দেশজুড়ে হামের প্রাদুর্ভাব উদ্বেগজনক মাত্রায় পৌঁছেছে। বিশেষ করে রাজশাহী অঞ্চলে পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। এখন পর্যন্ত রাজশাহীসহ বিভাগের বিভিন্ন স্থানে হামে আক্রান্ত হয়ে অন্তত ১৫ জনের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করেছেন স্বাস্থ্য সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী।
বুধবার সচিবালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) সহায়তায় পরীক্ষিত ৩৩টি নমুনার মধ্যে ১৫টি মৃত্যুর সঙ্গে হামের সরাসরি সম্পর্ক পাওয়া গেছে। ফলে রাজশাহী অঞ্চলে বিশেষ নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।
১০ জেলায় সংক্রমণ, বাড়ছে শিশুমৃত্যু
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের অন্তত ১০টি জেলায় হামের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। এর মধ্যে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে ১২ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। ঢাকার সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে পাঁচ শিশু এবং একটি বেসরকারি হাসপাতালে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। ময়মনসিংহে মারা গেছে তিন শিশু।
গত মাসে হামে আক্রান্তের সংখ্যা দেড় হাজার ছাড়িয়েছে। শুধু রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেই বর্তমানে ১১৭ শিশু চিকিৎসাধীন, যার মধ্যে ১২ জন আইসিইউতে এবং আরও ৫৬ জন আইসিইউ সেবার অপেক্ষায় রয়েছে।
আইসিইউ সংকট ও অব্যবস্থাপনা
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আইসিইউ সুবিধার অভাবে গত ১৫ দিনে ৪৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গেছে। যদিও তাদের মধ্যে কতজন সরাসরি হামে আক্রান্ত ছিল, সে বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।
একই চিত্র দেখা যাচ্ছে রাজধানীর মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে। ১০০ শয্যার হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা ১১৭ ছাড়িয়ে গেছে। শয্যা সংকটে অনেক শিশুকে করিডোর, বারান্দা এমনকি সিঁড়িতেও চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।
টিকার ঘাটতি ও ইপিআই কার্যক্রমে ব্যাঘাত
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিস্থিতির জন্য বড় কারণ হলো নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) ব্যাহত হওয়া। গত এক বছরে টিকার ঘাটতি এবং মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের আন্দোলনের কারণে অনেক শিশু নির্ধারিত সময়ে টিকা পায়নি।
বিশেষজ্ঞ ডা. নিজাম উদ্দিন জানান, ইপিআই কর্মসূচিতে ৩০-৩৫ শতাংশ পদ শূন্য থাকাও বড় সংকট তৈরি করেছে। ফলে টিকা না পাওয়া শিশুরাই এখন সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।
সবচেয়ে ঝুঁকিতে কম বয়সী শিশু
চিকিৎসকদের মতে, আক্রান্ত শিশুদের বড় অংশই ৬ মাস থেকে ২ বছরের মধ্যে। অনেক ক্ষেত্রে ৯ মাসের কম বয়সী শিশুরাও আক্রান্ত হচ্ছে, যাদের টিকা নেওয়ার সময়ই হয়নি। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, আক্রান্তদের ৬৫ শতাংশই ৬ মাসের নিচে।
হাম অত্যন্ত সংক্রামক রোগ। একজন আক্রান্ত ব্যক্তি গড়ে ১৩ থেকে ১৮ জনকে সংক্রমিত করতে পারে। হাঁচি-কাশি বা সরাসরি সংস্পর্শের মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এ রোগ।
জটিলতা ও মৃত্যুঝুঁকি
চিকিৎসকরা জানান, হাম থেকে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, চোখ ও মস্তিষ্কে প্রদাহসহ নানা জটিলতা দেখা দেয়। বিশেষ করে অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের ক্ষেত্রে মৃত্যুঝুঁকি অনেক বেশি।
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালের চিকিৎসকরা বলছেন, হামের নির্দিষ্ট কোনো অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা নেই। উপসর্গ অনুযায়ী চিকিৎসা দিতে হয়। ফলে প্রতিরোধই সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
সারাদেশে হাসপাতালগুলো চাপের মুখে
চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, কুষ্টিয়া, নোয়াখালী, বরিশালসহ বিভিন্ন জেলায় একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। কোথাও এক বেডে দুই-তিন শিশু, আবার কোথাও মেঝেতে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
চট্টগ্রামে একদিনে ২৬ শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। ময়মনসিংহ মেডিকেলে গত কয়েক দিনে ১৪৩ শিশু ভর্তি হয়েছে, যার মধ্যে পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। কুষ্টিয়ায় ২৪ ঘণ্টায় ৯৭ শিশু ভর্তি হয়েছে, যাদের অনেকের শরীরে হামের লক্ষণ দেখা গেছে।
সরকারের জরুরি পদক্ষেপ
পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ৬০৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়ে দ্রুত টিকা কেনার উদ্যোগ নিয়েছে। পাশাপাশি আইসিইউ ও ভেন্টিলেটর বাড়ানো, বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি চালু এবং সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালগুলোকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালকে হামের জন্য ডেডিকেটেড করা হয়েছে এবং পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
পুনঃটিকাদান কর্মসূচির পরিকল্পনা
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, আক্রান্ত এলাকাগুলোতে ব্যাপক পুনঃটিকাদান কার্যক্রম চালানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ৫ এপ্রিল বিশেষজ্ঞ কমিটির বৈঠকে এ বিষয়ে আরও সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
এছাড়া নতুন কোনো ভাইরাসের ধরন জড়িত কিনা তা জানতে রোগীদের নমুনা বিদেশেও পাঠানো হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামের সংক্রমণ ঠেকাতে সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো সময়মতো টিকা নিশ্চিত করা। শিশুকে ৯ মাস বয়সে প্রথম ডোজ এবং ১৫ মাসে দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তারা বলেন, জ্বর, কাশি, সর্দি, চোখ লাল হওয়া বা শরীরে র্যাশ দেখা দিলে দেরি না করে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আগেই সতর্ক করেছিল, টিকাদান কর্মসূচি ব্যাহত হলে হামের প্রাদুর্ভাব বাড়তে পারে। ইউনূস সরকারের অব্যবস্থাপনা ও গাফিলতিতে বর্তমানে বাংলাদেশে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা সেই আশঙ্কাকেই বাস্তবে রূপ দিচ্ছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। তাই এখনই টিকাদান জোরদার, স্বাস্থ্যব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং জনসচেতনতা বাড়ানো জরুরি।