রাজধানী ঢাকায় ৩১ ঘণ্টার ব্যবধানে চার দফা ভূমিকম্প অনুভূত হওয়ায় জনমনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। শুক্রবার সকাল থেকে শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ঘটে যাওয়া এসব কম্পন নতুন করে বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে—বাংলাদেশ বড় ধরনের ভূমিকম্পের উচ্চঝুঁকির মধ্যে রয়েছে এবং বর্তমান ঘটনাগুলো সম্ভবত আরও বড় কম্পনের আগাম ইঙ্গিত।
সন্ধ্যায় দুই সেকেন্ডে দুটি ভূমিকম্প
শনিবার সন্ধ্যায় ঢাকায় দুটি ভূমিকম্প পরপর মাত্র দুই সেকেন্ডের ব্যবধানে অনুভূত হয়। প্রথম কম্পনটি হয় সন্ধ্যা ৬টা ৬ মিনিট ৪ সেকেন্ডে, যার মাত্রা ছিল ৩.৭ এবং উৎপত্তিস্থল ছিল ঢাকার বাড্ডা এলাকা। ঠিক এক সেকেন্ড পর, ৬টা ৬ মিনিট ৫ সেকেন্ডে, আরও একটি ভূমিকম্প হয়, যার মাত্রা দাঁড়ায় ৪.৩ এবং উৎপত্তিস্থল ছিল নরসিংদী। আবহাওয়া অধিদপ্তর শুরুতে দুটি ভূমিকম্পের উৎস হিসেবে বাড্ডার কথা জানালেও পরে তথ্য সংশোধন করে আলাদা দুটি স্থানের কথা নিশ্চিত করে।
শুক্রবারের ভয়াবহ কম্পন
এর আগে শনিবার সকাল ১০টা ৩৬ মিনিটে নরসিংদীর পলাশ উপজেলায় ৩.৩ মাত্রার আরেকটি মৃদু ভূমিকম্প হয়। গবেষণা কেন্দ্রগুলো একে শুক্রবারের বড় ভূমিকম্পের আফটারশক হিসেবে চিহ্নিত করেছে। শুক্রবার সকাল ১০টা ৩৮ মিনিটে ৫.৭ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে ঢাকা, নরসিংদী, নারায়ণগঞ্জসহ আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকা। এতে আতঙ্কে ভবন থেকে লাফিয়ে পড়া, ভবনে ফাটল ধরার মতো ঘটনা ঘটে এবং প্রাণহানি ঘটে ১০ জনের; আহত হন ৬০০-র বেশি মানুষ।
আন্তর্জাতিক সংস্থার তথ্যে ভিন্নতা
শনিবার সন্ধ্যার ভূমিকম্প নিয়ে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর তথ্যে অমিল পাওয়া গেছে। ইউএসজিএস জানায়, কম্পনের মাত্রা ছিল ৪.৩ এবং উৎপত্তিস্থল নরসিংদীর পশ্চিমে প্রায় ১১ কিলোমিটার দূরে, গভীরতা ১০ কিলোমিটার। অন্যদিকে ইএমএসসি জানায়, ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ৩.৭ এবং উৎপত্তিস্থল ঢাকা থেকে মাত্র ৮ কিলোমিটার উত্তর-উত্তর-পূর্বে। তবে উভয় তথ্যই ইঙ্গিত করছে—উৎপত্তিস্থল ঢাকার নিকটবর্তী অঞ্চলেই ছিল।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে জরুরি ব্যবস্থা
পরপর কম্পনে ঢাকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উদ্বেগ বাড়ায় জরুরি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এক জরুরি সভায় পুরোনো আবাসিক হলগুলোর ঝুঁকি মূল্যায়নে বুয়েটের বিশেষজ্ঞ দলকে দায়িত্ব দেয়। ঝুঁকিপূর্ণ অংশ শনাক্ত হলে শিক্ষার্থীদের সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। একইসঙ্গে রবিবার বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ক্লাস ও পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। একই কারণে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ও রবিবারের সব ক্লাস-পরীক্ষা স্থগিত ঘোষণা করেছে, যদিও অফিস কার্যক্রম চলবে।
৩১ ঘণ্টায় চার কম্পন: কী ইঙ্গিত দিচ্ছে?
ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব কম্পন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এগুলো সক্রিয় প্লেট বাউন্ডারির একটি উচ্চচাপযুক্ত অংশে শক্তি মুক্ত হওয়ার ধারাবাহিকতা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ও ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ সৈয়দ হুমায়ুন আখতার সতর্ক করে বলেন, নরসিংদী–ঢাকা অঞ্চল এমন একটি টেকটোনিক সেগমেন্ট যেখানে ৮.২ থেকে ৯ মাত্রার সমপরিমাণ শক্তি সঞ্চিত রয়েছে। শুক্রবারের ভূমিকম্প দেখাচ্ছে—লকড অংশটি সামান্য খুলতে শুরু করেছে, যা আরও বড় ভূমিকম্পের সম্ভাবনাকে বাড়িয়ে তুলছে।
বাংলাদেশ কেন বড় ঝুঁকিতে?
বাংলাদেশের অবস্থান তিনটি প্রধান টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে হওয়ায় ঝুঁকি দীর্ঘদিন ধরেই বিদ্যমান। পূর্বদিকে ভয়ংকর সাবডাকশন জোন, ঘনবসতিপূর্ণ রাজধানী, বিল্ডিং কোড না মানা, সংকীর্ণ রাস্তা এবং সীমিত উদ্ধার সক্ষমতা—সব মিলিয়ে বড় ধসের আশঙ্কা আরও বাড়িয়ে দেয়। ইতিহাসও সতর্ক করছে, কারণ এই অঞ্চলে পূর্বেও একাধিক বড় ভূমিকম্প হয়েছে—১৮৯৭ সালে ডাউকি ফল্টে ৮.৭ মাত্রা, ১৭৬২ সালে টেকনাফে ৮.৫ মাত্রা, এবং সিলেট এলাকায় ৭.৫ থেকে ৭.৬ মাত্রার কম্পন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এখন জরুরি ভিত্তিতে ভবনগুলোর কাঠামোগত অডিট, বিল্ডিং কোডের কঠোর বাস্তবায়ন, উদ্ধার ও প্রস্তুতি সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং জনসচেতনতা বাড়ানো ছাড়া বিকল্প নেই। ৩১ ঘণ্টার মধ্যে চারটি ভূমিকম্প যেভাবে সংঘটিত হয়েছে, তা স্পষ্ট করে দিচ্ছে—বিপদের সতর্কসংকেত উপেক্ষা করার সময় আর নেই।