জুলাই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর বিনিয়োগে নতুন জোয়ারের যে আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল, দেড় বছর পর তার কোনো দৃশ্যমান প্রতিফলন নেই। বরং বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) এখন সময় চাইছে, সম্মেলনের ফল পেতে ‘আরও অপেক্ষা’ করার যুক্তিতে আড়াল করা হচ্ছে ধারাবাহিক ব্যর্থতা। ২০২৪ সালের ৭–১০ এপ্রিল আয়োজিত আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ সম্মেলনে ৩ হাজার ১০০ কোটি টাকার প্রস্তাব এলেও এরপর নতুন কোনো উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ ধারা তৈরি হয়নি।
পরিসংখ্যান বলছে, পরিস্থিতি উন্নতির নয়, বরং স্পষ্ট অবনতির। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে বিডায় দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ প্রস্তাব নিবন্ধন কমেছে ৫৮ শতাংশ। বেসরকারি খাতে নিবন্ধিত বিনিয়োগ নেমে এসেছে ৬৬ হাজার ৫৭ কোটি টাকায়, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় অর্ধেকের কাছাকাছি। প্রকল্প সংখ্যাও কমেছে। অথচ বাংলাদেশের জিডিপি ৫০–৫৫ লাখ কোটি টাকার হলেও বিনিয়োগ নিবন্ধন ঘুরপাক খাচ্ছে মাত্র এক থেকে দেড় লাখ কোটি টাকার মধ্যে যা মোট জিডিপির ২ থেকে ৩ শতাংশ। প্রকৃত বিনিয়োগ বাস্তবায়ন এরও অনেক কম।
বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান দায়িত্ব নেওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, যুক্তরাজ্য, কাতার, চীন, মালয়েশিয়া, তুরস্ক, কোরিয়া একের পর এক বিদেশ সফর করেছেন। কিন্তু সফরের ক্যালেন্ডার যত সমৃদ্ধ, ফলাফল ততই হতাশাজনক। কাতার থেকে কোনো নতুন বিনিয়োগ আসেনি। যুক্তরাজ্য থেকে নিট এফডিআই কমেছে ৪০ দশমিক ৭১ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিনিয়োগ আসার চেয়ে বেশি অর্থ প্রত্যাবাসিত হয়েছে। জাপান ও যুক্তরাজ্য থেকে প্রস্তাব নিবন্ধন কমেছে। চীনের ক্ষেত্রে পতন আরও নাটকীয়! নতুন প্রস্তাব নিবন্ধন কমেছে ৮৯ শতাংশ, নিট এফডিআই প্রবাহ কমেছে ৩ দশমিক ৩ শতাংশ। বিনিয়োগ আনতে ব্যর্থ হয়ে তিনি প্রায়শই করছেন আকাশ থেকে ঝাঁপাঝাঁপি।
এদিকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন এই ব্যর্থতার পেছনে কারণ নতুন নয়। কাগজে কলমে বহুবার ঘোষিত ওয়ানস্টপ সার্ভিস আজও কার্যত অকার্যকর। গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট কাটেনি, শীত মৌসুমেও নিয়মিত লোডশেডিং চলছে। ভূমি, সংযোগ, ছাড়পত্র—সবখানেই আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও দুর্নীতির জাল। বিনিয়োগ সম্মেলনের জাঁকজমক দেখিয়ে বাস্তব সংস্কারে হাত না দেওয়া ছিল অন্তর্বর্তী সরকারের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা।
আরও গভীর আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায়। নির্বাচিত সরকার না থাকায় বিনিয়োগকারীদের কাছে রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা ও নীতির ধারাবাহিকতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর নতুন করে বিপুলসংখ্যক মানুষ বেকার হয়েছে, অথচ কর্মসংস্থানে কোনো নতুন গতি আসেনি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাতারাতি বিনিয়োগ আসবে এ ধরনের উচ্চাশা দেখানোই ছিল অন্তর্বর্তী সরকারের ভুল ও প্রতারণামূলক কৌশল। দরকার ছিল বিদ্যুৎ-গ্যাস, বন্দর, কাস্টমস, ভূমি ব্যবস্থাপনা ও আমলাতন্ত্রে বাস্তব সংস্কার। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার বিনিয়োগ পরিবেশ বদলানোর বদলে সম্মেলন ও সফরের মধ্যেই মিথ্যে সাফল্যের গল্প খুঁজেছে।
বিডা চেয়ারম্যান সময় চাইলেও বাস্তবতা হলো সময়ের অভাব নয়, সংস্কারের অভাবই বিনিয়োগের প্রধান শত্রু। নির্বাচিত সরকারের হাতে দায়িত্ব হস্তান্তরের আগেই যদি নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার শুরু না হয়, তাহলে বিনিয়োগ সম্মেলন নয়, আস্থার সংকটই বাংলাদেশের অর্থনীতির স্থায়ী পরিচয়ে পরিণত হবে।