ফরিদপুরে আবহমান বাংলার ঐতিহ্য বহনকারী বহুল প্রতীক্ষিত ঘুড়ি উৎসবটি শেষ মুহূর্তে স্থগিত করেছে জেলা প্রশাসন। শনিবার নির্ধারিত এ উৎসবটি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও হঠাৎ প্রশাসনিক নির্দেশনায় তা বন্ধ হয়ে যায়। এতে স্থানীয় উৎসবপ্রেমী মানুষ ও আয়োজক কমিটি হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে।
ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ কামরুল হাসান মোল্যা জানিয়েছেন, অনুষ্ঠানটি বন্ধ নয়, বরং সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। তিনি বলেন, “জনগণের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।”
তিনি আরও জানান, শুক্রবার রাতে ফরিদপুর জেলা স্কুলের ১৮৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে নগরবাউল জেমসের কনসার্টে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে এবং জননিরাপত্তা বজায় রাখতে ঘুড়ি উৎসব স্থগিত করা হয়েছে।
ফরিদপুর পুলিশ সুপার মো. নজরুল ইসলাম বলেন, “এটা বন্ধ করা আমাদের কাজ নয়, আমাদের কাজ জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। জেলা প্রশাসন থেকেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।” তিনি নিশ্চিত করেন, জনগণের নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখেই এমন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
ঘুড়ি উৎসব আয়োজন কমিটির সভাপতি মো. ইমদাদ হাসান জানান, আয়োজকরা সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছিলেন। কিন্তু শেষ মুহূর্তে জেলা প্রশাসনের সিদ্ধান্তে তারা হতাশ হয়েছেন। তিনি বলেন, “এটি অত্যন্ত অনাকাঙ্ক্ষিত ও হতাশাজনক।”
ফরিদপুরের ঘুড়ি উৎসব স্থানীয়দের জন্য শুধু বিনোদন নয়, বরং সামাজিক সম্প্রীতি ও ঐতিহ্যের প্রতীক। প্রতিবছর এ উৎসব ঘিরে শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে সব বয়সের মানুষের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ দেখা যায়। এটি জেলার নাগরিকদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বন্ধনকে আরও সুদৃঢ় করে। তাই হঠাৎ স্থগিত হওয়ায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ ও সমালোচনা দেখা দিয়েছে। কেউ কেউ প্রশাসনের সিদ্ধান্তকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন, আবার কেউ বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় এটিকে স্বাগত জানিয়েছেন।
একই দিনে চট্টগ্রামে ‘গানে গানে সংহতি-সমাবেশ’ আয়োজনের অনুমতি দেয়নি পুলিশ। শনিবার বিকেলে জেলা শিল্পকলা একাডেমির সামনে সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো এই অনুষ্ঠান আয়োজনের পরিকল্পনা করেছিল। আয়োজকদের দাবি, সাম্প্রতিক সময়ে ছায়ানট, উদীচীসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমে হামলার প্রতিবাদে গান গেয়ে সংহতি প্রকাশের উদ্দেশ্যেই এ আয়োজন ছিল। এতে কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি ছিল না।
কিন্তু পুলিশ পূর্বানুমতি না থাকা এবং সাম্প্রতিক ঘটনার প্রেক্ষাপটে অনুষ্ঠানটি নিষিদ্ধ করে। এর পেছনে মূল কারণ হিসেবে ফরিদপুরে জেমসের কনসার্টে সংঘর্ষের ঘটনাকে উল্লেখ করা হয়েছে।
জাতীয় রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদ চট্টগ্রাম শাখা এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, শান্তিপূর্ণ সাংস্কৃতিক সমাবেশ নিষিদ্ধ করা দুঃখজনক। সাংস্কৃতিক কর্মীরা মনে করছেন, দেশে সাম্প্রতিক সময়ে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলোতে নিরাপত্তার ঝুঁকি বাড়ছে। এতে শিল্পী ও দর্শকদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।
ফরিদপুরে ঐতিহ্যবাহী ঘুড়ি উৎসব স্থগিত হওয়া এবং চট্টগ্রামে সাংস্কৃতিক সমাবেশ নিষিদ্ধ হওয়ার ঘটনাগুলো দেশের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে নতুন প্রশ্ন তুলেছে। শান্তিপূর্ণ উৎসব ও সাংস্কৃতিক প্রতিবাদ আয়োজনের অধিকার কতটা নিরাপদ—এ নিয়ে এখনই আলোচনার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।