বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারত-বিরোধী স্লোগান নতুন কিছু নয়। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে গত দেড় বছরে অন্তর্বর্তী সরকার ও তাদের অংশীজনদের রাজনৈতিক বক্তব্যে ভারত-বিরোধিতা যেন বিশেষ মাত্রা পেয়েছে। রাজনৈতিক বক্তৃতায় ভারতকে দায়ী করা হচ্ছে দেশের অভ্যন্তরীণ নানা সংকটের জন্য। সীমান্ত হত্যা থেকে শুরু করে বাণিজ্য বৈষম্য—সব কিছুর বিরুদ্ধেই জনসমক্ষে তীব্র সমালোচনা করা হচ্ছে।
তবে বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। বাংলাদেশে রাজনৈতিক পরিবর্তন ও ভারতনির্ভরতা কমানোর সরকারি ঘোষণা সত্ত্বেও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভারত থেকেই সবচেয়ে বেশি আমদানি প্রবৃদ্ধি হয়েছে। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০২৫ অনুযায়ী, মোট আমদানিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২ দশমিক ৪৪ শতাংশ, আর শুধু ভারত থেকে আমদানিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৭ দশমিক ৮৩ শতাংশ।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে বড় ধরনের অস্থিরতা নেমে আসে। ৮ আগট অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হওয়ার পর থেকেই ভারতনির্ভরতা কমানোর ডাক দেওয়া হয়। খাদ্য উপদেষ্টা ঘোষণা দেন, ভারতের পাশাপাশি মিয়ানমার, থাইল্যান্ড ও পাকিস্তান থেকে চাল আমদানি করা হবে। একই সময়ে আলু, পেঁয়াজ, সুতা, নিউজপ্রিন্ট, গুঁড়া দুধসহ বিভিন্ন পণ্যে ভারতনির্ভরতা কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ভারতীয় পণ্য বর্জনের আহ্বান ওঠে।
কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে সকল তর্জন গর্জনই সার। ভারত বাংলাদেশীদের ভিসা দেওয়া সীমিত করে, বেশ কিছু পণ্যে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, পোষাক রপ্তানির জন্য বন্দর সুবিধা বাতিল করে, জবাবে বাংলাদেশকে কঠোর কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা না গেলেও অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বিতর্কিত মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকেননি সরকার ঘনিষ্ঠরা।
অথচ স্পষ্টতই বাণিজ্যের হাল-হকিকত দেখাছে ভিন্ন চিত্র। এসব পদক্ষেপ ভারত থেকে আমদানিতে বড় কোনো প্রভাব ফেলেনি। বরং সরকারি ক্রয় ও বাজারের চাহিদার কারণে ভারত থেকে আমদানি বেড়েছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ভারত থেকে আমদানি হয়েছিল ৮৯৮ কোটি ৯০ লাখ ডলারের পণ্য। এক বছর পর তা বেড়ে দাঁড়ায় ৯৬৯ কোটি ৩০ লাখ ডলার।
চীন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় আমদানির উৎস হলেও প্রবৃদ্ধির হার ভারতের চেয়ে কিছুটা কম ছিল। চীন থেকে আমদানি বেড়েছে ৭ দশমিক ৭৩ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি কমেছে ১৩ শতাংশের বেশি। মালয়েশিয়া ও তাইওয়ান থেকেও আমদানি কমেছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বাজার অর্থনীতির প্রবণতা অনুযায়ী আমদানিকারকরা যেখানে কম দামে পণ্য পান, সেখান থেকেই আমদানি করেন। প্রতিবেশী দেশ ভারত ও চীন থেকে পরিবহন খরচ কম পড়ায় এবং উৎপাদন মান প্রতিযোগিতামূলক হওয়ায় সেখান থেকেই বেশি আমদানি হচ্ছে।
সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির বলেন, রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক টানাপড়েন থাকলেও অর্থনীতি ও মানুষের সম্পর্ক এখনো সক্রিয়। এ কারণেই ভারত থেকে আমদানি প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে।