বিদেশি পণ্যের ওপর নতুন করে আমদানি শুল্ক আরোপের সম্ভাবনা যাচাই করতে বাংলাদেশসহ একাধিক দেশের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তর (ইউএসটিআর) জানিয়েছে, ১৯৭৪ সালের ট্রেড অ্যাক্টের সেকশন ৩০১ অনুযায়ী এই তদন্ত পরিচালিত হবে। এতে বিদেশি দেশগুলোর উৎপাদন ব্যবস্থা, সরকারি নীতি ও বাণিজ্যিক আচরণ যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রতিযোগিতায় কোনো ধরনের বৈষম্য বা প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে কিনা তা খতিয়ে দেখা হবে।
তদন্তের আওতায় বাংলাদেশসহ মোট ১৭টি দেশ ও অর্থনৈতিক অঞ্চলকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তালিকায় রয়েছে চীন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান, ভারত, ভিয়েতনাম, দক্ষিণ কোরিয়া, মেক্সিকো, সিঙ্গাপুর, সুইজারল্যান্ড, নরওয়ে, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, কম্বোডিয়া, থাইল্যান্ড ও তাইওয়ান। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার জানিয়েছেন, মার্কিন শিল্পখাত ও কর্মসংস্থান সুরক্ষাই এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
তদন্তে বিশেষভাবে দেখা হবে—উৎপাদন খাতে অতিরিক্ত সক্ষমতা (ওভারক্যাপাসিটি), সরকারি ভর্তুকি, শ্রমিকদের মজুরি দমন, বাজার বিকৃতকারী নীতি বা জোরপূর্বক শ্রমের মাধ্যমে উৎপাদিত পণ্য যুক্তরাষ্ট্রে আমদানির ক্ষেত্রে অন্যায্য প্রতিযোগিতা তৈরি করছে কিনা। এসব অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর পণ্যের ওপর নতুন আমদানি শুল্ক আরোপ করা হতে পারে।
সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর নতুন কৌশল
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক এক আদালতের রায়ের পর যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপের প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট প্রেসিডেন্টের জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহার করে আরোপিত বেশ কিছু শুল্ক ব্যবস্থা বাতিল করে দেয়। আদালত রায়ে উল্লেখ করে, আমদানি শুল্ক নির্ধারণের প্রধান ক্ষমতা কংগ্রেসের হাতে থাকা উচিত।
এই রায়ের ফলে মার্কিন প্রশাসন বিকল্প আইনি কাঠামোর মাধ্যমে নতুন করে শুল্ক আরোপের পথ খুঁজতে শুরু করে। এরই অংশ হিসেবে ট্রেড অ্যাক্টের বিভিন্ন ধারা ব্যবহার করে স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি দুটি কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে। স্বল্পমেয়াদে বিদেশি পণ্যের ওপর অস্থায়ী শুল্ক আরোপ এবং দীর্ঘমেয়াদে তদন্তের ভিত্তিতে নির্দিষ্ট দেশ বা খাতের ওপর নতুন শুল্ক আরোপের পরিকল্পনা রয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ
বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ যুক্তরাষ্ট্র দেশের সবচেয়ে বড় একক রফতানি বাজার। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতের বড় অংশই যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি হয়। চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারি সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রফতানি হয়েছে প্রায় ৫ দশমিক ০৩ বিলিয়ন ডলার, যা মোট রফতানির প্রায় ১৯ দশমিক ৫০ শতাংশ।
শিল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, সম্ভাব্য নতুন শুল্ক আরোপ হলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতসহ সামগ্রিক রফতানি খাতে চাপ সৃষ্টি হতে পারে। একই সঙ্গে বিনিয়োগ ও উৎপাদন পরিকল্পনাতেও অনিশ্চয়তা দেখা দিতে পারে।
সরকারের প্রতিক্রিয়া ও ব্যবসায়ীদের অবস্থান
তবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা আপাতত বড় ধরনের উদ্বেগের কারণ দেখছেন না। বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান বলেছেন, বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ হওয়ায় বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার নিয়ম অনুযায়ী নির্দিষ্ট খাতে ভর্তুকি দিতে পারে। দেশের বাণিজ্যনীতি ও আইনকানুনও প্রকাশ্য, তাই তদন্তে সমস্যায় পড়ার আশঙ্কা কম।
অন্যদিকে পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেছেন, তদন্তের তালিকায় বাংলাদেশের নাম থাকা কিছুটা অস্বস্তিকর হলেও এটি বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করবে বলে মনে হয় না। তার মতে, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক মূলত দেশের ভেতরেই উৎপাদিত হয় এবং তা যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় শিল্পের সঙ্গে সরাসরি প্রতিযোগিতা করে না।
তবে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই তদন্ত প্রক্রিয়াকে গুরুত্বের সঙ্গে মোকাবিলা করা জরুরি। প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপনের মাধ্যমে বাংলাদেশের অবস্থান স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে সরকার ও বেসরকারি খাতকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।