বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে খোলা চিঠি দিয়ে লালন সাধুদের আধ্যাত্মিক স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও সাংস্কৃতিক অধিকার সংরক্ষণের জন্য বিশেষ পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন লালন ভক্তরা।
শনিবার (২১ ফেব্রুয়ারি) প্রকাশিত এ চিঠিতে বলা হয়, ফকির লালন শাহের দর্শন বাংলার মানবতা, সাম্য, সম্প্রীতি ও ধর্মনিরপেক্ষ চেতনার অনন্য ভিত্তি হিসেবে বিশ্বময় পরিচিত। শতাধিক বছর ধরে লালনের অনুসারী ও ভক্তগণ তাঁর বাণী ছড়িয়ে দিচ্ছেন। কুষ্টিয়ার ছেউড়িয়ায় আখড়াবাড়ি কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই সংস্কৃতি শুধুমাত্র আধ্যাত্মিক চর্চা নয়, এটি বাংলাদেশের জাতীয় সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, “আগামী ৩ মার্চ পবিত্র দোল পূর্ণিমা উপলক্ষে লালনের আখড়াবাড়ীসহ ও দেশের বিভিন্ন স্থানে সাধুসমাজের গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানাদি অনুষ্ঠিত হবে। ফকির লালন শাহ্ এর জীবদ্দশায় তিনি এই অনুষ্ঠান পালন করতেন।
“উল্লেখ্য যে ধর্ম-বর্ণ-জাতি-গোত্র ভেদ উপেক্ষা করে বিশ্বময় মানবতাবাদী মানুষ এই পূর্ণিমা পালন করে থাকেন। এই প্রেক্ষিতে আমরা লালন সাধুদের স্বার্থ সংরক্ষণ এবং নির্বিঘ্নে দোল পূর্ণিমা উৎসব অনুষ্ঠান পরিচালনার লক্ষ্যে আপনার সদয় দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।”
‘খোলা চিঠিতে’ আটটি দাবি তুলে ধরা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে—
আধ্যাত্মিক স্বাধীনতার নিশ্চয়তা: লালন সাধু ও বাউল সম্প্রদায় যেন সাধুরীতি অনুযায়ী অবাধে তাদের আধ্যাত্মিক সাধনা ও অনুষ্ঠানাদি পরিচালনা এবং লালন দর্শন অনুরাগী ভক্তগণ ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে স্বাধীনভাবে তার ভাব অনুরাগ প্রকাশ করতে পারেন, সেই স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। এ বিষয়ে সাধুদের মতামত ও অনুমতি সাপেক্ষে স্পষ্ট প্রশাসনিক নির্দেশনা প্রদান করতে হবে।
নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারকরণ: পহেলা কার্তিক—লালন তিরোধান দিবস, দোল পূর্ণিমাসহ অন্যান্য সাধুতিথিতে সাধুআশ্রম ও আখড়াভিত্তিক উৎসবগুলোতে যথাযথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। লালন আখড়াবাড়িসহ গুরুত্বপূর্ণ মাজারগুলোতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রয়োজন অনুযায়ী উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে।
আখড়াবাড়ি সুরক্ষা: ছেউড়িয়ায় লালন আখড়াসহ নিবন্ধিত আখড়াগুলোর আইনগত সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে এবং কোনো ধরনের দখল, হয়রানি বা বাধা প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। প্রয়োজনে কিছু প্রতিষ্ঠানকে নতুন নিবন্ধন আওতায় আনতে হবে।
হয়রানি ও কটূক্তি প্রতিরোধ: বাউল ও সাধুদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য, অপপ্রচার বা সামাজিক উস্কানির বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। পাগল-মস্তান-সন্ন্যাসী-বাউলদের বেশ ও জীবনাচারে আঘাত প্রতিহত করতে হবে।
স্বাধীন চলাচলের নিশ্চয়তা: সাধু সংস্কৃতি রক্ষার্থে দেশের বিভিন্ন জেলায় সাধুদের যাতায়াত ও অনুষ্ঠান পরিচালনায় প্রশাসনিক সহযোগিতা নিশ্চিত করতে হবে।
সরকারি সমন্বয় কমিটি গঠন: সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়, স্থানীয় প্রশাসন ও লালন সংস্থাগুলোর প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি যোগাযোগ ও তদারকি কমিটি গঠন করতে হবে। লালন আখড়াবাড়িতে সাধুরীতি অনুযায়ী অনুষ্ঠান পরিচালনার স্বার্থে বয়োজ্যেষ্ঠ ও খেলাফতি সাধুদের নিয়ে আখড়াবাড়ি পরিচালনা কমিটি প্রণয়ন করতে হবে।
সাধু কল্যাণ তহবিল বিবেচনা: প্রবীণ ও অসচ্ছল সাধুদের জন্য স্বাস্থ্য সহায়তা ও ন্যূনতম কল্যাণমূলক সহায়তা প্রদানের উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। ছেউড়িয়ায় লালন একাডেমীর সাধু ও শিল্পী সমাজের জীবনমান উন্নয়ন এবং সামাজিক সুররক্ষায় নিবন্ধিত শিল্পী সমাজ তথা ট্রাস্ট গঠন করতে হবে।
লালন আখড়াবাড়ি সমাধি পুনঃনির্মাণ: উৎসবের সময় আখড়াবাড়ির লালন সমাধিসৌধে স্থানসংকুলান কঠিন হয়ে পড়ে। এ পরিস্থিতিতে লালন অনুসারী সাধুদের মতামত নিয়ে সমাধি ভবনের পুনঃনির্মাণ এখন সময়ের দাবি।
১৩টি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে এ চিঠি দিয়েছেন লালন স্বেচ্ছাসেবক সংস্থার সাধারণ সম্পাদক আমজাদ হোসেন।
চিঠিদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে আছে— কুষ্টিয়ার লালন একাডেমী, লালন স্বেচ্ছাসেবক সংস্থা, লালন সেবাসনদ, এসো গড়ি আশার আলো, আয়না মহল, লালন সাহিত্য চর্চ্চা কেন্দ্র, ভাবাশ্রম, বিশ্ব লালন সংঘ; মেহেরপুরের দৌলত শাহ্ ফাউন্ডেশন; ঢাকার জাতীয় সাধু সংসদ, ষোলো আনা বাঙ্গালী; ভাব, আধ্যাত্ম ও বোধি চর্চ্চা কেন্দ্র এবং চুয়াঙ্গার পারঘাট আয়না মহল।