পবিত্র ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে দেশজুড়ে শুরু হয়েছে ঘরমুখো মানুষের ঢল। তবে স্বস্তিদায়ক যাত্রার বদলে এবারও আলোচনায় এসেছে বাস ভাড়া নিয়ে ‘নৈরাজ্য’। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির এক সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণে দাবি করা হয়েছে, এবারের ঈদযাত্রায় দেশের প্রায় ৮৭ শতাংশ বাস ও মিনিবাসে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হচ্ছে, যা গত ২০ বছরের রেকর্ড ভাঙতে পারে।
বুধবার (১৮ মার্চ) প্রকাশিত সমিতির সমীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৪ থেকে ১৮ মার্চ পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরেজমিন পর্যবেক্ষণ, অগ্রিম টিকিট সংগ্রহ প্রক্রিয়া এবং পরিবহন খাতের সার্বিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে এই তথ্য পাওয়া গেছে। সংগঠনটির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী জানান, সরকারি নির্ধারিত ভাড়া উপেক্ষা করে ঈদযাত্রাকে কেন্দ্র করে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের এক ধরনের ‘মহোৎসব’ চলছে।
সমিতির হিসাব অনুযায়ী, এবারের ঈদে ঢাকা ও বিভিন্ন জেলা থেকে দূরপাল্লার বাস ও মিনিবাসে প্রায় ৪০ লাখ ট্রিপ যাত্রী যাতায়াত করবে। এর মধ্যে ৮৭ শতাংশ যাত্রীর কাছ থেকে গড়ে ৩৫০ টাকা করে অতিরিক্ত আদায় করা হলে মোট বাড়তি আদায়ের পরিমাণ দাঁড়াবে ১২১ কোটি ৮০ লাখ টাকা। একইভাবে সিটি সার্ভিসে প্রায় ৬০ লাখ ট্রিপ যাত্রীর মধ্যে ৮৭ শতাংশ যাত্রীর কাছ থেকে গড়ে ৫০ টাকা করে অতিরিক্ত আদায় হলে আরও ২৬ কোটি ১০ লাখ টাকা যোগ হবে। সব মিলিয়ে এবারের ঈদে বাস-মিনিবাস খাতেই অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের পরিমাণ প্রায় ১৪৮ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে।
প্রতিবেদনে বিভিন্ন রুটের উদাহরণ তুলে ধরা হয়েছে। যেমন—ঢাকা থেকে পাবনা ও নাটোরগামী বাসে ৫৫০ টাকার ভাড়া নেওয়া হচ্ছে ১২০০ টাকা পর্যন্ত। ঢাকা-রংপুর রুটে ৫০০ টাকার ভাড়া বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫০০ টাকা, আর ঢাকা-ময়মনসিংহ লোকাল বাসে ২৫০ টাকার ভাড়া আদায় করা হচ্ছে ৬০০ টাকা পর্যন্ত। এছাড়া নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, খুলনা এবং চট্টগ্রাম-ভোলা রুটেও ভাড়া প্রায় দ্বিগুণ হওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
সমিতির পর্যবেক্ষণে আরও উঠে এসেছে, অনেক ক্ষেত্রে যাত্রীদের নির্দিষ্ট গন্তব্যের টিকিট না দিয়ে দূরের গন্তব্যের টিকিট কিনতে বাধ্য করা হচ্ছে। ৫২ আসনের বাসেও ৪০ আসনের ভাড়া আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। সিএনজি ও ডিজেলচালিত বাসের ভিন্ন ভাড়ার কাঠামো থাকলেও বাস্তবে সব ক্ষেত্রেই সমানভাবে অতিরিক্ত আদায় চলছে।
অন্যদিকে, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম একই দিনে রাজধানীর গাবতলী বাস টার্মিনাল পরিদর্শনে গিয়ে দাবি করেন, অধিকাংশ পরিবহন নির্ধারিত ভাড়াই নিচ্ছে, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে কম ভাড়াও নেওয়া হচ্ছে। তবে যাত্রী কল্যাণ সমিতির প্রতিবেদনের সঙ্গে এই বক্তব্যের স্পষ্ট বিরোধ দেখা গেছে।
সমিতি মনে করছে, শ্রমিকদের বোনাস না পাওয়া, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, পরিবহন খাতে চাঁদাবাজি এবং মালিকদের অতিরিক্ত মুনাফার প্রবণতা—এই নৈরাজ্যের মূল কারণ। তারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ডিজিটাল ভাড়া আদায় ব্যবস্থা চালু, নগদ লেনদেন বন্ধ এবং মহাসড়কে সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে নজরদারি জোরদারের দাবি জানিয়েছে।
পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না আনলে ঈদযাত্রায় সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়বে এবং সামাজিক অস্থিরতা তৈরি হতে পারে বলেও সতর্ক করেছে সংগঠনটি।