রাজনৈতিক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের মধ্য দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ শেষ হচ্ছে। নতুন সরকারের কাঁধে উঠছে ২৩ লাখ কোটি টাকারও বেশি সরকারি ঋণের ভার যার বড় অংশই সঞ্চিত হয়েছে শেষ ১৯ মাসে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম দিন থেকেই বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারকে উচ্চ ঋণনির্ভরতা, সুদহার চাপ, বিনিয়োগ স্থবিরতা ও রাজস্ব ঘাটতির বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংক–এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষে দেশি-বিদেশি উৎস মিলিয়ে সরকারি ঋণ দাঁড়িয়েছে ২২ লাখ ৫০ হাজার ৯০৪ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে সরকার ব্যাংকিং উৎস থেকে নিয়েছে ৬১ হাজার ১৪৮ কোটি টাকা; একই সময়ে এসেছে ১০৭ কোটি ৪০ লাখ ডলারের নিট বৈদেশিক ঋণ। প্রতি ডলার ১২২ টাকা ধরে এর পরিমাণ প্রায় ১৩ হাজার ১০৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রথম ছয় মাসেই দেশি-বিদেশি মিলিয়ে নতুন ঋণ ৭৪ হাজার ২৫১ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে গত ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট ঋণ দাঁড়িয়েছে ২৩ লাখ ২৫ হাজার ১৫৫ কোটি টাকা যা শেষ ১৯ মাসে দ্রুত বেড়েছে।
ব্যাংকিং উৎসে সরকারের দৌঁড়
২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতের মোট বিতরণকৃত ঋণ ২৩ লাখ ৮৪ হাজার ৯৬৮ কোটি টাকা; এক বছর আগে ছিল ২১ লাখ ৫১ হাজার ১৭৪ কোটি টাকা। বছরভিত্তিক প্রবৃদ্ধি প্রায় ১১ শতাংশ। এর মধ্যে ৫৭ শতাংশ বা ১ লাখ ৩৩ হাজার ৭৫৩ কোটি টাকাই গেছে সরকারের ঝুলিতে। ব্যাংকিং উৎস থেকে সরকারের মোট ঋণ বেড়ে ৫ লাখ ৪৯ হাজার ৩২৬ কোটি টাকায় পৌঁছেছে (আগের বছর ৪ লাখ ১৫ হাজার ৫৭৩ কোটি)। অথচ রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে ব্যাংক ঋণ ৫.৩৯ শতাংশ কমে ৪৭ হাজার ৬১৮ কোটিতে নেমেছে—যা দেখায় সরকারি ধারগ্রহণের চাপই ছিল মুখ্য।
মুদ্রানীতিতে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি ঋণ নিয়েছে সরকার। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথমার্ধে সরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ছিল ২০.৫ শতাংশ; বাস্তবে তা ২৮.৯ শতাংশে পৌঁছায়। দ্বিতীয়ার্ধে লক্ষ্য কিছুটা বাড়িয়ে ২১.৬ শতাংশ করা হয়েছে—যা নীতিগত দ্বিধা ও চাপের ইঙ্গিত দেয়।
‘ক্রাউডিং আউট’ ও বিনিয়োগ খরা
সরকারি ঋণ বেড়ে গেলে সুদহার ঊর্ধ্বমুখী হয় এবং বেসরকারি খাত সঙ্কুচিত হওয়াই ‘ক্রাউডিং আউট’ প্রভাব। বর্তমান প্রেক্ষাপটে সেই লক্ষণ স্পষ্ট। নীতি সুদহার প্রায় দুই বছর ১০ শতাংশে স্থির থাকায় বাণিজ্যিক ঋণের সুদ ১৪-১৫ শতাংশে উঠে গেছে। তবু মূল্যস্ফীতি কাঙ্ক্ষিতভাবে কমেনি; বরং বিনিয়োগে খরা নেমেছে।
২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে বেসরকারি খাতে ঋণের স্থিতি ১৭ লাখ ৮৮ হাজার ২৪ কোটি টাকা (এক বছর আগে ১৬ লাখ ৮৫ হাজার ২৭১ কোটি)। প্রবৃদ্ধি মাত্র ৬.১ শতাংশ, যেখানে লক্ষ্য ছিল ৭.২ শতাংশ। নতুন মুদ্রানীতিতে জুন পর্যন্ত বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ৮.৫ শতাংশ ধরা হলেও উচ্চ সুদ, আস্থাহীনতা ও চাহিদা সংকোচনের মধ্যে তা অর্জন কতটা সম্ভব—তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
রাজস্ব ঘাটতি ও ব্যয়ের চাপ
অর্থ বিভাগের সাবেক জ্যেষ্ঠ সচিব মাহবুব আহমেদের ভাষ্য—রাজস্ব আহরণ বাজেট লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় কম হওয়ায় ঋণনির্ভরতা বেড়েছে। বিদ্যুৎ-জ্বালানি বকেয়া, সঞ্চয়পত্রের দায় ও পরিচালন ব্যয়ও চাপ বাড়িয়েছে। ব্যয় সংকোচনের ঘোষণা বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে ব্যাংক থেকে ধার নেওয়াই হয়েছে সহজ পথ।
অন্যদিকে, ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর মতে, ব্যাংক খাত আগের সংকট থেকে সবে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে; নজরদারি বেড়েছে; নতুন ঋণগ্রহণে উদ্যোক্তারা সতর্ক। ফলে বিনিয়োগের গতি কমেছে। পুঁজিবাজার থেকেও মূলধন সংগ্রহে অনীহা দেখা যাচ্ছে।
আমদানি ও শিল্পখাতের ইঙ্গিত
২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথমার্ধে শিল্পের মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি এলসি খোলা ২৩.৬৪ শতাংশ বাড়লেও নিষ্পত্তি কমেছে ১৬ শতাংশ। মধ্যবর্তী পণ্যে এলসি খোলা ১.৭৯ শতাংশ ও নিষ্পত্তি ১৩ শতাংশ কমেছে। কাঁচামালে এলসি খোলা ২.১৩ শতাংশ ও নিষ্পত্তি ০.২২ শতাংশ কম। খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিনিয়োগ খরা ও ভোগব্যয় কমে যাওয়াই এর পেছনে কাজ করছে—যা ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির জন্য অশনিসংকেত।
বিশ্লেষকদের সতর্কবার্তা
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ–এর নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, সরকার ক্রমেই ব্যাংকনির্ভর হয়ে পড়ছে; কর-জিডিপি অনুপাত কমে যাওয়ায় রাজস্ব ঘাটতি স্থায়ী রূপ নিচ্ছে। বেসরকারি বিনিয়োগ জিডিপির ২৩-২৪ শতাংশে আটকে থেকে ২০২৪-২৫-এ নেমে ২২.৫ শতাংশে এসেছে অর্থাৎ উৎপাদন সম্প্রসারণ থমকে আছে। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি, সম্ভাব্য পে-স্কেল বাস্তবায়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য পূরণে বড় অঙ্কের অর্থ প্রয়োজন হবে; কিন্তু বিনিয়োগ না বাড়লে কর্মসংস্থান কীভাবে হবে—এ প্রশ্নই এখন মূল।
সামনে কী?
শেষ ১৯ মাসে দ্রুত ঋণনির্ভরতা, উচ্চ সুদহার ও বিনিয়োগ স্থবিরতার সমন্বিত প্রভাব অর্থনীতিকে দুর্বল করেছে। নতুন সরকার যদি রাজস্ব সংস্কার, ব্যয় অগ্রাধিকার নির্ধারণ, ঋণ ব্যবস্থাপনা কৌশল ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ—এই চার ফ্রন্টে দ্রুত পদক্ষেপ না নেয়, তবে ঋণের ভার ও ‘ক্রাউডিং আউট’ প্রভাব আরও গভীর হতে পারে। আস্থা ফিরিয়ে আনা, কাঠামোগত সংস্কার ও নীতির সামঞ্জস্য—এই ত্রিভুজেই নির্ভর করছে অর্থনীতির পরবর্তী অধ্যায়।