বাংলাদেশের ব্যাংক খাত বর্তমানে নজিরবিহীন সংকটে পড়েছে। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত ঋণের প্রায় ৩৬ শতাংশই খেলাপি হয়ে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, খেলাপি ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা। মাত্র নয় মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকা, যা দেশের ইতিহাসে অভূতপূর্ব।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও গবেষণা সংস্থার তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলাদেশের খেলাপি ঋণের হার এখন বিশ্বের মধ্যে সর্বোচ্চ। যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেনে খেলাপি ঋণের হার ২৬ শতাংশ, লেবাননে ২৪ শতাংশের নিচে, আর রাশিয়ায় মাত্র ৫.৫ শতাংশ। অথচ বাংলাদেশে এ হার ৩৬ শতাংশে পৌঁছেছে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে শ্রীলংকার খেলাপি ঋণের হার ১২.৬ শতাংশ, পাকিস্তানে ৭.৪ শতাংশ, ভারতে ২.৩ শতাংশ এবং নেপালে ৪.৪ শতাংশ। তুলনায় বাংলাদেশের অবস্থান ভয়াবহ।
এশিয়ার অন্যান্য প্রতিযোগী অর্থনীতির দেশগুলোতে খেলাপি ঋণের হার অনেক কম। সিঙ্গাপুরে ১.৩ শতাংশ, মালয়েশিয়ায় ১.৪ শতাংশ, থাইল্যান্ডে ২.৭ শতাংশ, ফিলিপাইনে ৩.৩ শতাংশ, ভিয়েতনামে ৫.৪ শতাংশ এবং ইন্দোনেশিয়ায় ২.১ শতাংশ। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি চীনে খেলাপি ঋণের হার মাত্র দেড় শতাংশ এবং যুক্তরাষ্ট্রে ১.৭ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, খেলাপি ঋণের হার গত ২৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার সময় খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল মাত্র ২২ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু গত দেড় দশকে অনিয়ম, দুর্নীতি, পুনঃতফসিল ও পুনর্গঠনের মাধ্যমে খেলাপি ঋণ আড়াল করা হলেও প্রকৃত চিত্র এখন প্রকাশ্যে এসেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, অতীতে অনেক ঋণ খেলাপি হলেও তা প্রকাশ করা হয়নি। এখন আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে তিন মাস কিস্তি অনাদায়ী থাকলেই ঋণ শ্রেণীকৃত হচ্ছে। ফলে প্রকৃত খেলাপি ঋণের পরিমাণ দৃশ্যমান হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘‘আগে ব্যাংকগুলো খেলাপি ঋণ কার্পেটের নিচে চাপা দিয়ে রাখত। এখন প্রকৃত চিত্র প্রকাশ পাচ্ছে। আশা করছি, ভবিষ্যতে খেলাপি ঋণ কমবে।’’
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, খেলাপি ঋণের এ হার দেশের ব্যাংক খাতের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করেছে। কারণ আমানতকারীদের অর্থ দিয়েই ঋণ বিতরণ করা হয়। খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ায় ব্যাংকগুলোর সঞ্চিতি ঘাটতি বিপুল হারে বেড়েছে। সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংকগুলোর সঞ্চিতি ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা, যা ছয় মাসে দ্বিগুণ হয়েছে। অর্থাৎ ব্যাংকগুলো খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সংরক্ষণ করতে পারছে না।
অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তফা কে মুজেরী মনে করেন, সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক যথেষ্ট কঠোর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে। তিনি বলেন, ‘‘কিছু ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপির দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হলে অন্যরা শিক্ষা নিত। কিন্তু সে ধরনের পদক্ষেপ দেখা যায়নি।’’
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘‘খেলাপি ঋণের হার ৩৫ শতাংশ ছাড়ানো অপ্রত্যাশিত নয়। এতদিন কিছু ব্যাংক তথ্য গোপন করেছিল। এখন প্রকৃত চিত্র প্রকাশ পাচ্ছে।’’ তিনি মনে করেন, খেলাপি ঋণ কমাতে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নিতে হবে এবং অর্থনীতিকে প্রাণবন্ত করতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ইতোমধ্যে কিছু সংস্কার কার্যক্রম শুরু করেছে। অন্তত ১৪টি বেসরকারি ব্যাংকের পর্ষদ ভেঙে দেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনা হয়েছে। শরিয়াহভিত্তিক পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করে একটি ব্যাংকে রূপান্তরের কাজ চলছে। তবে অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, এসব পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়।
সব মিলিয়ে বাংলাদেশের ব্যাংক খাত এখন গভীর সংকটে। খেলাপি ঋণের হার বিশ্বে সর্বোচ্চ হওয়া দেশের অর্থনীতি ও আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি। দ্রুত কার্যকর সংস্কার, কঠোর নজরদারি এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা ছাড়া এ সংকট কাটানো সম্ভব নয়।