ধর্ষণ মামলার তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়ায় বিজ্ঞানের আশীর্বাদ ডিএনএ পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা হলেও মাঠপর্যায়ে তার প্রয়োগে বড় ধরনের সীমাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। মামলার প্রধান অভিযুক্ত বা আসামিদের গ্রেপ্তার করতে না পারায় তাদের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা সম্ভব হচ্ছে না, যার ফলে ল্যাবরেটরিতে আসা নমুনাগুলোর পরীক্ষা অসম্পূর্ণ থেকে যাচ্ছে।
পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) সাম্প্রতিক এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, তাদের ডিএনএ ল্যাবে আসা ধর্ষণ মামলার নমুনার প্রায় ২০ শতাংশ ক্ষেত্রে আসামিদের পাওয়া যাচ্ছে না। পলাতক আসামিদের কারণে সৃষ্ট এই অচলাবস্থা ভুক্তভোগীদের বিচার পাওয়ার পথে প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আমাদের দেশে ডিএনএ পরীক্ষার জন্য মাত্র দুটি ল্যাবরেটরি কার্যকর রয়েছে। এর মধ্যে একটি সিআইডির অধীনে এবং অন্যটি মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের অধীনে থাকা ন্যাশনাল ফরেনসিক ডিএনএ ল্যাবরেটরি। ধর্ষণের ঘটনায় অপরাধী শনাক্ত করতে ভুক্তভোগী এবং অপরাধস্থল থেকে উদ্ধার করা জৈবিক নমুনার সঙ্গে অভিযুক্তের ডিএনএ প্রোফাইল তুলনা করা হয়।
কিন্তু অভিযুক্ত ব্যক্তি পলাতক থাকলে এই বৈজ্ঞানিক তুলনা করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। সিআইডি ফরেনসিক ল্যাবের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত সংগৃহীত আলামতের মধ্যে ৫৫১টি নমুনার পরীক্ষা অসম্পূর্ণ থেকে গেছে কেবল অভিযুক্তের নমুনা না পাওয়ার কারণে।
ডিএনএ পরীক্ষার গুরুত্ব এবং ভুক্তভোগীদের বিচার নিশ্চিতে ২০১৮ সালে হাইকোর্ট এক ঐতিহাসিক রায়ে সব প্রকার ধর্ষণ বা যৌন নিপীড়নের ক্ষেত্রে ডিএনএ পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করার নির্দেশনা দেন। পরবর্তীতে সরকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন সংশোধন করে ধর্ষণের সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড করার পাশাপাশি এই বৈজ্ঞানিক পরীক্ষাকে তদন্তের আবশ্যিক অংশ হিসেবে যুক্ত করে।
তবে আইনের এই বাধ্যবাধকতা থাকলেও বাস্তব চিত্র বেশ হতাশাজনক। অনেক ক্ষেত্রে পুলিশ আসামি গ্রেপ্তার করলেও সঠিক সময়ে নমুনা সংগ্রহ করে না, আবার অনেক ক্ষেত্রে আসামিরা শুরু থেকেই ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকে।
সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) জসীম উদ্দিন খান জানিয়েছেন, আসামিকে গ্রেপ্তার করতে না পারলে তদন্ত প্রতিবেদন বা চার্জশিট পূর্ণাঙ্গ হয় না। একান্তই যখন আসামিকে পাওয়া যায় না, তখন পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে আদালতে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়। কিন্তু ডিএনএ পরীক্ষার মতো অকাট্য প্রমাণের অভাব মামলার রায়কে প্রভাবিত করতে পারে।
গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ার কিশোরী ধর্ষণ কিংবা বরিশালের মধ্যবয়সী নারী ধর্ষণের মতো অসংখ্য ঘটনায় বছরের পর বছর ধরে আলামত জমা থাকলেও আসামির অভাবে চূড়ান্ত পরীক্ষার ফল মিলছে না। বিজ্ঞানের এই নিখুঁত পদ্ধতি থাকার পরও প্রশাসনিক ও আইনি দীর্ঘসূত্রতা ধর্ষণ মামলার বিচার প্রক্রিয়াকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।