সর্বশেষ

প্রবৃদ্ধি পূর্বাভাস কমাল বিশ্বব্যাংক

জাতিসংঘের মূল্যায়নে দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি বাংলাদেশে

প্রকাশিত: ১৫ জানুয়ারি ২০২৬, ২৩:৫৮
জাতিসংঘের মূল্যায়নে দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি বাংলাদেশে

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে তীব্র মূল্যস্ফীতি সংকটে রয়েছে বাংলাদেশ—এমন স্পষ্ট মূল্যায়ন দিয়েছে জাতিসংঘ। একই সঙ্গে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও স্থবির ব্যবসায়িক পরিবেশের কারণে ২০২৫–২৬ অর্থবছরের জন্য বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়েছে বিশ্বব্যাংক। এই দুই আন্তর্জাতিক সংস্থার সর্বশেষ প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে গভীর উদ্বেগের চিত্র উঠে এসেছে।

 

জাতিসংঘের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে বাংলাদেশের গড় মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৯ শতাংশ, যা দক্ষিণ এশিয়ার সাতটি দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ। একই সময়ে ভারতের মূল্যস্ফীতি ২ দশমিক ৭ শতাংশ এবং শ্রীলঙ্কার মাত্র ০ দশমিক ৬ শতাংশ। আরও উদ্বেগজনক হলো, ২০২৬ সালেও বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ১ শতাংশে থাকবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে জাতিসংঘ, যা দক্ষিণ এশিয়ার অন্য সব দেশের চেয়ে বেশি।

 

এই পরিসংখ্যান শুধু সামষ্টিক অর্থনীতির নির্দেশক নয়; বরং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের কঠিন বাস্তবতাকেই তুলে ধরে। এক বছর আগে যেখানে একটি পরিবার মাসিক বাজারে ১০ হাজার টাকা ব্যয় করত, সেখানে এখন একই পণ্য কিনতে লাগছে প্রায় ১৫ হাজার টাকা। শিক্ষক, বেতনভুক্ত কর্মচারী, দিনমজুর, রিকশাচালক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা সবাই বাড়তি খরচের চাপে নাকাল। মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো জীবনযাত্রার মান কমাতে বাধ্য হচ্ছে, আর নিম্নআয়ের মানুষ তিন বেলা খাবার জোগাড় করতেই হিমশিম খাচ্ছে।

 

 

বিশ্লেষকেরা বলছেন, আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অবস্থান আরও বিব্রতকর। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভয়াবহ মুদ্রাস্ফীতির মধ্য দিয়ে যাওয়া শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তান পরিস্থিতি সামাল দিতে সক্ষম হলেও বাংলাদেশ টানা দেড় বছরের বেশি সময় ধরে ৮ শতাংশের ওপরে আটকে আছে। শ্রীলঙ্কা যেখানে ২০২১ সালের ৪৯ শতাংশ মূল্যস্ফীতি কমিয়ে ০ দশমিক ৬ শতাংশে নামিয়েছে, পাকিস্তানও ৩০ শতাংশ থেকে তা প্রায় ৪ শতাংশে নামিয়েছে।

 

এদিকে বিশ্বব্যাংক তাদের ‘গ্লোবাল ইকোনমিক প্রসপেক্টস জানুয়ারি ২০২৬’ প্রতিবেদনে বাংলাদেশের জন্য ২০২৬ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে ৪ দশমিক ৬ শতাংশ করেছে, যা আগের হিসাব ছিল ৪ দশমিক ৯ শতাংশ। বিশ্বব্যাংকের মতে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, কঠোর মুদ্রানীতি, উচ্চ সুদের হার ও ব্যবসায়িক স্থবিরতার কারণে বিনিয়োগ ও ঋণ চাহিদা কমে যাওয়ায় প্রবৃদ্ধি মন্থর হচ্ছে।

 

তবে ২০২৭ অর্থবছরের জন্য প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস বাড়িয়ে ৬ দশমিক ১ শতাংশ করেছে সংস্থাটি। আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের পর রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কমা, নতুন সরকারের মাধ্যমে কাঠামোগত সংস্কার বাস্তবায়ন এবং বেসরকারি ভোগব্যয় বাড়ার সম্ভাবনাকে এর কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে বিশ্বব্যাংক।

 

বিশ্বব্যাংক আরও সতর্ক করেছে, বৈশ্বিক বাণিজ্যে শুল্ক বৃদ্ধি বা নীতিগত অনিশ্চয়তা দক্ষিণ এশিয়ার রপ্তানি ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের ওপর তুলনামূলক বেশি নির্ভরশীল হওয়ায় বাংলাদেশ এ ঝুঁকিতে বেশি রয়েছে।

 

অর্থনীতিবিদদের মতে, খাদ্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ছাড়া সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কমানো সম্ভব নয়। ধারাবাহিক ও সুসংহত নীতি না থাকায় মূল্যস্ফীতি দমন ব্যর্থ হচ্ছে। বাজারে মধ্যস্বত্বভোগী ও সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য, দুর্বল নজরদারি এবং নীতির ধারাবাহিকতার অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

 

জাতিসংঘ ও বিশ্বব্যাংকের এই দুই প্রতিবেদন কার্যত বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার ওপর একটি কঠোর মূল্যায়ন। প্রতিবেশী দেশগুলো যেখানে স্থিতিশীলতার পথে, সেখানে বাংলাদেশ মূল্যস্ফীতি ও প্রবৃদ্ধি—দুই সংকটেই চাপে রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

সব খবর

আরও পড়ুন

ভারত বয়কটের ডাক দিয়ে ভারত থেকে আমদানি বেড়েছে সবচেয়ে বেশি

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রথম অর্থবছর (২০২৪-২৫) ভারত বয়কটের ডাক দিয়ে ভারত থেকে আমদানি বেড়েছে সবচেয়ে বেশি

রপ্তানি কমতে কমতে ঋণাত্মক ধারায় চলছে দেশের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি

অর্থবছরের প্রথমার্ধ শেষ রপ্তানি কমতে কমতে ঋণাত্মক ধারায় চলছে দেশের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি

‘ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক অধ্যাদেশ’ নিয়ে এনজিও খাতের উদ্বেগ

‘ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক অধ্যাদেশ’ নিয়ে এনজিও খাতের উদ্বেগ

ডিসেম্বর মাসে মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়ালো ৮.৪৯ শতাংশ

খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধিই প্রধান অনুঘটক ডিসেম্বর মাসে মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়ালো ৮.৪৯ শতাংশ

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে লেনদেন শুরু

টাকা তুলতে চরম ভোগান্তি সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে লেনদেন শুরু

১২০০ টাকার এলপিজির জন্য গুণতে হচ্ছে ২০০০ টাকা

সরকারের উদাসীনতায় ভোক্তার নাভিশ্বাস ১২০০ টাকার এলপিজির জন্য গুণতে হচ্ছে ২০০০ টাকা

অর্থনীতির শুভ বছর আসবে কবে?

অর্থনীতির শুভ বছর আসবে কবে?

গত ১৬ মাসে ৫০ স্পিনিং মিল বন্ধ, কর্মহীন ২ লাখ মানুষ

মতবিনিময় সভায় বিটিএমএর দাবি গত ১৬ মাসে ৫০ স্পিনিং মিল বন্ধ, কর্মহীন ২ লাখ মানুষ