ভালোবাসার দিনে জন্ম, সৌন্দর্যে বিশ্বজয়, অথচ জীবনের মঞ্চে প্রেমে পরাজয়—এ যেন এক অমোঘ কাব্য। বলিউডের ইতিহাসে মধুবালা নামটি শুধু এক অভিনেত্রীর নয়, এক কিংবদন্তির, এক ট্র্যাজেডির প্রতীক।
১৯৩৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি দিল্লিতে জন্ম নেন মমতাজ জাহান দেহলভী। দেবিকা রাণীর হাতেই তিনি পেলেন নতুন নাম মধুবালা। তাঁর সৌন্দর্য এতটাই অতুলনীয় ছিল যে ভক্তরা তাঁকে তুলনা করতেন প্রেমের দেবী ভেনাসের সঙ্গে। শিশুশিল্পী হিসেবে শুরু, আর মাত্র ১৪ বছর বয়সে নায়িকা হয়ে আত্মপ্রকাশ নীল কমল ছবিতে, রাজ কাপুরের বিপরীতে। এরপর ৬৬টিরও বেশি ছবিতে অভিনয়, যার মধ্যে মুঘল-এ-আজম, মহল, চলতি কা নাম গাড়ি, মিস্টার অ্যান্ড মিসেস ৫৫ আজও অমর।
কিন্তু তাঁর জীবনের আলো-ছায়া সবচেয়ে স্পষ্ট হয় প্রেমের অধ্যায়ে। ১৯৫১ সালে তারানা ছবির শুটিংয়ে দিলীপ কুমারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে। বন্ধুত্ব থেকে প্রেম, এমনকি বিয়ের সিদ্ধান্তও হয়েছিল। কিন্তু মধুবালার বাবার আপত্তি আর দিলীপ কুমারের দেওয়া শর্ত—পরিবার ত্যাগ ও অভিনয় ছেড়ে দেওয়া—এই সম্পর্ককে ভেঙে দেয়। অভিনয় ছাড়তে প্রস্তুত থাকলেও পরিবার ছাড়তে রাজি হননি মধুবালা। সেই সিদ্ধান্তই হয়তো তাঁর জীবনের সবচেয়ে কঠিন মোড়, যেখানে জয়ী হয় পরিবার, আর হারিয়ে যায় প্রেম।
পরে তিনি বিয়ে করেন কিংবদন্তি গায়ক কিশোর কুমারকে। পরিচয় হয়েছিল চলতি কা নাম গাড়ি-র সেটে। কিন্তু সেই দাম্পত্যও ছিল নানা জটিলতায় ভরা।
সাফল্যের আড়ালে তাঁকে ঘিরে ছিল অপপ্রচার। কয়েকটি ছবি না চলতেই তাঁকে বলা হয় “বক্স অফিস পয়জন”। অসুস্থতার কারণে শুটিংয়ে একটি দৃশ্য করতে অস্বীকৃতি জানানো নিয়েও ছড়ায় বিকৃত প্রচার। মানসিক চাপ এতটাই বেড়ে যায় যে সংবাদমাধ্যমকে শুটিং সেটে নিষিদ্ধ করেন তিনি। নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে থাকেন, এমনকি তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোরারজি দেশাই তাঁকে লাইসেন্সপ্রাপ্ত রিভলভার ও সশস্ত্র নিরাপত্তা দেন—যা সে সময় ছিল নজিরবিহীন।
জন্মগত হৃদরোগের সঙ্গে দীর্ঘ লড়াই শেষে মাত্র ৩৬ বছর বয়সে, ১৯৬৯ সালে না ফেরার দেশে চলে যান মধুবালা। রেখে গেলেন রূপের বিস্ময়, অপূর্ণ প্রেমের বেদনা, অপপ্রচারের ক্ষত—আর এক কিংবদন্তি হয়ে ওঠার অনন্ত ইতিহাস।
ভালোবাসার দিনে জন্ম নেওয়া এই তারকার জীবন যেন শেষ পর্যন্ত এক প্রশ্নই ছুড়ে দেয়—প্রেমের চেয়ে কি পরিবার বড়? নাকি এ দুয়ের মাঝেই হারিয়ে যায় একজন মানুষের নিজের গল্প?