সর্বশেষ

বিদায় ২০২৫, স্বাগত ২০২৬

বাংলাদেশের সামনে আশা, চ্যালেঞ্জ ও শঙ্কা

প্রকাশিত: ১ জানুয়ারি ২০২৬, ০০:০৯
বাংলাদেশের সামনে আশা, চ্যালেঞ্জ ও শঙ্কা

আরও একটি বছর ইতিহাসের পাতায় যুক্ত হলো। ২০২৫ বিদায় নিল বাংলাদেশের জন্য এক গভীর অস্বস্তির স্মৃতি নিয়ে। এই বছরটি কেবল রাজনৈতিক অস্থিরতার নয়; বরং সামাজিক নিরাপত্তা, মানবাধিকার, অর্থনীতি এবং গণতান্ত্রিক আস্থার একাধিক স্তরে সংকটের প্রতিচ্ছবি হয়ে রইল। নতুন বছর ২০২৬ আমাদের সামনে এসে দাঁড়াচ্ছে নতুন প্রত্যাশা নিয়ে, কিন্তু সেই প্রত্যাশার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কঠিন কিছু প্রশ্ন, চ্যালেঞ্জ এবং গভীর শঙ্কাও।

 

২০২৫ সালে রাজনৈতিক অস্থিরতা সমাজের প্রায় সব স্তরে ছাপ ফেলেছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্য বলছে, বছরজুড়ে দেশে অন্তত ৪০১টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে; এতে নিহত হয়েছেন অন্তত ১০২ জন এবং আহত হয়েছেন প্রায় ৪ হাজার ৭৪৪ জন। রাজনৈতিক মতবিরোধ যেখানে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সমাধানের কথা, সেখানে বাস্তবে তা রূপ নিয়েছে সংঘর্ষ, হামলা ও প্রাণহানিতে। আন্দোলন, পাল্টা আন্দোলন, হরতাল ও অবরোধকে কেন্দ্র করে প্রতিহিংসার রাজনীতি সমাজকে আরও বিভক্ত করেছে।

 

এই রাজনৈতিক অস্থিরতার সমান্তরালে বেড়েছে মব সহিংসতা ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড। ২০২৫ সালে অন্তত ৪০ জন ব্যক্তি বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হয়েছেন। একই সঙ্গে সন্দেহ, গুজব ও উসকানির ভিত্তিতে সংঘটিত মব হামলায় অন্তত ২০০ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। এসব ঘটনায় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নিষ্ক্রিয়তা কিংবা জবাবদিহির অভাব আইনের শাসন নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।

 

মতপ্রকাশের স্বাধীনতাও ছিল চাপে। মানবাধিকার সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালে অন্তত ৩৮১ জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হন; তিনজন নিহত হন এবং চারজনের মরদেহ রহস্যজনকভাবে উদ্ধার হয়। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, সন্ত্রাসবিরোধী আইন ও জননিরাপত্তা-সংক্রান্ত বিধান মতপ্রকাশ নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ বছরজুড়েই ছিল। এমনকি বছরের শেষ দিকে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার কার্যালয়ে হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা সংবাদপত্রের স্বাধীনতার ওপর নজিরবিহীন আঘাত হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

 

এই অস্থিরতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে একটি গভীর অর্থনৈতিক সংকট। ২০২৫ সালে মূল্যস্ফীতি কার্যত সাধারণ মানুষের সহনশীলতার সীমা ছাড়িয়ে যায়। বিশ্বব্যাংক ও দেশীয় জরিপের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ২০ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যের দিকে পিছিয়ে গেছেন। দারিদ্র্যের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৭.৯ শতাংশে, আর চরম দারিদ্র্য বেড়েছে ৯ শতাংশের কাছাকাছি। শ্রমবাজারেও নেতিবাচক চিত্র স্পষ্ট—শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার কমে এসেছে, বিশেষ করে নারীদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে।

 

বেকারত্ব ও আংশিক কর্মসংস্থান তরুণ সমাজে হতাশা বাড়িয়েছে। শিল্প ও বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও নীতিগত অস্থিরতা বিনিয়োগকারীদের আস্থা ক্ষুণ্ন করেছে, যার প্রভাব পড়েছে কর্মসংস্থান ও উৎপাদনে।

 

এই সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে ২০২৬ সালের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হতে যাচ্ছে জাতীয় সংসদ নির্বাচন। কিন্তু সেই নির্বাচন ঘিরেই তৈরি হয়েছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকার দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের কার্যক্রম স্থগিত করে এবং নির্বাচন কমিশন তাদের নিবন্ধনও স্থগিত রাখে। ফলে আওয়ামী লীগ আসন্ন নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না। একই সঙ্গে ১৪ দলীয় জোটের অধিকাংশ দল নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিয়েছে। এতে নির্বাচন কতটা অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে—সে প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

 

একটি গণতান্ত্রিক নির্বাচন কেবল ভোটগ্রহণের প্রক্রিয়া নয়; এটি অংশগ্রহণ, প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও জনগণের আস্থার সমষ্টি। বৃহত্তম রাজনৈতিক শক্তির অনুপস্থিতিতে নির্বাচন একপক্ষীয় হয়ে পড়ার আশঙ্কা বাড়ে, যা দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও গণতান্ত্রিক বিশ্বাসকে দুর্বল করতে পারে।

 

তবু ২০২৫ পুরোপুরি অন্ধকারের বছর ছিল না। নাগরিক সমাজ, মানবাধিকারকর্মী, সাংবাদিক ও সচেতন নাগরিকেরা ঝুঁকি নিয়েও কথা বলেছেন, প্রতিবাদ করেছেন, প্রশ্ন তুলেছেন। এই প্রতিরোধই প্রমাণ করে—গণতন্ত্রের আকাঙ্ক্ষা এখনো সমাজে জীবিত।

 

২০২৬ তাই একসঙ্গে আশা, চ্যালেঞ্জ ও শঙ্কার বছর। আশা— রাজনৈতিক সংলাপের পথ খুলবে, নির্বাচন হবে বিশ্বাসযোগ্য, মানবাধিকার ও অর্থনীতি ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধারের পথে ফিরবে। চ্যালেঞ্জ— এই সংকটপূর্ণ বাস্তবতায় আস্থা ফেরানো, অংশগ্রহণমূলক রাজনীতি নিশ্চিত করা। আর শঙ্কা— যদি অন্তর্ভুক্তিমূলক পথ সংকুচিত হয়, তবে অস্থিরতা আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে।

 

বিদায়ী ২০২৫ আমাদের শিখিয়েছে গণতন্ত্র কেবল নির্বাচন নয়; এটি আইনের শাসন, মানবাধিকার, সামাজিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক ন্যায়ের সমষ্টি। নতুন বছরে সেই উপলব্ধিই হোক পথচলার দিশা।

 

স্বাগত ২০২৬—আশা করি, এই বছর বাংলাদেশকে আবারও সংলাপ, সহনশীলতা ও গণতান্ত্রিক বিশ্বাসের পথে ফিরিয়ে আনবে। বাংলাদেশে জোরদার হবে আন্তঃসাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যের বন্ধন।

 

শুভ নববর্ষ।

সব খবর