সর্বশেষ

কেমন হলো একুশের বইমেলা?

বিক্রির হিসেব নিয়ে একাডেমির শুভঙ্করের ফাঁকি, দেনা নিয়ে ঘরে ফিরছেন প্রকাশক

মাহবুব রেজা বিডি ভয়েস
প্রকাশিত: ১৫ মার্চ ২০২৬, ০২:১৯
বিক্রির হিসেব নিয়ে একাডেমির শুভঙ্করের ফাঁকি, দেনা নিয়ে ঘরে ফিরছেন প্রকাশক

এবছর দেশের ইতিহাসে স্মরণকালের সেরা ফ্লপ বইমেলা উপহার দিল বাংলা একাডেমি। একদিকে আশংকার চেয়েও কম বই প্রকাশ অন্যদিকে শূন্য সূচকে বইবিক্রি তৈরি করেছে এক নতুন মাইল ফলক। মেলায় আশংকাজনকভাবে মুক্তিযুদ্ধের ওপর নতুন বই নেই জানিয়ে সংশ্লিষ্টরা জানান, এবারে দর্শকশূন্য মেলা পরিণত হয়েছে লোক হাসানোর এক হাস্যকর মেলায়।


প্রকাশকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, মেলার নিত্যদিনের খরচ, স্টলের বিক্রয়কর্মীদের বেতন দিয়ে স্টলের বই বাংলাবাজারে নিয়ে যাওয়ার খরচের সংকুলান কিভাবে করবেন তা নিয়ে চিন্তিত। তারা জানান, বেশিরভাগ প্রকাশক ঈদের আগে দেনা নিয়ে ঘরে ফিরবেন। এবারের ঈদে ঘরে রান্নাবান্না হবে কিনা তা নিয়েও কেউ কেউ শংকা প্রকাশ করেছেন।  
 

জানা যায়, এবারের বইমেলা নিয়ে শুরু থেকেই এর দিকে ছিল একাডেমির অশুভ দৃষ্টি। তারা নানা অজুহাতে মেলাকে ফেব্রুয়ারি থেকে পিছিয়ে দিয়ে এর চিরায়ত চেহারাকে পাল্টে দেয়ার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল। একাডেমীর এই ষড়যন্ত্রে ইসলামী ভাবধারার কয়েকজন শীর্ষ মৌলবাদী প্রকাশক জড়িত ছিল বলে তারা জানান। 
 

প্রকাশক নেতৃবৃন্দদের অনেকেই জানিয়েছেন, বিনা পয়সায় স্টল বরাদ্দ দেয়ার নামে একাডেমি এবছর বইমেলা নিয়ে দায়সারা গোছের আয়োজন করেছে তা এক কলঙ্কজনক অধ্যায়ের সৃষ্টি করেছে। 
 


মেলায় বই বিক্রি কেমন জানতে চাইলে একাধিক প্রকাশক জানিয়েছেন, এবারের বইমেলা তাদের অনেকের হাতে হারিকেন আর পাছায় ইয়ে ধরিয়ে দিয়েছে। প্রকাশকদের একথার সত্যতা বেরিয়ে আসে যখন আনন্দলোক প্রকাশনীর বিক্রয়কর্মী গালিব সোহানের কথায়। সোহান জানান, মেলার ১৬ তম দিনে তারা মাত্র দুই হাজার টাকার বই বিক্রি করেছেন।


মেলার বিক্রির পরিসংখ্যান অনুযায়ী জানা যায় ২০২৩, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে মেলায় বই বিক্রি হয়েছিল যথাক্রমে ৪৭ কোটি, ৬০ কোটি ও ৪০ কোটি টাকার। এই হিসেব নিয়েও প্রকাশকদের মধ্যে সন্দেহ ও দ্বিমত রয়েছে। তারা বলছেন, একাডেমি দীর্ঘদিন ধরে মেলার বিক্রির পরিমাণ নিয়ে তৈরি করে এক ধরনের ধোঁয়াশা। তারা প্রতিবছর সংবাদ মাধ্যমকে বই বিক্রির যে মনগড়া হিসেব দেয় তা নিয়ে প্রকাশকসহ লেখক পাঠকদের মধ্যে তৈরি হয় এক রহস্যের। মেলা পরিচালনা কমিটির এধরনের মনগড়া হিসেব নিয়ে প্রকাশকদের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে। তারা একাডেমির হিসেবকে সঠিক বলে মানতে নারাজ। তারা বলছেন, একাডেমি বইমেলার বিক্রির প্রকৃত হিসেব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রকাশকদের অন্ধকারে রেখে এক ধরনের তামাশায় মেতে উঠেছেন। মেলার শেষদিন গণমাধ্যমের সামনে তুলে ধরা মেলা পরিচালনা কমিটির গৎবাঁধা বিক্রির হিসেবকে শুভঙ্করের ফাঁকি হিসেবে উল্লেখ করছেন প্রকাশকরা। তারা বলছেন, এক দশক ধরে মেলা পরিচালনা কমিটি এ ব্যাপারে তাদের একক কর্তৃত্ব বজায় রেখে প্রকাশনা সংশ্লিষ্টদের অন্ধকারে রেখে বই বিক্রির বিষয়ে তারা নিজেদের মনগড়া হিসেব দিয়ে সবাইকে অন্ধকারে রাখে। 
 

তিন বছরের মেলার বিক্রিকে সামনে রেখে এবছরের বিক্রির পরিমাণ কেমন হতে পারে জানতে চাইলে প্রকাশকদের একটি বড় অংশ জানান, এবছরের মত এত বাজে মেলা ইতিহাসে নজিরবিহীন। বেচাকেনার বাস্তব অবস্থা বিবেচনায় নিলে এবছর সব মিলিয়ে দশ কোটি টাকার বই বিক্রি হয়েছে কিনা তা নিয়ে আমরাই সন্দিহান। অবশ্য মেলা পরিচালনা কমিটি তাদের হিসেবে কত কোটি টাকার হিসেব গণমাধ্যমে দেবে তা নিয়ে আমাদের আগ্রহ নেই।  
 


অন্যান্য বছর বিক্রি নিয়ে ছোট প্রকাশকদের মধ্যে হতাশা দেখা দিলেও এবছর বড় বড় প্রকাশকদের মধ্যেও ফুটে উঠেছে সে চিত্র। 
 

চারুলিপি প্রকাশনির হুমায়ুন কবির জানান, এবারের মেলায় দিনের পর দিন অনেক স্টলেই বই বিক্রি হয়নি যা মেলায় আগে কখনো পরিলক্ষিত হয়নি। বইমেলার এই করুন পরিণতি কিংবা অপমৃত্যুর জন্য এককভাবে একাডেমী দায়ী। বইমেলা নিয়ে ষড়যন্ত্র ও এর সামগ্রিক ব্যর্থতার দায়ভার নিয়ে একাডেমীর মহাপরিচালক মোহাম্মদ আজমের দ্রুত পদত্যাগ দাবী করেন তিনি।
 

বিদ্যাপ্রকাশের মজিবর রহমান খোকা মেলা নিয়ে নিজের হতাশা ব্যক্ত করে জানান, এবারের মেলায় বই প্রকাশ আর বিক্রিতে যে করুণ দশা তার  কাফফারা প্রকাশকদের আগামি কয়েকবছর ধরে দিয়ে যেতে হবে। আমরা এধরনের বইমেলা আশা করিনি।
 

১৩ মার্চ ইফতারের পর আচমকা শিলাবৃষ্টির কবলে বইমেলা আক্রান্ত হলে লিটল ম্যাগ চত্বরের এক প্রকাশক রসিকতা করে জানালেন, বাংলা একাডেমির সাথে হাত মিলিয়ে প্রকৃতিও আমাদের ওপর বিরুপ আচরণ করতে ছাড়ল না। 
 


সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলা একাডেমির স্বেচ্ছাচারিতায় এবারের বইমেলা পরিণত হয়েছে এক তামাশায়। তারা দায়িত্বশীলদের কাছে প্রত্যাশা করতে চান, আগামীতে ঐতিহ্য আর গৌরবের একুশের বইমেলা যেন অর্বাচীনদের হাতে পড়ে সাধারণ মানুষের বাইরে চলে না যায়।

সব খবর