গাজীপুর ও সাভার-আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলে একের পর এক কারখানা বন্ধ হয়ে পড়ায় বিপাকে পড়েছেন পোশাক শ্রমিকরা। শিল্প পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত দেড় বছরে স্থায়ী ও অস্থায়ীভাবে মোট ৩২৭টি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এতে কর্মহীন হয়ে পড়েছেন প্রায় দেড় লক্ষাধিক শ্রমিক।
গাজীপুরে ১৮৮টি কারখানা বন্ধ হয়ে বেকার হয়েছেন এক লাখ ১৫ হাজারের বেশি শ্রমিক। এর মধ্যে স্থায়ীভাবে বন্ধ হওয়া কারখানায় চাকরি হারিয়েছেন প্রায় ৯০ হাজার শ্রমিক। সাভার ও আশুলিয়ায় বন্ধ হয়েছে ১৩৯টি কারখানা, যেখানে প্রায় ৪০ হাজার শ্রমিক বেকার হয়েছেন।
বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, ক্রয়াদেশ সংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানি সংকট, ব্যাংকিং খাতের অসহযোগিতা এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে কারখানাগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। অনেক শ্রমিক নতুন কাজ খুঁজে পাচ্ছেন না। কেউ কেউ রিকশা চালাচ্ছেন, দিনমজুরির কাজ করছেন, আবার কেউ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছেন।
কারখানা বন্ধের প্রভাব পড়েছে স্থানীয় অর্থনীতিতেও। গাজীপুরে বেক্সিমকোসহ বড় বড় কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় হাজার হাজার শ্রমিক গ্রামে ফিরে গেছেন। এতে বাড়িভাড়া, বাজার ও দোকানপাটে মন্দা দেখা দিয়েছে। বাড়িওয়ালারা ঋণ নিয়ে বাড়ি নির্মাণ করেছিলেন, এখন ভাড়াটিয়া না থাকায় ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
শ্রমিকদের দুর্দশার চিত্র আরও স্পষ্ট হয়েছে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায়। লিজ অ্যাপারেলসের সাবেক সুপারভাইজার রুস্তম আলী বলেন, আগে নিয়মিত বেতন পেতেন, কাজের পরিবেশও ভালো ছিল। কিন্তু কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে নাসা গ্রুপের শ্রমিক আলেয়া আক্তার চার মাস ধরে বেকার। তিনি বলেন, “এক বেলা খেয়ে অন্য বেলা উপোস থাকি।”
স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। আশুলিয়ার মুদি দোকানি শফিকুর রহমান জানান, আগে প্রতিদিন ১০-১৫ হাজার টাকার বিক্রি হতো, এখন তা নেমে এসেছে তিন-চার হাজারে। শ্রমিকরা চলে যাওয়ায় বাজারে ক্রেতা নেই।
শ্রমিক সংগঠনগুলো বলছে, নতুন কারখানা গড়ে না ওঠায় শ্রমিকদের কর্মসংস্থান সংকট আরও বাড়ছে। জাতীয় গার্মেন্ট শ্রমিক জোটের নেতা আশরাফুজ্জামান বলেন, প্রতিদিনই শ্রমিক ছাঁটাই চলছে। অনেকেই টেইলারিং, ক্ষুদ্র ব্যবসা বা অন্য পেশায় যুক্ত হচ্ছেন।
সব মিলিয়ে গাজীপুর ও সাভার শিল্পাঞ্চলে কারখানা বন্ধ হয়ে শ্রমিকদের জীবনে নেমে এসেছে চরম দুঃসময়। স্থানীয় অর্থনীতি থেকে শুরু করে সামাজিক স্থিতিশীলতা পর্যন্ত এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।