দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। রাজস্ব আদায়ে ধীরগতি, ব্যবসাবাণিজ্যে মন্দা, বাজেট বাস্তবায়নে তলানিতে অবস্থান, মূল্যস্ফীতির উচ্চ চাপ, কর্মসংস্থানে অচলাবস্থা, রপ্তানিতে কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধির অভাব এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগে ভাটা—সব মিলিয়ে অর্থনীতিতে আস্থাহীনতা বাড়ছে। ব্যাংক খাতেও দেখা দিয়েছে ২৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ খেলাপি ঋণ।
গত বছরের আগস্টে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকার অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার চেষ্টা করলেও কাঙ্ক্ষিত ফল আসেনি। প্রায় দেড় বছর পর জাতীয় নির্বাচন ঘনিয়ে আসায় সামনের দিনগুলোতে অস্থিরতা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, অনিশ্চয়তা কিছুটা কমলেও আস্থাহীনতার কারণে অস্থিরতা বেড়েছে।
সরকার ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের ঘোষণা দিয়েছে। এ সময়ে প্রান্তিক অঞ্চলে টাকার সরবরাহ বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে বিনিয়োগ পরিস্থিতিতে তেমন পরিবর্তন আসবে না। কর্মসংস্থানের ভাটা কাটার সম্ভাবনাও নেই। বরং টাকার প্রবাহ বাড়ায় মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়তে পারে।
নির্বাচনি ডামাডোলের কারণে বাজেট বাস্তবায়নের গতি কমার আশঙ্কা রয়েছে। উন্নয়ন ব্যয় না বাড়লেও অনুন্নয়ন ব্যয় বেড়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও দেশি-বিদেশি ঋণের সুদ পরিশোধসহ পরিচালন খরচ বেড়েছে আগের বছরের তুলনায় ১০ হাজার কোটি টাকা। তিন মাসে পরিচালন ব্যয় প্রথমবারের মতো ১ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। ফলে উন্নয়ন প্রকল্পে পর্যাপ্ত অর্থ খরচ করা যাচ্ছে না।
অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে গত আট বছরের মধ্যে উন্নয়নে সবচেয়ে কম খরচ হয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চার মাসে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১৭ হাজার কোটি টাকা। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, নির্বাচন ঘিরে মানুষের ভোগ বাড়বে, ব্যয়ও বৃদ্ধি পাবে। বাজারে টাকার সরবরাহ বাড়ায় মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়ার শঙ্কা রয়েছে।
পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, দারিদ্র্যের হার বেড়েছে, মানুষের আয় কমেছে। বিনিয়োগ বাড়ানো ছাড়া অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় রাখা সম্ভব নয়। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বিনিয়োগের জন্য অপরিহার্য। ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা যায়নি, বরং আস্থাহীনতা বেড়েছে। কর্মসংস্থান বাড়াতে হলে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ বাড়াতে হবে।
গত তিন বছরের বেশি সময় ধরে দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে। অক্টোবর মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৮.১৭ শতাংশ। অন্তর্বর্তী সরকার উদ্যোগ নিয়ে তা এক অঙ্কে নামালেও বাজেটের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে এখনো বেশি। দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বেড়েছে। বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে, আগামী কয়েক বছরে দেশে দারিদ্র্য জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ৬ কোটি ছাড়িয়ে যেতে পারে। কর্মসংস্থানের চাকা থেমে যাওয়ায় আয় কমেছে, জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে।
দেশের ব্যবসাবাণিজ্যে চরম অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে। রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতা বাড়ছে। ব্যাংক খাতেও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির ঋণপত্র নিষ্পত্তি কমেছে ১১ শতাংশ। ফলে নতুন কারখানা স্থাপন হয়নি, পুরোনো অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এগুলো পুনরায় চালু হবে কি না, তার নিশ্চয়তা নেই।
সব মিলিয়ে বলা যায়, রাজস্ব ঘাটতি, মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগে ভাটা এবং কর্মসংস্থানের অচলাবস্থা দেশের অর্থনীতিকে জটিল অবস্থায় নিয়ে গেছে। নির্বাচনের আগে ও পরে অস্থিরতা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।