সর্বশেষ

বাড়ছে ঋণফাঁদের শঙ্কা

২০২৪-২৫ অর্থবছর বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ঋণ গ্রহণের বছর

প্রকাশিত: ২৬ জানুয়ারি ২০২৬, ০৩:৪৮
২০২৪-২৫ অর্থবছর বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ঋণ গ্রহণের বছর

২০২৪-২৫ অর্থবছর বাংলাদেশের সরকারি ঋণ ইতিহাসে একটি নজিরবিহীন অধ্যায় হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই এক অর্থবছরেই দেশী ও বিদেশী উৎস থেকে সরকার ঋণ নিয়েছে ৩ লাখ ২৮ হাজার ২৪৯ কোটি টাকা যা একক বছরে ইতিহাসে সর্বোচ্চ। এর ফলে দেশের মোট সরকারি ঋণের স্থিতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২২ লাখ ৫০ হাজার ৯০৪ কোটি টাকায়।

 

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের সময় ২০২৩-২৪ অর্থবছর শেষে সরকারি ঋণের পরিমাণ ছিল ১৯ লাখ ২২ হাজার ৬৫৫ কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানে এই ঋণ বেড়েছে প্রায় ১৭ শতাংশ। অথচ অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর অনেকেই প্রত্যাশা করেছিলেন ব্যয় সংকোচন ও ঋণনির্ভরতা কমানোর উদ্যোগ দেখা যাবে। বাস্তবে ঘটেছে উল্টো, ঋণ গ্রহণের গতি অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি।

 

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, মোট ঋণের মধ্যে দেশী ঋণ ১১ লাখ ৩ হাজার ৯৩৯ কোটি এবং বিদেশী ঋণ ১১ লাখ ৪৬ হাজার ৯৬৫ কোটি টাকা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ঋণ বৃদ্ধির ধারা শুধু পরিমাণগত নয়, কাঠামোগত ঝুঁকিও বাড়াচ্ছে।

 

 

অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমান সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে ঋণের সুদ পরিশোধ। শুধু ২০২৪-২৫ অর্থবছরেই সুদ বাবদ পরিশোধ করতে হয়েছে ১ লাখ ৩৪ হাজার ৪৩০ কোটি টাকা, যা মোট সরকারি ব্যয়ের ২১ শতাংশেরও বেশি। চলতি অর্থবছরে এই চাপ আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। অর্থাৎ উন্নয়ন ব্যয়ের বড় একটি অংশ সরাসরি চলে যাচ্ছে ঋণের সুদ পরিশোধে।

 

বিশেষ উদ্বেগের বিষয় হলো, আগামী কয়েক বছরে বড় বড় মেগা প্রকল্পের ঋণের কিস্তি পরিশোধের সময় শুরু হচ্ছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেল, পদ্মা সেতু রেল সংযোগ—এই প্রকল্পগুলোর ঋণ পরিশোধ চলবে ২০৪৮ থেকে ২০৬২ সাল পর্যন্ত। অনেক প্রকল্প থেকেই প্রত্যাশিত আয় আসছে না, ফলে রাজস্ব দিয়ে কিস্তি পরিশোধ করাই হবে মূল ভরসা।

 

এর পাশাপাশি রাজস্ব আহরণ পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসেই রাজস্ব ঘাটতি হয়েছে ৪৬ হাজার কোটি টাকা। জিডিপির তুলনায় রাজস্ব আহরণে বাংলাদেশ বিশ্বের সর্বনিম্ন দেশগুলোর একটি। এই দুর্বল রাজস্ব কাঠামোর ওপর ভর করে ক্রমবর্ধমান ঋণের বোঝা টেকসই হবে কি না এ প্রশ্ন উঠছে জোরালোভাবে।

 

বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের যৌথ ডেট সাসটেইনেবিলিটি অ্যানালাইসিসে ইতিমধ্যে বাংলাদেশের ঋণঝুঁকি ‘নিম্ন’ থেকে ‘মধ্যম’ পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিম্ন রাজস্ব আয় ও অগভীর স্থানীয় ঋণ বাজারের কারণে ভবিষ্যতে দায় পরিশোধের সক্ষমতায় উল্লেখযোগ্য ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

 

অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন সতর্ক করে বলেছেন, ধার করে দীর্ঘদিন কোনো সরকার চলতে পারে না। তার মতে, রাজস্ব আহরণ না বাড়িয়ে বেতন-ভাতা বাড়ানোর পরিকল্পনা ঋণ সংকটকে আরও ঘনীভূত করবে। অন্যদিকে ড. মোস্তফা কে মুজেরী মনে করেন, অতীতের মেগা প্রকল্পে নেয়া বিদেশী ঋণের বড় অংশ অপচয় ও পাচারের মাধ্যমে নষ্ট হয়েছে, যার দায় এখন বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সরকারকে বহন করতে হবে।

 

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে এখন আর বড় উন্নয়ন প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে না; বরং সুদ পরিশোধ ও পরিচালন ব্যয় মেটাতে নতুন ঋণ নিতে হচ্ছে। এটি ঋণনির্ভর অর্থনীতির একটি বিপজ্জনক পর্যায় নির্দেশ করে।

 

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর যে সরকার দায়িত্ব নেবে, তাদের পুরো মেয়াদজুড়েই এই ঋণের বোঝা বহন করতে হবে। রাজস্ব সংস্কার, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ ও ঋণ ব্যবস্থাপনায় কাঠামোগত সংস্কার না হলে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে একটি পূর্ণাঙ্গ ঋণফাঁদের দিকে এগিয়ে যাবে—এমন আশঙ্কাই এখন অর্থনীতিবিদদের প্রধান সতর্কবার্তা।

সব খবর

আরও পড়ুন

নির্বাচনের আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইউনূস সরকারের ‘গোপন’ শুল্ক চুক্তি

স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ নির্বাচনের আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইউনূস সরকারের ‘গোপন’ শুল্ক চুক্তি

বিদেশিদের কাছে ইজারা দেওয়ার প্রতিবাদে চট্টগ্রাম বন্দরে ২৪ ঘণ্টার কর্মবিরতি

অচল আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম বিদেশিদের কাছে ইজারা দেওয়ার প্রতিবাদে চট্টগ্রাম বন্দরে ২৪ ঘণ্টার কর্মবিরতি

কমতে কমতে তলানিতে বিদেশি বিনিয়োগ

ক্ষতবিক্ষত বেসরকারি খাত কমতে কমতে তলানিতে বিদেশি বিনিয়োগ

বেতন বৃদ্ধির বাস্তবতা: কার স্বস্তি, কার চাপ

বেতন বৃদ্ধির বাস্তবতা: কার স্বস্তি, কার চাপ

দোসর খোঁজার নামে বিপর্যস্ত বেসরকারি খাত

বিনিয়োগে ইতিহাস সর্বোচ্চ মন্দা দোসর খোঁজার নামে বিপর্যস্ত বেসরকারি খাত

ব্যয়সাশ্রয়ী নীতির ঘোষণা দিয়ে উল্টো পথে অন্তর্বর্তী সরকার

ব্যয়সাশ্রয়ী নীতির ঘোষণা দিয়ে উল্টো পথে অন্তর্বর্তী সরকার

গাজীপুর ও সাভারে বন্ধ ৩২৭ কারখানা, কর্মহীন দেড় লক্ষাধিক শ্রমিক

গাজীপুর ও সাভারে বন্ধ ৩২৭ কারখানা, কর্মহীন দেড় লক্ষাধিক শ্রমিক

চমক নয়, ব্যর্থতার হিসাবই বড় হয়ে উঠছে বিডার সামনে

নতুন আশা নেই বিনিয়োগে চমক নয়, ব্যর্থতার হিসাবই বড় হয়ে উঠছে বিডার সামনে