এবারের ঈদুল ফিতরে সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবীরা দীর্ঘ ছুটি পেয়েছেন। নির্বাহী আদেশে ১৮ মার্চ থেকে টানা ৭ থেকে ১২ দিনের ছুটি ঘোষণার ফলে অনেকেই সময় নিয়ে বাড়ি ফেরার সুযোগ পেয়েছেন। সরকারের পক্ষ থেকে বারবার আহ্বান জানানো হয়েছিল, যেন মানুষ ধৈর্য ধরে স্বাচ্ছন্দ্যে বাড়ি ফেরে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। যানজট, অতিরিক্ত ভাড়া আদায়, দুর্ঘটনা আর অব্যবস্থাপনার কারণে এবারের ঈদযাত্রা হয়ে উঠেছে অস্থির ও রক্তাক্ত।
প্রথম দিকে যাত্রা তুলনামূলক স্বস্তিদায়ক হলেও শেষ দিকে এসে দুর্ভোগ চরমে ওঠে। পোশাক কারখানায় একসঙ্গে ছুটি শুরু হওয়া, ঝড়-বৃষ্টি আর যানবাহনের সংকটে লাখ লাখ মানুষ একযোগে ঢাকা ছাড়তে গিয়ে মহাসড়কে তীব্র যানজট তৈরি হয়। বিশেষ করে চন্দ্রা, যমুনা সেতু ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকতে হয়েছে যাত্রীদের। ফলে নির্ধারিত সময়ের বাস ছাড়তে পারেনি, অনেককে ঝুঁকি নিয়ে ট্রাক-পিকআপে বাড়ি ফিরতে হয়েছে।
সবচেয়ে বড় অভিযোগ ছিল বাড়তি ভাড়া আদায়। মহাখালী, গাবতলীসহ বিভিন্ন টার্মিনালে ২০০ টাকার ভাড়া ৮০০ থেকে ১২০০ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়েছে। অনেক পরিবহন কাউন্টার বন্ধ রেখে ভেতরে যাত্রী ডেকে নিয়ে চারগুণ ভাড়া আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। যাত্রী কল্যাণ সমিতি বলছে, এবারের অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের নৈরাজ্য গত ২০ বছরের রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। যদিও সড়ক পরিবহনমন্ত্রী বারবার দাবি করেছেন, কোথাও বাড়তি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে না। বাস্তবে তার বক্তব্যের সঙ্গে পরিস্থিতির মিল পাওয়া যায়নি।
রেলপথেও বিড়ম্বনা কম ছিল না। বগুড়ায় দুর্ঘটনায় নীলসাগর এক্সপ্রেস লাইনচ্যুত হওয়ায় ট্রেন চলাচল ব্যাহত হয়। কমলাপুর থেকে ছাড়তে দেরি হয়, আর ভেতরে ও ছাদে যাত্রীতে ঠাসা অবস্থায় ট্রেনগুলো ছেড়ে যায়। নৌপথে সদরঘাটে লঞ্চে ওঠার সময় ট্রলার চাপায় দুই যাত্রীর মৃত্যু হয়েছে। বিকল্প টার্মিনাল থাকলেও অব্যবস্থাপনার কারণে দুর্ঘটনা এড়ানো যায়নি।
সড়কে একাধিক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ঘটেছে। বগুড়ায় মাইক্রোবাসে আগুনে তিনজন নিহত, চট্টগ্রামে বাস সংঘর্ষে একজনের মৃত্যু, রাজশাহীতে বাবা-ছেলে নিহত, নওগাঁয় ট্রাক্টর দুর্ঘটনায় দুজনের মৃত্যু—এমন নানা ঘটনায় ঈদযাত্রা রক্তাক্ত হয়ে উঠেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, দীর্ঘ ছুটি থাকলেও একসঙ্গে বিপুল সংখ্যক মানুষের ঢাকা ছাড়ার চাপ, যানবাহনের সংকট এবং অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের প্রবণতা যাত্রীদের মধ্যে মানসিক অস্থিরতা তৈরি করেছে। সেই অস্থিরতা ও খামখেয়ালি আচরণই দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়েছে। সদরঘাটে নিরাপত্তা বেষ্টনী না থাকায় যাত্রীরা জীবন ঝুঁকি নিয়ে ট্রলারে লঞ্চে উঠতে বাধ্য হয়েছেন।
সরকারি পর্যায়ে সর্বাত্মক চেষ্টা থাকলেও বাস্তবে ফিটনেসবিহীন গাড়ি, ছোট যানবাহনের চলাচল এবং পরিবহন খাতে সিন্ডিকেটের কারণে নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিত করা যায়নি। মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও পরিবহন মন্ত্রী সবাইকে ধৈর্যশীল হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। কিন্তু যাত্রীদের অভিযোগ, কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা, পরিবহন মালিকদের নৈরাজ্য এবং যাত্রীদের অস্থির মানসিকতা মিলেই এবারের ঈদযাত্রাকে দুর্ভোগময় করে তুলেছে।
রেকর্ড ছুটির ঈদযাত্রায়ও স্বস্তি আসেনি। যানজট, বাড়তি ভাড়া আর দুর্ঘটনায় এবারের ঈদযাত্রা আনন্দের বদলে হয়ে উঠেছে ভোগান্তি ও আতঙ্কের আরেক নাম।