সারাদেশে শীতের তীব্রতা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। ঘন কুয়াশা, হিমেল বাতাস আর দিনের বেলায় সূর্যের অনুপস্থিতিতে জনজীবন কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছে উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল। একই সঙ্গে উপকূলীয় এলাকাতেও কুয়াশা ও শীতে ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, আগামী কয়েকদিনে শীতের তীব্রতা আরও বাড়তে পারে এবং কিছু এলাকায় মৃদু থেকে মাঝারি শৈত্যপ্রবাহের আশঙ্কা রয়েছে।
রংপুর বিভাগের আট জেলায় কনকনে ঠান্ডা, জনজীবন অচল
রংপুর বিভাগের আট জেলায় হাড় কাঁপানো শীতে জনজীবন বিপর্যস্ত। নীলফামারীর ডিমলায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা নেমেছে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। রংপুরে ১১.৫, পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় ১১, সৈয়দপুরে ১১.৪, কুড়িগ্রামের রাজারহাটে ১১.৪, ঠাকুরগাঁয়ে ১১.১, লালমনিরহাটে ১২ এবং গাইবান্ধায় ১২.১ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে।
ঘন কুয়াশার কারণে সকাল ১০–১১টার আগে সূর্যের দেখা মিলছে না। সড়ক ও রেলপথে যানবাহন চলছে ধীরগতিতে, দিনের বেলাতেও হেডলাইট জ্বালিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে। দোকানপাট দেরিতে খুলছে, দিনমজুর ও কৃষিশ্রমিকরা কাজ হারাচ্ছেন।
মাঠে নামতে পারছেন না কৃষক
রংপুর, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও ও কুড়িগ্রাম অঞ্চলে আলু, ভুট্টা, সরিষা, গম ও আমনের বীজতলা নিয়ে দুশ্চিন্তায় কৃষকরা। কনকনে ঠান্ডা ও কুয়াশার কারণে মাঠে কাজ করা যাচ্ছে না। শ্রমিক সংকটও দেখা দিয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বলছে, কয়েকদিন এমন অবস্থা থাকলে উৎপাদনে প্রভাব পড়তে পারে।
কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাটের চরাঞ্চলে চরম দুর্ভোগ
তিস্তা ও ধরলা নদীর চরাঞ্চলে শীতের দাপট সবচেয়ে বেশি। টিনের ঘর ও খোলা দেয়ালে রাতভর শিশিরের মতো কুয়াশা ঝরে ঘর ভিজে যাচ্ছে। পর্যাপ্ত শীতবস্ত্র না থাকায় খড়কুটো জ্বালিয়ে আগুন পোহাতে হচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, কম্বল বরাদ্দ প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।
রাজশাহী ও চুয়াডাঙ্গায় মৃদু শৈত্যপ্রবাহ
রাজশাহী, চুয়াডাঙ্গা, পাবনা, সিরাজগঞ্জ ও গোপালগঞ্জে মৌসুমের প্রথম মৃদু শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। চুয়াডাঙ্গায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা নেমেছে ৯.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে, যশোরে রেকর্ড হয়েছে ৯ ডিগ্রি। সূর্যের দেখা মিললেও হিমেল বাতাসে শীতের তীব্রতা কমছে না।
হাসপাতালে বাড়ছে শিশু ও বয়স্ক রোগী
শীত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সর্দি-কাশি, জ্বর, নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্ট ও কোল্ড ডায়রিয়ায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রতিদিন শত শত শিশু চিকিৎসা নিচ্ছে। চিকিৎসকরা শিশু ও বয়স্কদের বিশেষভাবে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন।
ঢাকা ও মধ্যাঞ্চলে শীতের অনুভূতি বাড়ছে
ঢাকায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১৩–১৪ ডিগ্রির ঘরে থাকলেও কুয়াশা ও বাতাসের কারণে শীতের অনুভূতি তীব্র। ভোরের দিকে কুয়াশায় দৃষ্টিসীমা কমে যাচ্ছে।
উপকূলীয় এলাকা কুয়াকাটায় কুয়াশায় বিপর্যস্ত যোগাযোগ
কুয়াকাটাসহ উপকূলীয় এলাকায় ঘন কুয়াশায় সড়ক ও নৌপথে ঝুঁকি বেড়েছে। দৃষ্টিসীমা ৫০ মিটারের নিচে নেমে আসছে। জেলে ও দিনমজুরদের আয় কমে গেছে। শীতজনিত রোগও বাড়ছে।
আবহাওয়া পূর্বাভাস: কতদিন থাকবে শীত
আবহাওয়াবিদদের মতে, সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন তাপমাত্রার পার্থক্য কমে যাওয়ায় শীতের অনুভূতি প্রকট হচ্ছে। আগামী কয়েকদিন কুয়াশা অব্যাহত থাকতে পারে এবং জানুয়ারির শুরুতে উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলে মৃদু থেকে মাঝারি শৈত্যপ্রবাহের আশঙ্কা রয়েছে।
সরকার জানিয়েছে, শীতার্তদের জন্য কম্বল বিতরণ কার্যক্রম চলছে। তবে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, প্রয়োজনের তুলনায় বরাদ্দ কম, বিশেষ করে চর ও প্রত্যন্ত এলাকায় দ্রুত সহায়তা বাড়ানো জরুরি।