত্বসম বাংলা ভাষাকে। সেই আমাদের মুক্তির পথ রচিত হল। গর্ব করতে শিখলাম বাংলা ভাষার জন্য। অবশেষে মুক্তিযুদ্ধ এবং ভাষার নামে বাংলাদেশ অর্জন।

 

১১.

বাঙালির ললাটে দুটি বিজয়ের গৌরবতিলক অঙ্কিত হয়ে আছে। প্রথম বিজয়তিলক অঙ্কিত হয়েছিল ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে, যখন আমাদের মায়ের ভাষা তথা আমাদের মাতৃভাষার অধিকার রক্তের বিনিময়ে আমরা ছিনিয়ে এনেছিলাম পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক ব্যাঘ্র-থাবার বজ্র আঁটুনি থেকে। উর্দু ভাষাকে সে সময় আমাদেরও রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেওয়ার প্রচণ্ড প্রয়াস গ্রহণ করেছিল পাকিস্তানি শাসকচক্র। সেদিন বীর বাঙালি রুখে দাঁড়িয়েছিল শাসকচক্রের বিরুদ্ধে এবং রক্তের বিনিময়ে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষার গৌরব দান করতে সক্ষম হয়েছিল। বাংলা আজ পৃথিবীর চতুর্থ প্রধান ভাষা এবং সমগ্র বিশ্বে বাঙালিদের অধিবাস, যারা কথা বলে ও স্বপ্ন দেখে বাংলা ভাষাতেই।

 

আমাদের ১৯৫২-এর ২১ ফেব্রুয়ারির ভাষা আন্দোলনই বীজ বপন করেছিল আমাদের মুক্তিযুদ্ধের; নয় মাসের যে রক্তক্ষয়ী জীবন বাজি রাখা সংগ্রামের মধ্য দিয়ে অর্জিত হয়েছিল ১৯৭১-এর ১৬ ডিসেম্বরে আমাদের গৌরবময় স্বাধীনতা। পৃথিবীর মানচিত্রে অঙ্কিত হলো একটি নতুন দেশ, স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ। আমি মনে করি, বাংলা ভাষায় লিখে যদি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পাওয়া যেত, তাহলে বাঙালি লেখকদের দাপটে পৃথিবীর অন্যান্য দেশের লেখকরা ম্রিয়মাণ হয়ে যেতেন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাংলা অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি পেল বটে, কিন্তু ভাষার ওপর নির্যাতন কমল না। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ আরবি হরফে বাংলা ভাষা লেখার প্রস্তাবের বিরুদ্ধে দাঁড়ালেন। তারপরও বাংলা ভাষার পাকিস্তানিকরণের প্রবণতা চলল গোটা ষাটের দশকজুড়েই। রবীন্দ্রনাথের গানের প্রচার নিয়েও অপতৎপরতা চলল। বাংলা বনাম উর্দু ভাষার লড়াইয়ের সমান্তরাল বয়ানে গড়ে উঠল পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে অঞ্চলগত বৈষম্য। এসব সুবিদিত প্রসঙ্গ। 

 

১২.

বাংলাদেশ রাষ্ট্রটির মূল ভিত্তি বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি। ধর্ম-গোত্র-সম্প্রদায় নির্বিশেষে বাংলাদেশ বাংলা ভাষারই রাষ্ট্র; বাঙালীর রাষ্ট্র। এটি মনে করার কোন কারণ নেই যে, আমরা রাগ করে পাকিস্তান ভেঙ্গেছি। মূলত আমরা ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাকে ভাষাভিত্তিক জাতীয়তায় রূপান্তর করেছি। এই আধুনিক জাতীয়তাবাদী ধারণা এই অঞ্চলে বিরল। ইউরোপ ও এশিয়ার কিছু কিছু দেশে এই জাতীয়তার উদ্ভব ঘটলেও আমাদের এই অঞ্চলে তেমন কোন দৃষ্টান্ত নেই। ব্রিটিশরা ভারতবর্ষকে মূলত দুটি সম্প্রদায়ে ভাগ করলেও ভারত অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র হিসেবে জন্ম নেয়। তাদের পক্ষে ভাষাভিত্তিক রাষ্ট্র গড়াও সম্ভব নয়। তারা বহুধর্মী ও বহুভাষী। পাকিস্তানও বহুভাষার রাষ্ট্র। সেজন্য তারা ধর্মকে জাতীয়তার ভিত্তি হিসেবে বেছে নেয়। আমাদের দেশে কিছু আদিবাসি থাকলেও তারা এখন প্রায় বাংলা ভাষাভাষী হয়ে গেছে। দেশের ৯৯.৯ ভাগ মানুষও বস্তুত বাংলা ভাষাভাষী।

 

আমাদের এই ভাষারাষ্ট্র গঠনের কাজটি খুব সহজ ছিল না। ১৯৪৮ সালে ভাষা আন্দোলন শুরু করে ৫২, ৬২, ৫৫, ৬৯-এর নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের পথ ধরে ’৭১ সালে সশস্ত্র যুদ্ধের মধ্য দিয়ে আমরা এই রাষ্ট্রটি প্রতিষ্ঠা করি। এই রাষ্ট্রের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা বাংলা। সংবিধানের ৩ নং অনুচ্ছেদে আর কোন ভাষাকে এই রাষ্ট্রে ব্যবহার করার বৈধতা দেয়া হয়নি। রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলার জন্য কোন শর্তও নেই। স্বাধীনতার পর জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সরকারী অফিস আদালতে বাংলা প্রচলন করেন। ১৯৫২ থেকে ১৯৭১ সালের মধ্যে ভাষিক চেতনা নিয়ে আমরা ক্রমেই পরিণত হয়েছিলাম। ১৯৫৬ সালে বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে মেনে নেয়ার পর আমরা স্লোগান তুলেছিলাম, শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে বাংলা ভাষা চাই। আরও এগিয়ে গেলাম ১৯৬৬ সালের দিকে। স্লোগান হল তখন জীবনের সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চাই। এসবই আমাদের গৌরবের ইতিহাস। স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ অর্জনের পর বাংলাভাষার ব্যবহার সম্পর্কে আমরা যতটা সচেতন এবং আবেগাকূল হয়েছিলাম, ততটা কাজ করতে যে পারিনি, সেটা মানতেই হবে। 

 

১৩.

শুরু থেকেই বাংলা ভাষার যাত্রাপথ নানা সংকটে আকীর্ণ ছিল, এখনো বাংলা ভাষার আকাশ থেকে সংকটের কালো মেঘ পুরোপুরি সরে যায়নি। প্রতিনিয়তই বাংলা ভাষা নানামুখী চক্রান্তের মুখোমুখি হচ্ছে। সেসব চক্রান্ত ছিন্ন করে বাংলা ভাষা এগিয়ে যাচ্ছে তার কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে। পৃথিবীতে যত ভাষা আছে সেসব ভাষার মধ্যে বাংলা ভাষাই সবচেয়ে সংগ্রামী আর প্রতিবাদী। বারবার বাংলা ভাষার ওপর আক্রমণ এসেছে, বারবারই বাংলা ভাষা সেসব আক্রমণ প্রতিহত করে আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠিত করার আপ্রাণ চেষ্টা করেছে। এখনো বাংলা ভাষা তার আত্মমর্যাদা রক্ষার্থে অবিরাম লড়াই করে যাচ্ছে। যতদিন না বাঙালি জাতি বাংলা ভাষাকে মনেপ্রাণে ধারণ করবে, ততদিন বাংলা ভাষাকে নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করে যেতেই হবে। আত্মপ্রতিষ্ঠার এই অবিরাম লড়াই থেকে যেদিন বাংলা ভাষা কান্ত-শ্রান্ত হয়ে সরে দাঁড়াবে, সেদিনই তার পতন অনিবার্য হয়ে উঠবে।

 

তবে আশার কথা হলো বাংলা ভাষা মৃত্যুঞ্জয়। এ ভাষার কোনো লয় নেই, ক্ষয় নেই, ধ্বংস নেই। মাঝে মাঝে ভিনদেশি রাক্ষুসে ভাষা এসে বাংলা ভাষাকে গ্রাস করতে চায় বটে কিন্তু বাংলা ভাষা এমনই এক মৃত্যুহীন ভাষা যে, একে কিছু সময়ের জন্য বন্দি করা যায় কিন্তু চিরতরে ধ্বংস করা যায় না। অবিনশ্বর বাঙালি জাতি সত্তার মতো বাংলা ভাষাও অমর, অজর, মৃত্যুহীন। ‘আদর্শ ভাষা সূর্যের মতো’ প্রবন্ধে ভাষা গবেষক ড.গোলাম মুরশিদের মতে, আমার ধারণা, ভাষা একটি জ্ঞানপ্রদীপ, এর পরিবর্তন হচ্ছে; পাশাপাশি নতুন শব্দ প্রয়োগ হচ্ছে। নতুন নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে নতুন নতুন শব্দ আসছে। ভাষা নিত্যনতুন পরিবর্তনের মাধ্যমে এগিয়ে যাচ্ছে।

 

১৪.

বাংলা ভাষার ইতিহাসের পানে তাকালে দেখি, জন্মলগ্ন থেকেই বাংলা ভাষাকে সংগ্রাম করে বড় হতে হয়েছে। বাংলা ভাষা বর্ণহিন্দু সমাজপতিদের কাছে কখনও প্রশ্রয় পায়নি। হিন্দু পণ্ডিতরা বিধান দিয়েছেন, সনাতন ধর্মের কথা কেউ বাংলা ভাষায় লিখলে তাকে নিকৃষ্টতম নরকে নিক্ষেপ করা হবে। রামায়ণ-মহাভারত কোনো দিনই বাংলায় লেখা হতো না, যদি না হিন্দু লেখকরা মুসলমান সুলতানদের পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করতেন। অন্যদিকে মুসলিম আলেমরা কোনো দিনই বাংলা ভাষার মর্যাদা স্বীকার করে নেননি। তারা ফতোয়া দিয়েছিলেন, যারা মাতৃভাষায় কোরআন-হাদিসের কথা লিখবে তাদের দোজখে যেতে হবে। এই শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশে বাঙালি মুসলমান লেখকরা সংগ্রাম করে বাংলা ভাষাকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন।

 

অন্যদিকে বাঙালি হিন্দুরা সমাজপতিদের সঙ্গে সংগ্রাম করে বাংলা ভাষার সংগ্রামকে বেগবান করেছেন। মুঘল আমলে ফারসি যখন রাজভাষা হিসেবে প্রচারিত ও প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন বাংলা ভাষা তার নিজস্ব ভূখণ্ডেই কোণঠাসা হয়ে পড়ে। রাজার অনুগ্রহ পাওয়ার জন্য এবং সুযোগ-সুবিধা নেওয়ার জন্য এই ভূখণ্ডেরই একদল লোক ফারসি ভাষা চর্চা করতে উঠেপড়ে লাগে। আরেকটি দল থেকে যায় দরিদ্র বাংলা ভাষার কাছে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ফারসি ভাষা বাংলা ভাষার ওপর চাবুক মারতে থাকে, ফারসি ভাষা বাংলাকে গ্রাস করতে চায় কিন্তু পারে না। মরতে মরতে বেঁচে যায় বাংলা ভাষা। মুঘলদের পরে ইংরেজরা এলে বাংলা ভাষার ওপর শুরু হয় নতুন অত্যাচার। তখনো বাংলা ভাষার বন্ধনকে উপেক্ষা করে, ভুলে গিয়ে বাংলা ভাষার মহিমা একদল সুবিধাভোগী ইংরেজি ভাষাকে সাদরে গ্রহণ করে। তারা হয়ে ওঠে কালো সাহেব। তাদের ভাবখানা এমন যেন বাংলা তাদের বৈমাত্রেয় বোন। তারা এড়িয়ে চলতে থাকে বাংলা ভাষার সংস্পর্শ। বাংলাকে তারা শুধু অনাদর আর অবহেলা করেই ক্ষান্ত হলেন না, তারা বাংলাকে ‘ল্যাংগুয়েজ অব ফিসারম্যান’ বলতে শুরু করেন। এদের মধ্যে মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তও (১৮২৪-১৮৭৩ খ্রি.) ছিলেন। কিন্তু যখন তার মোহ ভঙ্গ হয় তখন তিনি ঠিকই এসে মুখ লুকান বাংলা ভাষার আঁচলতলে। বঙ্কিমচন্দ্রও প্রথম প্রথম ইংরেজি ভাষা চর্চা শুরু করেছিলেন। কিন্তু তিনিও অবশেষে আশ্রয় নিয়েছেন বাংলার কুঁড়েঘরে।

 

১৫.

বাংলা ভূখণ্ড যখন ব্রিটিশমুক্ত হলো তখন আশায় বুক বাঁধে বাংলা ভাষা। বাংলা ভাষা ভাবতে শুরু করে তার দুঃখের রাত বুঝি শেষ হয়ে গেল। কিন্তু না, নতুন করে তাকে হত্যার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয় উর্দু নামের এক অদ্ভুত ভাষা। উর্দু বাংলার বিরুদ্ধে এমনই ষড়যন্ত্র শুরু করে যে, বাংলা ভাষার তখন নাভিশ্বাস উঠে যায়। ফারসি, ইংরেজি ভাষার উৎপাত বাঙালিরা মেনে নিলেও উর্দুর বিরুদ্ধে তারা প্রতিবাদী হয়ে ওঠে। বলতে গেলে উর্দুর হাত থেকে বাংলা ভাষাকে রক্ষা করার আন্দোলনই বাঙালির প্রথম ভাষা রক্ষাবিষয়ক আন্দোলন। এর আগে বাংলা ভাষাকে রক্ষা করার জন্য কোনো সংঘবদ্ধ আন্দোলন আর গড়ে ওঠেনি। উর্দুর বিরুদ্ধে চার বছর বাঙালি রক্তঝরা ভাষা আন্দোলন করে। ১৯৪৮ সালে যে আন্দোলন শুরু হয় তার সমাপ্তি ঘটে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি। এর মাঝে ঘটে যায় অনেক ঘটনা। অনেক প্রাণ বিসর্জিত হয় রাজপথে। জেল-জুলুম-নির্যাতন সহ্য করেন অনেক ভাষাসৈনিক। অসংখ্য মানুষের প্রাণদান আর নির্যাতনের বিনিময়ে রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি পায় বাংলা ভাষা। ১৯৫২ সালই সেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত যে মুহূর্তে বাংলা ভূখণ্ডে বাংলা ভাষা প্রথম রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি পায়।

 

১৬.

বাংলা সাহিত্যের একমাত্র প্রাচীন গ্রন্থ ‘চর্যাপদ’। চর্যাপদের ভাষা বাংলা ভাষা বলেই আজ স্বীকৃত। চর্যাপদের ভাষা দিয়েই বাংলা ভাষার বয়স যদি হিসাব করা হয়, তাহলে দেখব যে যুগে চর্যাপদ রচিত হয়েছে সে যুগে অভিজাত কেউ বাংলা ভাষার চর্চা করেননি। চর্যাপদ যারা রচনা করেছিলেন তারা প্রায় প্রত্যেকেই ছিলেন পলাতক মানুষ। তারা স্থির হয়ে কেউই বাংলা ভাষা চর্চা করার সুযোগ পাননি। যদি পেতেনই তাহলে শুধু একখানা গ্রন্থ রচনা করেই তারা ক্ষান্ত হতেন না, তাদের হাত দিয়ে আমরা আরও অসংখ্য গ্রন্থ পেতাম। তা ছাড়া চর্যাপদ আবিষ্কারের মধ্যেও আছে চমৎকার বিস্ময়। বাংলা ভাষার গ্রন্থ বাংলা ভূখণ্ডে পাওয়া গেল না, এটা পাওয়া গেল নেপালে। কেন বাংলা ভাষার গ্রন্থ নেপালে আবিষ্কৃত হলো- এ সম্পর্কেও নতুন করে গবেষণা হওয়া দরকার।

 

মধ্যযুগের কবি আবদুল হাকিম তার ‘নুরনামা’ গ্রন্থে বলেছিলেন: ‘যেসব বঙ্গেতে জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী।/ সেসব কাহার জন্ম নির্ণয় না জানি।’ কেন আবদুল হাকিম এ কথা বলেছিলেন তা আজ অনেকেরই জানা। কেননা তখনো একদল বাংলা ভাষাবিদ্বেষী মানুষ ছিলেন, যারা বাংলা ভাষাকে মোটেই সুনজরে দেখতেন না। বাংলা ভূখণ্ডে একশ্রেণির মানুষ বাস করে যারা এ দেশের খায়, এ দেশের পরে কিন্তু স্বপ্ন দেখে ইরান, তুরান, ইউরোপের, পাকিস্তানের। এরা পরগাছার মতো। এদের ভাষাপ্রেম তো নেই-ই, দেশপ্রেমও নেই। দেশপ্রেম আর ভাষাপ্রেম পরস্পর পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। যার দেশপ্রেম থাকে তার ভাষাপ্রেমও থাকে। যার দেশপ্রেম থাকে না, তার ভাষাপ্রেমও লোপ পায়। যুগে যুগে বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে যে কত রকম ষড়যন্ত্র হয়েছে তার দু-একটি নমুনা তুলে ধরতে চাই। ১৩৩৩ বঙ্গাব্দে ‘রওশন হেদায়েত’ নামে একটি পত্রিকা তার ‘লেখক-লেখিকাদের প্রতি’ নিবেদন করে বলে- ‘হিন্দুয়ানি বাঙালি না হইয়া দোভাষী অর্থাৎ বাঙ্গালা ভাষার মধ্যে আরবি, ফারসি ও উর্দু ভাষা প্রয়োগ বাঞ্ছনীয়। অ-ইসলামিক শব্দ যেরূপ স্বর্গ, নরক, যুগ, ত্রিভুবন, ঈশ্বর, ভগবান, নিরঞ্জন, বিধাতা ইত্যাদি প্রবন্ধে থাকিলে, সে প্রবন্ধ বাহির হইবে না। লেখকগণের খেয়াল করা দরকার, বুজুর্গানে দীনে যখন এ দেশে ইসলাম প্রচার করেছিলেন তখন তাহারা এ দেশের ভাষার মধ্যে ইসলামিক ভাষা প্রবেশ করাইয়া সর্বসাধারণকে ইসলাম শিক্ষা দিয়াছিলেন। রওশন হেদায়েতেরও প্রধান উদ্দেশ্য ইসলাম শিক্ষা দেওয়া; কাজেই কালামে কুফর প্রকাশ হওয়া উচিত নয়।’ অর্থাৎ যারা মনে করে আরবি, ফারসি, উর্দু ছাড়া অন্য ভাষা গ্রহণ করলেই বাংলা ভাষার চরিত্র নষ্ট হয় তারা প্রকারান্তরে বাংলা ভাষার শত্রুই। পৃথিবীতে হাতেগোনা কয়েকটি ভাষা ছাড়া সব ভাষার মধ্যেই প্রচুর ঋণ শব্দ আছে। বাংলা ভাষার মধ্যেও প্রচুর ঋণ শব্দ ঢুকে পড়েছে কিংবা বলা যায়- নিজের প্রয়োজনেই বাংলা ভাষা বিদেশি শব্দ ঋণ নিয়েছে। 

 

১৭.

আর তাই আবারো বলতে হয়, ভাষা নদীর স্রোতের মতো সতত বহমান, যা সমসাময়িক সময়ের সঙ্গে অন্তরঙ্গতায় মিলেমিশে একীভূত হয়। ড. আকবর আলি খান যেমনটি বলছেন, জনভাষার ক্ষেত্রে আমি উদার থাকতে চাই। ইংরেজি, আরবি, ফারসি- সব শব্দই আমরা নিয়েছি। ভবিষ্যতে হয়তো আরও নেব। কিন্তু সেটা গ্রহণের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই হবে। সমস্যা হচ্ছে বিদেশি শব্দের অহেতুক অনুপ্রবেশ। বিশেষ করে ইংরেজির। এর একটা কারণ হচ্ছে, আমরা বাংলা পড়ার ব্যাপারে উদাসীন। আর আমাদের সে উদাসীনতার জন্য শিক্ষাক্রমের অচিন্তিত সূচিও দায়ী। আরেকটি বিষয় হলো সামগ্রিকভাবেই বই পাঠের অভ্যাস কমে যাচ্ছে। যার ফলে বাংলার সঙ্গে যোগাযোগও কমে যাচ্ছে দিন দিন। বই পড়ার সুযোগ তৈরি করবে এমন পাঠাগারও নেই। শক্তিশালী পাঠাগার আন্দোলন প্রয়োজন। এ কাজে সরকারি-বেসরকারি সবার অংশগ্রহণ চাই। জনগণের ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে এখন আকাশ সংস্কৃতির কিংবা এমন আরও মাধ্যমে বিদেশি ভাষার যে অনুপ্রবেশ নিয়ে কথা বলতে শুনি- সেক্ষেত্রে আমার মনে হয়,কোনো ভাষার বিরোধিতার চেয়ে বড় কথা হলো নিজের ভাষাকে আগে রপ্ত করা প্রয়োজন। কেউ বলে সাংস্কৃতিক ঐক্যই ভাষার ঐক্য নির্মাণ করে। আবার কারও মতে, ভাষার ঐক্যই সাংস্কৃতিক ঐক্য বিনির্মাণ করে। এ দুই চিন্তার যেটাই সত্যি হোক না কেন, আসল কথা হলো ভাষাকে উন্নত করতে হবে প্রতিনিয়ত। সেজন্য যে যে ক্ষেত্র ভাষার উন্নয়নের সঙ্গে জড়িত তাদের সুসমন্বয় প্রয়োজন। 

 

১৮.

আমার বাংলা ভাষা সংগ্রামের এই ফেব্রুয়ারি মাসে তথা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষার এই মাসে সকল ভাষা সৈনিকের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় প্রণতি জানাই। অর্থনৈতিক অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গেই বাংলা ভাষা এবং সাহিত্যের অগ্রগতি সাধিত হবে। যে অগ্রগতি জনভাষা হিসেবে বাংলাকে আরও উন্নতির দিকে নিয়ে যাবে সময়ের সাবলীল গতির সঙ্গে সঙ্গে। সকল প্রকার বিকৃতি প্রতিরোধ করে শুদ্ধতার পথেই দীর্ঘজীবী হোক, আত্মমর্যাদায় বলীয়ান হোক আমাদের প্রিয় বাংলা ভাষা।

 

লেখকঃ মহুয়া মোহাম্মদ, গণমাধ্যমকর্মী

সব খবর