চব্বিশের আন্দোলনের পর দুর্নীতি, অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার জঞ্জাল সরিয়ে অর্থনীতিতে নতুন দিগন্ত আনার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বছর শেষে দেখা যাচ্ছে, সেই প্রত্যাশা বিন্দুমাত্র পূরণ হয়নি। ব্যাংক খাতসহ কিছু ক্ষেত্রে তথাকথিত সংস্কারের প্রলেপ পড়লেও সামগ্রিক অর্থনীতি একদমই স্থবির। প্রত্যাশার ফানুস খুব বেশি উড়তে পারেনি।
অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রায় দেড় বছর পরও প্রবৃদ্ধি জড়তায় ভুগছে। বিনিয়োগে খরা, কর্মসংস্থানে স্থবিরতা এবং মূল্যস্ফীতির চাপ সাধারণ মানুষের জীবনকে কঠিন করে তুলেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, সত্যিকারের সংস্কারের ধারা তৈরী করা গেলে অর্থনীতিতে গুণগত পরিবর্তন আসবে, তবে এর জন্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রয়োজন।
বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের পর একটি গ্রহণযোগ্য সরকার গঠিত হলে অর্থনীতিতে আস্থার সংকট কাটবে। বিনিয়োগকারীরা ইতিবাচক হবেন, কর্মসংস্থান বাড়বে এবং প্রবৃদ্ধি পুনরায় গতি পাবে। সুষ্ঠু নির্বাচন হলে রাজনৈতিক অস্থিরতা কমবে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন হবে। এতে অর্থনীতির জন্য নতুন সূচনা তৈরি হবে।
তবে অর্থনীতি সবার জন্য শুভ হবে তখনই, যখন মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আসবে এবং সীমিত আয়ের মানুষের কষ্ট কমবে। প্রান্তিক মানুষের জীবনে ভিন্নতা আসবে এবং ঊর্ধ্বমুখী পরিবর্তন ঘটবে।
২০২৫ সাল ছিল দুঃসহ অভিজ্ঞতার বছর। ব্যাংক খাতের দগদগে ঘা শুকায়নি, উল্টো খেলাপি ঋণ বেড়ে ছয় লাখ কোটি ছাড়িয়েছে। শরীয়াহভিত্তিক পাঁচ ব্যাংক একীভূত করা হলেও গ্রাহকদের আস্থা পুরোপুরি ফেরেনি।
বিনিয়োগে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে উদ্যোক্তারা নতুন ব্যবসায় হাত দিতে সাহস পাচ্ছেন না। তারা শুধু চলমান ব্যবসা যেনতেনভাবে সচল রাখতে সচেষ্ট, কিন্তু নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না।
রপ্তানি খাতেও ধাক্কা এসেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ক ঝড় এবং ইউরোপীয় বাজারে স্থবিরতা রপ্তানি আয় কমিয়েছে। নভেম্বরে রপ্তানি আয় কমেছে ৫.৫৪ শতাংশ। পোশাক রপ্তানিকারকরা বলছেন, নির্বাচনের সময় বায়াররা সন্দিহান থাকায় অর্ডার কম দিয়েছে।
মূল্যস্ফীতি ছিল বছরের সবচেয়ে বড় চাপ। জুলাই আন্দোলনের পর তা রেকর্ড ১১.৬৬ শতাংশে উঠেছিল। অক্টোবরে কমে ৮.১৭ শতাংশে নামলেও খাদ্য মূল্যস্ফীতি আবার বেড়েছে। ফলে নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনমানের অবনতি অব্যাহত রয়েছে।
সরকারি ব্যয়েও স্থবিরতা দেখা গেছে। এডিপি বাস্তবায়নে গতি ফেরেনি, বরাদ্দের মাত্র ১২ শতাংশ খরচ হয়েছে। রাজস্ব আদায়েও ঘাটতি ছিল প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকা।
ব্যাংক খাতের দুরবস্থা কাটেনি। বড় ঋণগ্রহীতাদের কাছ থেকে অর্থ ফেরত না পাওয়ায় তারল্য সংকট অব্যাহত। আমানতের সুদহার কিছুটা কমলেও ঋণের সুদহার কমেনি। ফলে বেসরকারি খাতে ঋণের মন্দা কাটছে না।
ডলার সংকট কিছুটা কমলেও খেলাপি ঋণ বাড়তে বাড়তে ভয়াবহ অবস্থায় পৌঁছেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ঘোষণা দিয়েছে, ২০ কোটি টাকার ওপরে থাকা সব ঋণ যাচাই করা হবে। তবে অর্থ পাচার রোধে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কিছুটা অগ্রগতি হলেও নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনমানের অবনতি অব্যাহত। নতুন কর্মসংস্থান তৈরি না হওয়ায় চাপ আরও বেড়েছে। সিপিডির মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “মূল্যস্ফীতির প্রবণতা নিচের দিকে হলেও জীবনমানের অবনমন অব্যাহত।”
বিশ্ব ব্যাংকের সাবেক অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, “মূল্যস্ফীতির ক্ষেত্রে আমাদের অর্জন খুবই সীমিত।”
র্যাপিডের চেয়ারম্যান এম এ রাজ্জাক বলেন, সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা চিহ্নিত হলেও বাস্তবায়নে দৃঢ় প্রয়াস দেখা যায়নি। মাঝপথে থেমে গেলে অর্থনীতির উন্নতি সম্ভব নয়।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নির্বাচনের পর যদি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত হয় তবে অর্থনীতিতে নতুন সূচনা সম্ভব। আস্থার সংকট কাটলে বিনিয়োগ বাড়বে, কর্মসংস্থান তৈরি হবে এবং প্রবৃদ্ধি পুনরায় গতি পাবে।
২০২৫ সালের অর্থনীতি ছিল দুঃসহ অভিজ্ঞতার বছর। মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগ স্থবিরতা ও ব্যাংক খাতের দুর্দশা কাটেনি। নতুন বছরে অর্থনীতির শুভ বছর আসবে কিনা তা নির্ভর করছে নির্বাচনের ফলাফল, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর।