জুলাই দাঙ্গায় সরকার পতনের পর গত ১৬ মাসে সারাদেশে অন্তত ১১৩টি মাজার ও দরগাহে হামলার ঘটনা ঘটেছে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান রাসা সেন্টার ও মাকামের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি হামলা হয়েছে ঢাকা বিভাগে। এ বিভাগের ৯ জেলায় ৩৭টি স্থাপনায় হামলা হয়েছে। চট্টগ্রাম বিভাগে পাঁচ জেলায় ২৭টি হামলার ঘটনা ঘটেছে।
২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের শুরুর দিকে হামলার সংখ্যা হঠাৎ বেড়ে যায়। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং জানিয়েছিল, মাত্র সাড়ে পাঁচ মাসে ৪০টি মাজারে ৪৪টি হামলা হয়েছে। এসব হামলায় ভাঙচুর, লুটপাট, ভক্তদের ওপর আক্রমণ এবং অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। পুলিশ জানিয়েছে, এ পর্যন্ত ২৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনা ঘটে গত বছরের ৫ সেপ্টেম্বর রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে। সেখানে নুরুল হক ওরফে নুরাল পাগলার কবরকে শরিয়তবিরোধী আখ্যা দিয়ে ‘তৌহিদী জনতা’ হামলা চালায়। তারা মরদেহ তুলে আগুনে পুড়িয়ে দেয়। ওই ঘটনায় অর্ধশতাধিক মানুষ আহত হন। এরপর থেকে দরবারের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায় এবং পরিবার-অনুসারীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
কবি ও চিন্তক ফরহাদ মজহার বলেন, “আমরা যা বলি তাই ঠিক, বাকিটা ভুল—এই ধারণাই ফ্যাসিজম। মাজার, গান-বাজনা ঠিক নয় বলে যারা হামলা চালাচ্ছে, তারা আসলে ইসলামবিরোধী।” তিনি সরকারের নিষ্ক্রিয়তার সমালোচনা করে বলেন, শক্ত হাতে বিশৃঙ্খলাকারীদের মোকাবিলা করতে পারেনি সরকার।
মাকামের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, হামলার প্রধান কারণ ধর্মীয় মতাদর্শগত বিরোধ। মাজারকে ‘শিরক-বেদাত’ আখ্যা দিয়ে হামলার বৈধতা তৈরি করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা হামলাকারীদের উৎসাহিত করেছে। ঢাকা বিভাগের ৮০ শতাংশ ও চট্টগ্রামের ৯০ শতাংশ ঘটনায় কোনো মামলা বা তদন্তের অগ্রগতি নেই।
চট্টগ্রাম বিভাগে সবচেয়ে বেশি হামলা হয়েছে কুমিল্লায়, ১৭টি। এছাড়া ব্রাহ্মণবাড়িয়া, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারেও হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসব হামলায় নারীসহ অন্তত ৩১ জন আহত হয়েছেন।
রাসা সেন্টার জানিয়েছে, হামলায় ক্ষতির পরিমাণ ৫১০ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এ বিষয়ে হাইকোর্টে রিট করা হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সৈয়দা জাহিদা সুলতানা রত্মাজী বলেন, আদালতে ক্ষতির তালিকা জমা দেওয়া হয়েছে এবং শিগগিরই শুনানি হবে।
শিক্ষক ও অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদ বলেন, মাজার, মসজিদ, কবর ভাঙচুর থেকে শুরু করে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বন্ধের ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পিতভাবে ঘটছে। সরকারের অনিচ্ছা ও নিষ্ক্রিয়তাই সহিংসতা অব্যাহত থাকার প্রধান কারণ।
অন্যদিকে হেফাজতে ইসলামের নায়েবে আমির মহিউদ্দিন রাব্বানী বলেন, মাজার শরিয়তের বিধান অনুযায়ী সমর্থনযোগ্য নয়। তবে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া ঠিক নয়। হামলা-ভাঙচুরকে ইসলাম বৈধতা দেয় না।