বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডে (বিসিবি) সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে সরাসরি সরকারি হস্তক্ষেপের অভিযোগ নতুন নয়। তবে সেই হস্তক্ষেপকে সামাল না দিয়ে বরং ধারাবাহিক ভুল সিদ্ধান্তে ক্রিকেট প্রশাসনকে আরও গভীর সংকটে ফেলেছেন বর্তমান সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুল—এমন অভিযোগ এখন বিসিবির ভেতর-বাইরের সংগঠকদের কণ্ঠে ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।
সাবেক সভাপতি ফারুক আহমেদকে মনোনয়ন ও অপসারণের প্রক্রিয়ায় তৎকালীন ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার ভূমিকা নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই বুলবুল সভাপতির আসনে বসেন। বিসিবির নির্বাচন ঘিরে অভিযোগ ওঠে নগ্ন হস্তক্ষেপের। ঢাকার একটি পাঁচতারকা হোটেলে রাতে ভোট নেওয়ার অভিযোগে নির্বাচন বয়কট করেন বহু ক্লাব কর্মকর্তা। সেই সময় থেকেই ক্লাব ও বোর্ডের দূরত্ব প্রকট হতে শুরু করে।
বিশ্বকাপ বয়কট ইস্যুতে বিসিবির ব্যর্থতা বুলবুলের নেতৃত্বকে আরও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের সভাপতি হয়েও সরকারকে আন্তর্জাতিক ক্রীড়াক্ষেত্রে সম্ভাব্য ক্ষতির বিষয়টি বোঝাতে ব্যর্থ হন তিনি। বোর্ডের একাধিক পরিচালক অভিযোগ করেছেন, গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তাদের সম্পৃক্ত করা হয়নি; বরং একক সিদ্ধান্তে বোর্ড পরিচালনা করেছেন সভাপতি।
সবচেয়ে বড় সমালোচনা উঠেছে ক্রিকেট কূটনীতিতে চরম ব্যর্থতা নিয়ে। ৪ জানুয়ারির পর থেকে পাকিস্তান ছাড়া অন্য কোনো বড় ক্রিকেট খেলুড়ে দেশের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করেননি বুলবুল। শ্রীলঙ্কা বাংলাদেশের বিরোধিতা করায় বিসিবি কর্মকর্তারাও বিস্মিত। শ্রীলঙ্কান ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি শাম্মি সিলভা স্পষ্ট জানিয়ে দেন, বিসিবি আগে থেকে যোগাযোগ না করায় তারা সমর্থন দেয়নি। এমনকি ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিসিআই) সঙ্গেও কোনো কার্যকর যোগাযোগ ছিল না।
এই ব্যর্থতার বিপরীতে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা আরও বিতর্ক তৈরি করেছে। পাকিস্তানের গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়, বিসিবি ও বাংলাদেশ সরকার সরাসরি পিসিবির সহায়তা চেয়েছে। ফলে বাংলাদেশ ইস্যুতে পাকিস্তান সরাসরি যুক্ত হওয়ায় অন্য দেশগুলোর সমর্থন আরও দুর্বল হয়েছে—এমন দাবি করছেন আইসিসি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
আইসিসির বিরোধিতা করে প্রকাশ্যে বক্তব্য দেওয়াকে অনেকেই ‘কূটনৈতিক আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত’ হিসেবে দেখছেন। ২২ জানুয়ারি ঢাকার এক পাঁচতারকা হোটেলে বুলবুল প্রকাশ্যে বলেন, আইসিসি বাংলাদেশের সঙ্গে অবিচার করেছে। সাধারণ সদস্য দেশ হিসেবে আইসিসির প্রকাশ্য সমালোচনা আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বাংলাদেশের অবস্থানকে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ক্লাব ক্রিকেটের সঙ্গে দূরত্ব এবং ক্রিকেটারদের দাবিকে অবজ্ঞা করার অভিযোগও ক্রমেই বাড়ছে। নির্বাচনের পর ক্লাব কর্মকর্তাদের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেননি বুলবুল। উল্টো ক্লাব ক্রিকেটকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করার অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। ক্রিকেটারদের নিয়ে কটু মন্তব্যের ঘটনায় একদিন বিপিএল বন্ধ থাকলেও শৃঙ্খলা কমিটির নিষ্ক্রিয়তা বোর্ডের দুর্বল নেতৃত্বকেই সামনে এনেছে।
সব মিলিয়ে, অভিজ্ঞ সংগঠকের অভাব, একক সিদ্ধান্ত, ব্যর্থ কূটনীতি ও প্রশাসনিক অদূরদর্শিতায় বিসিবি এখন গভীর আস্থাসংকটে। দেশের ক্রিকেটের স্বার্থে নেতৃত্বে পরিবর্তন ও স্বচ্ছ, অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রশাসনের দাবি ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।