সর্বশেষ

‘লুৎফার প্রদীপ’

আলো জ্বাললেও কিছু অন্ধকার রয়ে গেল

বিনোদন ডেস্ক বিডি ভয়েস
প্রকাশিত: ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:০০
আলো জ্বাললেও কিছু অন্ধকার রয়ে গেল

সাম্প্রতিক সময়ে একটি উল্লেখযোগ্য মঞ্চনাটক ‘লুৎফার প্রদীপ’। এই নাটকটি সমতল নাট‍্যদলের প্রথম প্রযোজনা। এটির রচয়িতা প্রখ‍্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা তানভীর মোকাম্মেল এবং মঞ্চ নির্দেশনা দিয়েছেন সগীর মোস্তফা। নাটকটি একক অভিনয়ের ওপর নির্মিত (যদিও একেবারে শেষের মুহূর্তে আরেকটি নারী চরিত্র দেখা যায় তবে সেটি প্রথম নারী চরিত্রকেই স্থলাভিষিক্ত করে)।

 
নবাব সিরাজউদ্দৌলার সহধর্মিণী বেগম লুৎফুন্নেসাকে ঘিরেই এই নাটকের কাহিনী আবর্তিত। নাম ভূমিকায় জনপ্রিয় নাট‍্যশিল্পী চিত্রলেখা গুহ অনবদ্য অভিনয় করেছেন। আর শেষ কয়েক মুহূর্তের জন‍্য এলেও অগ্নিলা হাজরার অভিনয়শৈলি চোখে পড়ার মতো।


নাটকটি দেখার প্রতি আগ্রহ ছিলো বেশ কয়েকটি কারণে। ১. তানভীর মোকাম্মেল রচিত বলে; ২. বেগম লুৎফুন্নেসার জীবনভিত্তিক (তার জীবনী নিয়ে খুব বেশি লেখা বা কাজ নেই বললেই চলে); ৩. সমতল এর প্রথম প্রযোজনা; ৪. একক চরিত্রকেন্দ্রিক।

 

নাটকটি দেখার পর সব মিলিয়ে বলা যায় যে বেশ ভালো লাগার একটি অনুভূতি তৈরি হয়েছিল। সেটা চিত্রলেখা গুহ’র অভিনয় নৈপুণ্যে এবং সর্বোপরি সেট, আলোকশৈলি, পোষাক, আবহসংগীত এবং নকশার কারণেও।

 

তবে ভালোলাগার এই রেশ থাকতে থাকতেই মনে ভাবনা আসে - কী যেন একটা অনুপস্থিত ছিল নাটকটির পরিবেশনায়। যদিও মাইক ব্যবহারের জন‍্য চিত্রলেখা গুহ’র মঞ্চের তিন দিকে চলাচল চোখে পড়ে যায় তবুও সেটিকে বরং পুরো মঞ্চ ব‍্যবহারে তাঁর নিজস্ব কৌশল হিসেবে মেনে নেয়াটাই বাঞ্ছনীয় মনে হয়েছে। তাহলে কী?

 

 

সেই অনুপস্থিতিটার গভীরে যাওয়ার জন‍্য বেগম লুৎফুন্নেসার জীবনী ও তাঁর ওপর লেখা বিভিন্ন প্রবন্ধ ঘাঁটাঘাঁটি করলাম। মনে হলো কিছুটা হলেও ধরতে পেরেছি। সেই অনুপস্থিতিগুলোর প্রথমটি হলো বেগম লুৎফার দৃঢ়চেতা চরিত্র। সিরাজউদ্দৌলার সহধর্মিণী হওয়ার সময় থেকে জীবনের শেষ পর্যন্ত সবসময় তিনি অত‍্যন্ত দৃঢ়চেতা মনোভাবের পরিচয় দিয়েছেন। তিনি কখনোই কোন কূটকৌশল বা ব‍্যক্তিগত প্রলোভনের কাছে মাথা নত করেননি।

 

কিন্তু নাটকের বেশ কিছু অংশে লুৎফাকে তাঁর মুখেই দুর্বল দেখানোর প্রয়াস আছে। দ্বিতীয় অনুপস্থিতি হলো বেগম লুৎফার বন্দী জীবন ও শারীরিক অত‍্যাচার সহ‍্য করার পরিপূর্ণ আলোকপাত না থাকা। নাটকের কোথাও জিঞ্জিরা প্রাসাদে বেগম লুৎফার সাত বছরের বন্দী জীবন বা মীরনের হাতে শারীরিক নির্যাতনের বর্ণনা উঠে আসেনি। সেই সাত বছরে তিনি তাঁর শিশু কন্যাকে নিয়ে মানসিক দৃঢ়তার কারণেই টিকে ছিলেন।

 

তৃতীয় অনুপস্থিতি বেগম লুৎফার অর্থনৈতিক জ্ঞান ও দক্ষতা। খোশবাগে তাঁর জীবন কাটানোর মূল উদ্দেশ্য সিরাজউদ্দৌলার প্রতি ভালোবাসা হলেও আরেকটি বড় কারণ ছিলো আলীবর্দী খান প্রদত্ত একটি জায়গীর দেখাশোনা ও সেখান থেকে প্রাপ্ত আয় দিয়ে খোশবাগ কবরস্থানের রক্ষণাবেক্ষণ এবং দরিদ্র পরিবার ও মুসাফিরদের জন‍্য খাবারের নিয়মিত আয়োজন করা।

 

এটি বেগম লুৎফা খুবই দক্ষতার সাথে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত করেছেন। একই সাথে তিনি তাঁর চার নাতি-নাতনীর ভরণপোষণ ও লেখাপড়াও করিয়েছেন। সে সময় তিনি কর্নওয়ালিসের সাথে যোগাযোগ করে মাসিক ভাতা বাড়ানোর জন্য চেষ্টাও করেন, যদিও কর্নওয়ালিস তাতে সাড়া দেয়নি তবে জায়গীরের আয়ের উৎসে কোন সমস্যা করেনি।

 

বাগের সিপাহী, মীর মদন, মোহনলালের সন্তান ও ভাই এবং ঘসেটি বেগম চরিত্রগুলোর উল্লেখ এনে হয়তো রচয়িতা ও নির্দেশক পরাধীনতা থেকে মুক্তির আশাকে প্রাধান্য দিতে চেয়েছেন কিন্তু একই সাথে বেগম লুৎফার ওই দিকগুলো আনলে তা আরো স্পষ্ট হতো হয়তো।

 

আর যেটা সবচাইতে ঐতিহাসিক ভুল সেটা হচ্ছে - সিরাজউদ্দৌলা ও বেগম লুৎফুন্নেসার কন‍্যা জোহরা মারা যান বেগম লুৎফা মারা যাবার প্রায় ১৫-১৬ বছর আগেই। কিন্তু নাটকের শেষের মুহূর্তে জোহরাকে আনাটা ইতিহাসকে পুরোপুরি বদলে দেয়। বরং বেগম লুৎফার কোন একজন নাতনিকে দিয়ে প্রদীপ জ্বালানোর পরম্পরাটা দেখালে পুরো ব‍্যাপারটা আরো জোরালো হতো। এরকম একটা ভুলকে সবচেয়ে দুঃখজনক অনুপস্থিতি বলেই মনে হয়েছে।

 

অবশ‍্যই রচয়িতা এবং নির্দেশক যে কোন ঐতিহাসিক চরিত্র নিয়ে নাটক নির্মাণের সময় তাদের মনের মাধুর্য প্রকাশ করতেই পারেন এবং তাঁদের স্বাধীনতা প্রয়োগ করতেই পারেন কিন্তু এই ঐতিহাসিক ভুলকে আসলে দর্শক ও সমালোচকরা কিভাবে দেখবেন তা ভেবে দেখাটা জরুরি।

 

নাটক থাকুক গণমানুষের কন্ঠস্বর হয়ে
জয় হোক নাটকের, 
নাট‍্যচর্চা বেগবান হোক
নাটক হোক সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার॥

সব খবর