দেশের সংস্কৃতিকর্মী ও রাষ্ট্রযন্ত্র—উভয়ই ‘সাংস্কৃতিক রাজনীতি’ বুঝতে ব্যর্থ হচ্ছে বলে তীব্র মন্তব্য করেছেন নাট্যশিক্ষক ও বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক সৈয়দ জামিল আহমেদ। তিনি বলেন, এই অজ্ঞতা থেকেই সংস্কৃতিচর্চা সংকুচিত হচ্ছে, ভিন্নমত দমন করা হচ্ছে এবং সমাজে অযথা ভীতি ও বিভাজন তৈরি হচ্ছে।
শনিবার ঢাকার জাতীয় নাট্যশালার সেমিনার কক্ষে সেলিম আল দীন সংগ্রহশালার আয়োজনে ‘সীমালঙ্ঘনেই পূর্ণ প্রাণ: জুলাই গণঅভ্যুত্থান-উত্তর বাংলাদেশ, সাংস্কৃতিক রাজনীতি, সেলিম আল দীন’ শীর্ষক একক বক্তৃতায় এসব কথা বলেন তিনি। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন মো. কামরুল হাসন খান এবং সঞ্চালনা করেন আবু সাঈদ তুলু।
জামিল আহমেদ বলেন, বাংলাদেশে ‘সাংস্কৃতিক রাজনীতি’কে সংকীর্ণভাবে দেখা হয়। তিনি ভারতকে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরে বলেন, “ভারত বুঝেছে সাংস্কৃতিক রাজনীতি কীভাবে কাজ করে। তাজমহল বা ভরত নাট্যমকে তারা কীভাবে বিশ্ব ও মধ্যবিত্ত সমাজের কাছে তুলে ধরেছে—সেখানেই পার্থক্য।” তাঁর মতে, এই বোঝাপড়ার অভাবেই বাংলাদেশ বিশ্বপরিসরে পিছিয়ে পড়ছে।
রাষ্ট্রীয় আমলাতন্ত্রের ভূমিকা নিয়েও তিনি সমালোচনা করেন। তাঁর ভাষায়, অনেক আমলাই সংস্কৃতিকে রাজনৈতিক সন্দেহের চোখে দেখে নানা জায়গায় সাংস্কৃতিক কার্যক্রম বন্ধ করে দিচ্ছেন। এতে সংস্কৃতি চর্চার পরিসর সংকুচিত হচ্ছে এবং সৃজনশীলতা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে জামিল আহমেদ বলেন, নাটকের সংলাপে ‘আসসালামু আলাইকুম’ বলায় তাঁকে একসময় জামায়াতপন্থী বলা হয়েছে, আবার ‘নমস্কার’ বললেও ভিন্ন ট্যাগ দেওয়া হয়। তিনি বলেন, “এই ট্যাগ দেওয়াটাই সাংস্কৃতিক রাজনীতি। এতে মানুষকে ভয় দেখিয়ে চুপ করিয়ে রাখা হয়।”
জুলাই দাঙ্গার পর যে নতুন বন্দোবস্তের স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল, তা ব্যর্থ হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। সংবাদপত্র অফিসে আগুন দেওয়া, ছায়ানট পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনাকে উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, গণঅভ্যুত্থানকে এক বছরের মধ্যেই রাষ্ট্র ‘নরমালাইজ’ করে ফেলেছে।
রাজনৈতিক বাস্তবতা প্রসঙ্গে জামিল আহমেদ বলেন, বর্তমানে অন্তত ৪০ শতাংশ মানুষ নীরব অবস্থানে আছে। তারা ভোট দেবে কিনা, তা অনিশ্চিত। তিনি নিজেও ভোট দেওয়া নিয়ে দ্বিধার কথা জানালেও বলেন, নির্বাচন হওয়াটা জরুরি, কারণ গণতন্ত্রের জন্য সেটি অপরিহার্য।
বক্তৃতায় তিনি সেলিম আল দীনের ‘চাকা’ নাটক, ‘বেহুলার ভাসান’ এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘সোনার তরী’ কবিতার আলোকে রাষ্ট্র, সংস্কৃতি ও সময়ের সম্পর্ক বিশ্লেষণ করেন। অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. শাহমান মৈশান ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক কৃপা কনা তালুকদার উপস্থিত ছিলেন।