আমরা জেন জি। আমরা সেই প্রজন্ম - যাহারা বিদ্যালয়ের করিডোরে দৌড়াইয়াছি, শহরের রাস্তায় গান গাহিয়াছি, অনলাইনে হ্যাংআউট করিয়াছি। আমরা বলিয়াছিলাম আমরা সকলি বুঝি, আমাদের জ্ঞান দিবার দরকার নাই। আজ বুঝিতেছি, ঘটনা বিপরীত। আজ বুঝিতেছি, বান্ধবের মুখোশগুলি ধীরে ধীরে ছিঁড়িতেছে, খসিয়া পড়িতেছে, হাসি‑মুখে যে কণ্ঠগুলো আমাদের কাছে মিষ্টি কথা বলিত, তাহারাই এখন নখর, দাঁত, কাঁটা দেখাইতেছে।
দেশের আনাচে কানাচে দেখিতেছি আমাদের গান নিয়া, পোষাক নিয়া, চিন্তা নিয়া হুমকি দিতেছে, সরকার বাহাদুরকে ধমক দিতেছে, কর্মকর্তাদিগকে পদানত করিতেছে, বাউলদের মারিতেছে, সাধুদের ধরিতেছে, শিল্পীদের কাড়িতেছে। নির্বাচনের মাঠে আল্লাহর দোহাই দিয়া ভোট চাহিতেছে, ধর্মের ঠিকাদারি নিতেছে - কী চলিতেছে এইসব?
আগে আমরা শুনিতাম, প্রবীনেরা বলিত “জামায়াতের নামে আতঙ্ক আছে।” আমরা হাসিয়া উড়াইয়া দিতাম, বলিতাম জুজু হইতে আমরা মুক্ত, ভূতের ভয় আমাদের প্রকম্পিত করেনা। অথচ আজ সেই আতঙ্ক বাস্তবে নামিয়া আসিয়াছে; গল্প আর বাস্তবতার মধ্যকার পার্থক্য ঘুচিয়াছে।
আজ আমরা অসহায়ত্বে বন্দী হইয়াছি। আমরা জানিনা কীভাবে দাঁড়াইবো। পাঠপুস্তকে ইতিহাস পড়িয়াছি, প্রবীণদিগের কাহিনি শুনিয়াছি—একাত্তরের ভয়াবহ স্মৃতি, রাজাকারদের কাহিনি। সেই কাহিনি যেন আজ ফিরিয়া ফিরিয়া আসে। আজ রাজাকারদিগকে দেশপ্রেমিক বলা হইতেছে, মুক্তিযোদ্ধাকে সন্দেহ করা হইতেছে, ইতিহাসের নামগুলি উল্টাইয়া যাইতেছে। আমরা হতবাক হইয়া বলি, “আমরা তো বুঝি নাই।” কিন্তু এখন হাড়ে হাড়ে টের পাইতেছি এবং আমরা কাঁপিতেছি।
জামায়াতের রাজনীতি এখন আর কেবল বক্তৃতা নয়; ইহা ক্ষমতার খেলা। ধর্মকে সামনে রাখিয়া যে ভাষা উঠিতেছে, তাহা ধর্ম নয়, ভয়ের বাতাবরণ। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো, যেখানে জ্ঞান জন্মায়, সেখানে এখন অজ্ঞানতার অন্ধকার। যেইখানে শিক্ষার্থীদিগের মুক্ত চিন্তা থাকিবার কথা, সেইখানে এখন দখলের ছায়া। সংখ্যালঘুদের ওপর চাপ, ভোটারদের ওপর ভয়, অন্য রাজনৈতিক দলের কর্মীদের ওপর হুমকি—এসব দেখিয়া আমরা হতভম্ব।
এই যে মুখোশ খসিয়া পড়িতেছে, তাহার ভেতর হইতে পুরোনো রং বাহিরিয়া আসিতেছে। পুরাতন সম্পর্কের সূত্রপাত দেখা যাইতেছে; পাকিস্তানের সঙ্গে যে পুরাতন বন্ধন ছিল, তাহারই ছায়া আবার ঘনাইয়া উঠিতেছে। ইতিহাসের সেই কুয়াশা ধীরে ধীরে জমিয়া উঠিতেছে। প্রবীণরা কাঁধ ঝাঁকাইয়া বলে, “আমরা কহিয়াছিলাম।” আমরা শুনি, কিন্তু কণ্ঠে কোনো প্রতিরোধ নাই; কেবল নীরবতা আর ভীতির সুর।
আমাদের চিন্তার জগতে এক অদ্ভুত দ্বন্দ্ব দেখা যাইতেছে। একদিকে আমাদের স্বাধীনতার গল্প, অন্যদিকে আজকের বাস্তব। আমরা জানি যে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ভয়ানক হইতে পারে। আমরা জানি যে মুখোশ খসিয়া পড়িলে সত্যের মুখোমুখি হইতে হয়। কিন্তু আমরা কিভাবে দাঁড়াইবো? আমরা অনলাইনে প্রতিবাদ করি, কথায় কাঁপুনি দেখাই, কিন্তু মাঠে দাঁড়াইবার সাহস কোথায়?
আমাদের জবানবন্দীতে কোনো উস্কানি নাই, কোনো হিংসার আহ্বান নাই। ইহা কেবলই একখানা সতর্কবার্তা। যে আতঙ্ক একসময় গল্প ছিল, আজ বাস্তবে রূপ নিয়াছে। ইতিহাসের ভয়াবহ অধ্যায়গুলোকে আমরা আর পুনরাবৃত্তি হইতে দিব না এই ইচ্ছা আমাদের অন্তরে আছে। কিন্তু ইচ্ছা আর বাস্তবের মধ্যে দূরত্বও আছে। সেই দূরত্ব পাড়ি দিতে হইবে জ্ঞান, সংলাপ ও সাহস নিয়া।
আমরা জেন জি; আমরা বলি আমরা তো বুঝি নাই। কিন্তু এখন বুঝিয়া আমরা কাঁপিতেছি, ভয় পাইতেছি, সতর্ক হইতেছি। মুখোশ খসিয়া পড়ুক, সত্য বাহিরিয়া আসুক তবু আমরা দাঁড়াইবো। দাঁড়াইবো ইতিহাসের স্মৃতি নিয়া, প্রবীণদের কাহিনি মনে রাখিয়া, নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন রক্ষায়। কারণ যদি স্বপ্নই হারাইয়া যায়, আমাদের রহিবে কী?
লেখকঃ এক ক্লান্ত পেনসিল - যে তাহার কলঙ্কিত সময়কে অভিশাপের কালিতে লিপিবদ্ধ করিয়া রাখে