ঈদের আনন্দ ঘিরে যখন ঘরমুখো মানুষের ঢল নামে সড়ক ও মহাসড়কে, ঠিক তখনই দেশের বিভিন্ন স্থানে একের পর এক সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। কুমিল্লা ট্রেন-বাস সংঘর্ষে নিহত ১২ জন ছাড়াও ছাড়াও ফেনী, হবিগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় পৃথক দুর্ঘটনায় অন্তত ১৭ জন নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন বহু মানুষ। এসব ঘটনায় আবারও সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
ফেনীতে ত্রিমুখী সংঘর্ষে নিহত ৩
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ফেনীর রামপুর এলাকায় বাস, অ্যাম্বুলেন্স ও মোটরসাইকেলের ত্রিমুখী সংঘর্ষে তিনজন নিহত হয়েছেন। রোববার (২২ মার্চ) ভোর ৪টার দিকে এ দুর্ঘটনা ঘটে। এতে গুরুতর আহত হয়েছেন অন্তত পাঁচজন।
মহিপাল হাইওয়ে থানা পুলিশের ইনচার্জ আসাদুল ইসলাম জানান, মহাসড়কের একটি লেনে নির্মাণকাজ চলছিল। এসময় একটি অ্যাম্বুলেন্স ধীরগতিতে পার হচ্ছিল। পেছন থেকে শ্যামলী পরিবহনের একটি বাস অ্যাম্বুলেন্সটিকে ধাক্কা দেয়। এ নিয়ে দুই চালকের মধ্যে বাকবিতণ্ডা শুরু হলে সড়কে যানজট তৈরি হয়।
এর কিছুক্ষণ পর দ্রুতগতিতে আসা দোয়েল পরিবহনের আরেকটি বাস জটলার মধ্যে ঢুকে পড়ে এবং সংঘর্ষ ঘটে। এতে মোটরসাইকেল আরোহী, বাসের সুপারভাইজার এবং এক যাত্রী নিহত হন। নিহতদের পরিচয় শনাক্তে কাজ করছে পুলিশ।
হবিগঞ্জে বাস-পিকআপ সংঘর্ষে নিহত ৪
হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলায় ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে বাস ও পিকআপ ভ্যানের সংঘর্ষে চারজন নিহত হয়েছেন। রোববার সকালে আন্দিউড়া এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, সংঘর্ষের পর পিকআপ ভ্যানটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তার পাশের খাদে পড়ে যায়। পরে স্থানীয়রা উল্টে থাকা পিকআপ দেখে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসে খবর দেন। উদ্ধারকারীরা পিকআপের নিচ থেকে চারজনের মরদেহ উদ্ধার করেন। নিহতদের মধ্যে তিনজন পুরুষ ও একজন নারী রয়েছেন। তাদের পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।
দেশের বিভিন্ন জেলায় নিহত আরও ১০
ঈদের দিন সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন স্থানে সড়ক দুর্ঘটনায় আরও ১০ জন নিহত হয়েছেন।
ময়মনসিংহের তারাকান্দায় সিএনজি অটোরিকশা ও মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষে শিশুসহ দুজন নিহত হন। চট্টগ্রামের পটিয়ায় যাত্রীবাহী বাস আইল্যান্ডে ধাক্কা লেগে উল্টে একজন নিহত এবং অন্তত ১৮ জন আহত হন। একই জেলার মিরসরাইয়ে প্রাইভেট কার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে চালক নিহত হয়েছেন।
এছাড়া নড়াইল, ঝিনাইদহ, মাদারীপুর, ফরিদপুর, চুয়াডাঙ্গা ও গোপালগঞ্জে পৃথক দুর্ঘটনায় একজন করে নিহত হয়েছেন। এসব ঘটনায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মোটরসাইকেলের নিয়ন্ত্রণ হারানো, অতিরিক্ত গতি এবং অসতর্ক চালনার বিষয়টি সামনে এসেছে।
চুয়াডাঙ্গায় মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় তরুণ নিহত
চুয়াডাঙ্গায় ঈদের দিন দুপুরে মোটরসাইকেল নিয়ে ঘুরতে বের হয়ে সড়ক দুর্ঘটনায় সুরুজ আলী (১৯) নামে এক তরুণ নিহত হয়েছেন। ফার্স্ট ক্যাপিটাল ইউনিভার্সিটির সামনে মোটরসাইকেল নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গাছের সঙ্গে ধাক্কা লাগলে তিনি গুরুতর আহত হন। হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। একই ঘটনায় আহত হয়েছেন তার বন্ধু হৃদয় হোসেন (১৮)।
উদ্বেগ বাড়াচ্ছে ঈদযাত্রার ঝুঁকি
প্রতিবছর ঈদের সময় অতিরিক্ত যাত্রী চাপ, বেপরোয়া গতি, ফিটনেসবিহীন যানবাহন এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যা বেড়ে যায়। বিশেষ করে মহাসড়কে নির্মাণকাজ, লেন সংকোচন এবং অপ্রতুল নিরাপত্তা ব্যবস্থাও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়।
ফেনীর ঘটনায় যেমন দেখা গেছে, একটি ছোট দুর্ঘটনা বা যানজট দ্রুত বড় দুর্ঘটনায় রূপ নিয়েছে। একইভাবে অধিকাংশ দুর্ঘটনায় চালকদের অসতর্কতা ও গতির প্রতিযোগিতা বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে।
সড়ক নিরাপত্তায় জরুরি পদক্ষেপ প্রয়োজন
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সড়ক দুর্ঘটনা রোধে কঠোর আইন প্রয়োগ, চালকদের প্রশিক্ষণ, যানবাহনের ফিটনেস নিশ্চিতকরণ এবং মহাসড়কে কার্যকর মনিটরিং বাড়ানো জরুরি। একইসঙ্গে লেভেল ক্রসিং ও মহাসড়কের ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
ঈদের আনন্দকে ম্লান করে দেওয়া এসব দুর্ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিচ্ছে, নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত না হলে উৎসবের যাত্রা সহজেই পরিণত হতে পারে মৃত্যুর মিছিলে।