সর্বশেষ

সদ্য বিদায়ী গভর্নরের সাধন বিশ্লেষণ

প্রকাশিত: ৮ মার্চ ২০২৬, ২২:২৪
সদ্য বিদায়ী গভর্নরের সাধন বিশ্লেষণ

২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর দেশে মুদ্রাস্ফীতি বাড়তে শুরু করলে সুদের হার বৃদ্ধির মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি কমানো এবং আর্থিক খাত সংস্কারের মাধ্যমে খেলাপি ঋণ সমস্যার সমাধানের পরামর্শ দিতে থাকা অর্থনীতিবিদ ড. আহসান এইচ মনসুরকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের ঠিক পাঁচ দিন পর নিয়োগ দেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহম্মদ ইউনূস। তার এ নিয়োগ যুগান্তকারী। তাকে এ পদে নিয়োগ দিতে আইন পরিবর্তন করতে হয়েছে। গভর্নর পদের বয়সের সীমা বাড়াতে হয়েছে ইউনূস সরকারকে। ৬৭ বছর বয়সের বেশী কোন ব্যক্তি এ পদে নিয়োগযোগ্য নয় বলে ৭২ বছর বয়ষ্ক মনসুর সাহেবকে এ পদে নিয়োগ দিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের আইনটি সংশোধন করতে হয়েছিল। 

 

কেন্দ্রীয় ব্যাংকে ১৮ মাসের কর্মকালে ড. মনসুর যে সকল উদ্যোগ নিয়েছিলেন তার প্রধান দুইটি ছিল মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যাংকিং খাত সংস্কার করে খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি সুদ হার ১০ শতাংশে উন্নীত করে এক বছরের বেশি সময় তা ধরে রেখেও তিনি বাগে আনতে পারেননি মূল্যস্ফীতিকে। খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ করতে খেলাপির সংজ্ঞাই তিনি বদলে দিয়েছেন তবুও কমে না গিয়ে প্রায় তিনগুণ হয়েছে খেলাপি ঋণ। বাজারে অর্থ প্রবাহ কমাতে একদিকে তিনি কঠোর মুদ্রানীতি দিয়েছেন অন্যদিকে টাকা ছাপানোর বিরুদ্ধে সর্বদা সোচ্চার থাকা মনসুর সাহেব ৫২ হাজার কোটি টাকা ছাপিয়ে দিয়ে দিয়েছেন ১২টি দুর্বল ব্যাংককে। 

 

দেশে এখনও যে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে সেটার শুরু ইউক্রেন যুদ্ধে। তখন থেকে শুরু করে মূল্যস্ফীতি আমাদের ঘাড়ে মামদো ভূতের মত চেপে বসে আছে। জানুয়ারি মাসেও তা ছিল ৮.৫৮ শতাংশ। মনসুর সাহেবের সময়ে ২৪ সালের ডিসেম্বরে বেড়েছিল সবচেয়ে বেশি, ১০.৮৯ শতাংশ। ইউক্রেন যুদ্ধের আগের প্রায় এক দশক ধরে বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি ৫ – ৬ শতাংশের মধ্যে থাকত যা আমাদের মত দেশের জন্য স্বাস্থ্যকর। যুদ্ধের ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যমূল্য বেড়ে যায়, জ্বালানী তেলের দাম হয়ে যায় দ্বিগুণেরও বেশি। ফলে আমদানি নির্ভর দেশ হিসেবে আমাদের বাজারে আমদানিকৃত পণ্যের এবং জ্বালানী তেল ও গ্যাসের দাম বাড়ে যার প্রভাবে বাড়ে বিদ্যুতের দাম যা আবার বাড়িয়ে দেয় স্থানীয় উৎপাদন খরচ। এভাবে ইউক্রেন যুদ্ধ আমাদের মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে দেয়। পরবর্তীতে জ্বালানি তেল, ভোজ্য তেল এবং অন্যান্য নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কমে আসলেও আমাদের এখানে মূল্যস্ফীতি কমে না। 

 

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে ২২ সালের শেষার্ধ থেকে অর্থনীতিবিদ, সরকার, অর্থনীতি বিশ্লেষক এবং অন্যান্য লেখকদের মধ্যে ব্যাপক বিতর্ক চলে। ড. আহসান এইচ মনসুর, ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, ড. মুস্তাফিজুর রহমানসহ পরবর্তী সময়ের অন্তর্বর্তী সরকারের দ্বায়িতপ্রাপ্ত এবং সমর্থক অনেকেই তখন সুদের হার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পক্ষে অবস্থান নেন। এই লেখক তখন তাঁর লেখনী এবং টেলিভিশন টকশোতে আলোচনার মাধ্যমে পণ্য সরবরাহ বাড়িয়ে, হুন্ডির দৌরাত্ব কমিয়ে এবং সিণ্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করে মূল্যস্ফীতি কমানোর পরামর্শ দিয়েছিলেন।

 

সরকার প্রথমে সুদের হার বাড়ানো থেকে বিরত থাকলেও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের পরামর্শে ২৪ সালের মে মাসের শুরুতে টাকার বিনিময় হার এবং ব্যাংক ঋণের সুদ হার দুটোই বাজার ভিত্তিক করে দেয়। ড. আহসান এইচ মনসুরসহ সুদের হার বাড়ানোর পক্ষের সকলে বেশ খুশি হয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে মন্তব্য করেন যে ছয় থেকে নয় মাসের মধ্যে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে। অথচ, ফল দেখা যায় উল্টো সে বছরের জুলাই মাসে মূল্যস্ফীতি সাম্প্রতিককালের সর্বোচ্চ ১১.৬৬ শতাংশে উঠে যায়। তারপর ২০ মাস কেটে গেলেও এখন পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণে আসেনি নাছোড়বান্দা মূল্যস্ফীতি। সুদের হার বৃদ্ধির পক্ষে ওকালতি করা অর্থনীতিবিদদের অন্যতম আহসান এইচ মনসুর তখন ব্র্যাক ব্যাংকের চেয়ারম্যান। সুদের হার বাড়ালে মূল্যস্ফীতি না কমলেও ব্যাংকারদের মুনাফা এবং বোনাস যে বাড়বে তাতে সন্দেহ ছিল না কারো। 

 

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের দুই পথ- সুদের হার বাড়িয়ে; এবং বাজারে পণ্য ও সেবার সরবরাহ বাড়িয়ে দেয়া। সুদের হার বাড়ালে উৎপাদন ও সরবরাহ খরচ বাড়ে এবং বিনিয়োগ কমে যায়। ফলে পণ্য ও সেবার দাম বেড়ে যায়, বেড়ে যায় মজুরী বৃদ্ধির চাপ। পণ্যমূল্য বৃদ্ধির ফলে চাহিদা কমে। কমে উৎপাদন। কমে কর্মসংস্থান। এতে অর্থনীতি একটা দাম বাড়ানোর দুষ্টচক্রের মধ্যে পড়ে যায়। বাস্তবে দেখা যায় পণ্যমূল্য যতখানি বাড়ে মজুরী ততখানী বাড়ে না। এ শুধু আমাদের দেশে নয়, ইতিহাস জুড়ে সারা দুনিয়ায় এ ঘটনাই ঘটেছে। এই চক্রের মধ্যে পড়ে সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতা কমে যায়, দরিদ্র হয়ে পড়ে। ড. ইউনূসের সময়ে দারিদ্র্য বেড়ে যাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ এই উচ্চ সুদের ফলে জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাওয়া এবং সে পরিমাণে মজুরী বৃদ্ধি না পাওয়া এবং কর্মসংস্থান কমে যাওয়া। এখানে সুদের হার বাড়িয়ে সাধারণ মানুষকে গরীব করে ফেলা হয়েছে; মুনাফা বেড়েছে ব্যাংকারদের। দ্বিতীয় পদ্ধতিতে, বাজারে সরবরাহ বাড়িয়ে, হুন্ডির দৌরাত্ব কমিয়ে এবং সিণ্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করে পণ্যমূল্য কমিয়ে ফেলা যায়। এভাবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা হলে তা মানুষকে গরীব করে না বরং দেশকে আরও বেশি উৎপাদনশীল করে তোলে, কর্মসংস্থান বেড়ে যায়। যেসকল অর্থনীতিবিদেরা ২০২২ এবং ২০২৩ সালে সুদের হার বাড়ানোর পক্ষে কথা বলেছেন তাদের অনেকেই এখন সে হার কমানোর জন্য কথা বলছেন। ব্যবসায়ীরাও বলছেন সুদের হার কমাতে। 

 

আহসান এইচ মনসুর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শীর্ষ পদে থেকেও সুদের হার কমাননি বরং বাড়িয়েছেন এবং পরিস্থিতি আরও খারাপ করেছেন ৫২ হাজার কোটি ছাপিয়ে তা বাজারে ছেড়ে। তিনি ২০২৫ সালের জুন মাসে বলেছিলেন যে ঐ বছরের সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যে মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশের নিচে নেমে আসবে; একই বছরের ডিসেম্বরে বলেছিলেন, ২০২৬ সালের জুন মাসের মধ্যে তা ৫ শতাংশের নিচে নামবে। তিনি দায়িত্ব ছাড়ার ঠিক আগের মাসে অর্থাৎ ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে মূল্যস্ফীতি ছিল নয় শতাংশের কাছাকাছি। জুন নাগাদ তা ৫ শতাংশে নামবে এমন কোন লক্ষণ এই লেখার সময় পর্যন্ত নেই। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ছিল তার প্রধান দায়িত্ব, তিনি সে দায়িত্ব পালনে তিনি ব্যর্থ হয়েছেন। 

 

ড. আহসান এইচ মনসুর ২৫ সালের মে মাসে বৈদেশিক মুদ্রার লেনদেন পুরোপুরি বাজার ভিত্তিক করে দেন। এর আগে ২৪ সালের মে মাসে এ লেনদেন ক্রলিং পেগ পদ্ধতিতে বাজার ভিত্তিক করা হয়েছিল। আহসান মনসুর তা তাত্ত্বিক ভাবে পুরোপুরি বাজার ভিত্তিক করলেও টাকার মান ধরে রাখতে বাজার থেকে বড় বড় অংকের ডলার কেনার কারণে বাজারকে প্রতিযোগিতামূলক থাকতে দেননি। ফলে বৈদেশিক মুদ্রার লেনদেন বাজার ভিত্তিক হয়নি। তিনি দায়িত্ব গ্রহণের আগেও বাংলাদেশ ব্যাংক বাজার থেকে ডলার কিনে কিংবা সরবরাহ করে ডলারের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখত তিনিও তাই করেছেন। তার বাজার ভিত্তিক বৈদেশিক মুদ্রার দর নির্ধারন পদ্ধতি কাজ করেনি। তিনি ব্যর্থ হয়েছেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকে তার যোগদানের আগের দিন আন্তঃব্যাংক লেনদেনে ডলারের দাম ছিল ১১৮ টাকা আর তার বিদায়ের দিনে ডলার কেনাবেচা হয়েছে ১২২.৩ টাকায়। তার সময়কালে টাকার দাম কমেছে ৪.৩ টাকা বা ৩.৬ শতাংশ। মাত্র ১৮ মাসে ৩.৬ শতাংশ মূল্য হারানো স্বাভাবিক কোন ঘটনা নয়, বড় পরাজয়। 

 

জনাব মনসুরের ব্যাংকিং খাত শাসনামলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক খেলাপি ঋণের সংজ্ঞা বদলে দেয় তাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে যায়। তবে তার পরিমাণ কত সে বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কোন ধারণা দেয়নি। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসের শেষে খেলাপি ঋণ বেড়ে হয় মোট ঋণের ৩৫.৭৩ শতাংশ যা ২০২৪ সালের জুন শেষে ছিল মাত্র ১২.৫৭ শতাংশ। অর্থাৎ তার আমলে খেলাপি ঋণ বেড়েছে তিন গুণের বেশি। পরিস্থিতি বেগতিক বুঝে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসেই তিনি মাত্র ১-২% ঋণ পরিশোধের মাধ্যমে ১৫ বছরের জন্য পুনঃতফশিল করার সুযোগ করে দেন। 

 

নির্বাচনের আগে নিজেকে ঋণ খেলাপির তকমা মুক্ত করার জন্য এবং ঋণ পুনঃতফশিল করার সুবিধা নেবার জন্য ৩০০ কোম্পানি ২ লক্ষ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ পুনঃতফশিল করার আবেদন করে যার মধ্যে ৮৭ হাজার কোটি টাকার বেশি অনুমোদন পেয়ে ডিসেম্বর মাস শেষে খেলাপি ঋণ কিছুটা কমে ৩১ শতাংশে এসে দাঁড়ায়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্ব গ্রহণের আগে এবং পরে ব্যাংকিং খাত সংস্কার করে খেলাপি ঋণের একটা হেস্তনেস্ত করবেন বলে তিনি অনেক বাগাড়ম্বর করেছেন। কাজের বেলায় তিনি তার পূর্ববর্তীদের মতোই ঋণ পুনঃতফশিল করার পথে হেঁটেছেন। কাজের কাজ কিছুই হয়নি। খেলাপি ঋণ যে তিমিরে ছিল সে তিমিরেই রয়ে গেছে। 

 

ব্যাংকগুলো তাদের গ্রাহকদের ঋণ দিয়ে থাকে যার মধ্যে থাকে ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ। এই ঝুঁকিপূর্ণ ঋণের বিপরীতে ব্যাংকগুলোকে ১২.৫ শতাংশ মূলধন রাখতে হয়। সংবাদ মাধ্যমে সব সময়েই এই মূলধন ঘাটতির খবর পাওয়া যায়। ২০২৪ সালের জুন মাস শেষে এই মূলধন ঘাটতির পরিমাণ ছিল ৩১ হাজার ৫৪৯ কোটি টাকা যা ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর শেষে ৩ লক্ষ ৪৪ হাজার ২৩১ কোটি টাকায় উঠে যায়। ড. মনসুরের সময়কালে ব্যাংকিং খাতের মূলধন ঘাটতি বেড়ে যায় প্রায় ১১ গুণ। সে বছরের ডিসেম্বর মাস শেষে জাতীয় নির্বাচন এবং ঋণ পুনঃতফশিল করার সুবিধা গ্রহণের ফলে খেলাপি ঋণ কমে যাওয়ায় মূলধন ঘাটতি কমে আসে ১ লক্ষ ৯১ হাজার কোটি টাকায়। এ ক্ষেত্রেও চরম ভাবে ব্যর্থ হয়েছেন ইউনূস সরকারের প্রধান ব্যাংকার। 

 

বেসরকারি বিনিয়োগ একটা দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকা শক্তি। জনাব মনসুরের সময়কালে ব্যাংকিং খাতে সুশাসন আনতে না পারার আরেকটি ব্যর্থতা চিহ্নিত হয়েছে এ ক্ষেত্রে। ২০২৪ সালের জুলাই পর্যন্ত সে বছরের মাসিক বেসরকারি বিনিয়োগের গড় প্রবৃদ্ধি ছিল ১০.০৯ শতাংশ যা ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের শেষে এসে দাঁড়িয়েছে ৬.১ শতাংশে। 

 

নতুন যুগের ব্যাংকিং সুবিধার চাহিদা মেটাতে ডিজিটাল ব্যাংক তৈরি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল আওয়ামী লীগ সরকার। সে অনুযায়ী বাংলাদেশ ব্যাংক আবেদনপত্র গ্রহণ এবং তা যাচাই-বাছাই করার কাজও এগিয়ে গিয়েছিল অনেক দূর। হঠাৎ করে সরকার পরিবর্তনের কারণে সে কাজ শেষ পর্যায়ে এনেও তা শেষ করে যেতে পারেনি তৎকালীন কেন্দ্রীয় ব্যাংক। আহসান মনসুর সাহেব দায়িত্ব গ্রহণের পর ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স দেবার কাজ আবার শুরু করেন। তার সঙ্গে এক আবেদনকারী, বিকাশ যুক্ত থাকায় সম্ভাব্য স্বার্থ সংঘাতের কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের চাপে তিনি ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স দিয়ে যেতে পারেননি। শত চেষ্টা করেও তিনি এ ক্ষেত্রেও ব্যর্থ হয়েছেন। 

 

আহসান এইচ মনসুরের আরেক উদ্যোগ নতুন নকশার টাকা ছাপানো। বঙ্গবন্ধুর ছবি বাদ দিয়ে নতুন কিছু ডিজাইনে তিনি টাকা ছাপিয়েছেন। তবে সে নোট সহসা চোখে পড়ে না। দুই-একটা যা পাওয়া যায় সেগুলোর মান এত খারাপ যে তা কেউ নিতে চায় না। নোট গুলো দেখে মনে হয়, এগুলো অনেককাল আগের - মলিন ও জীর্ণ। ড. মনসুরের এ উদ্যোগও ব্যর্থ হয়েছে। 

 

পাঁচটি দুর্বল ব্যাংককে একত্রিত করে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে একটি নতুন ব্যাংক গঠন করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন গভর্নর আহসান এইচ মনসুর। প্রাথমিক পরিকল্পনা ছিল মাত্র দেড় মাসের মধ্যে তিনি এই মার্জার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করবেন। সরকারের কাছ থেকে ২০ হাজার কোটি টাকা নিয়ে এবং অন্যান্য অপ্রকাশিত সূত্র থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকা নিয়ে তিনি এই নতুন ব্যাংক গঠন করতে চেয়েছিলনে। সে বছরের ডিসেম্বর মাসে তিনি গণমাধ্যমে জানান যে আরও কিছু সমস্যা রয়েছে তা সমাধান করতে আরও ৩৫ হাজার কোটি অর্থাৎ মোট ৭০ হাজার কোটি টাকা লাগবে। তিনি একবার বলেছিলেন যে এই পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় বিদ্যমান শেয়ারহোল্ডারগণ কিছুই পাবেন না, নভেম্বর মাসে এসে আবার বলেছেন যে সরকার তাদের ক্ষতিপূরণের বিষয়ে বিবেচনা করতে পারে। পুনঃর্গঠন প্রক্রিয়ায় অবশ্যই আমানতকারীরা সর্বাগ্রে তাদের টাকা ফেরত পাবেন। তারপর কিছু অবশিষ্ট থাকলে তার দাবীদার শেয়ারহোল্ডারেরা। তিনি কার ব্যাংক একীভূত করছিলেন? ব্যাংকগুলো একীভূত হলে কী উপকার হবে, কাদের কাছ থেকে তিনি টাকা নেবেন, সরকারই বা কেন টাকা দেবে এসব প্রশ্নের কোন উত্তর না দিয়েই তিনি রাষ্ট্রের ২০ হাজার কোটি টাকা খরচ করার পরিকল্পনা করে ফেলেছিলেন। তার এ উদ্যোগও সফল হয়নি। ৫ ব্যাংক একীভূত করে যেতে পারেননি। তিনি এখানেও ব্যর্থ হয়েছেন। 

 

কেন্দ্রীয় ব্যাংকে রিজার্ভ বেড়েছে বলে ব্যাপক প্রচারণা চালিয়েছে ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার। সে কৃতিত্ব কিছুটা হলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকেরও। রিজার্ভ বাড়া-কমার ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভূমিকা সরাসরি না হলেও রক্ষণাবেক্ষণ এবং বৈদেশিক মুদ্রায় ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সরকারকে পরামর্শ দিয়ে থাকে বলে কিছুটা কৃতিত্ব তাদেরও। প্রবাস আয় বিগত ১৮ মাসে যথেষ্ট বেড়েছে, কমেছে রফতানি, সামান্য বেড়েছে আমদানি। ২০২৪ সালের জুলাই মাস শেষে রিজার্ভ ছিল ২৫.৮ বিলিয়ন ডলার যা ২০২৬ সালের জানুয়ারি শেষে হয়েছে ৩৩.২ বিলিয়ন ডলার। ড. মনসুরের সময়ে রিজার্ভ বেড়েছে ৭.৪ বিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে একই সময়ে বিদেশি ঋণ বেড়েছে ৮.৪৬ বিলিয়ন ডলার (৩০ জুন ২০২৫ তারিখে বাংলাদেশের মোট সরকারি বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ৭৭.২৭৯ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা এক বছর আগে ৬৮.৮২২ বিলিয়ন ডলার ছিল)। ইউনূস সরকার যে রিজার্ভ বাড়ানোর বড়াই করেছে তা মূলত এসেছে বৈদেশিক ঋণ থেকে। বস্তুত এ সময়ে যে বাড়তি রিজার্ভ এসেছে তা খেয়ে ফেলেছে বাড়তি আমদানি, কম রফতানি এবং বাড়তি বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ। এ ক্ষেত্রেও সাফল্য নেই ড. মনসুরের। 

 

রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ মুক্ত করে বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতা বৃদ্ধি করার চেষ্টা করেছিলেন ড. আহসান এইচ মনসুর। এ লক্ষ্যে তিনি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বোর্ড পুনর্গঠন, নেতৃত্বের কর্তৃত্ব বৃদ্ধি এবং শীর্ষ কর্মকর্তাদের নিয়োগ ও অপসারণ পদ্ধতি সংশোধন করে আর্থিক নীতিকে রাজনৈতিক প্রভাব থেকে রক্ষা করার জন্য চেষ্টা করেছিলেন। তার সে চেষ্টা সফল করতে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রাক্তন গভর্নর এবং তৎকালীন ইউনূস সরকারের অর্থ উপদেষ্টা সালেহ উদ্দিন আহমেদ এবং তার মন্ত্রণালয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা – কথাটা শুনতে বেশ ভাল লাগে। সেটা হওয়াও দরকার। তবে বাস্তবতা হচ্ছে আমেরিকার মত শক্তিশালী গণতন্ত্রের দেশেও এখনো এ স্বাধীনতা নিশ্চিত করা যায়নি। সে দেশের বর্তমান ফেডারেল রিজার্ভ চেয়ারম্যান অনবরত ট্রাম্প প্রশাসনের কাছ থেকে মামলার হুমকি শুনছেন। আসলে স্বাধীন হতে হলে যোগ্য হতে হয়। আমাদের সমাজ বিশেষ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কি যথেষ্ট যোগ্য হয়েছে? আমাদের রাজনীতি এবং প্রশাসন কি যথেষ্ট পরিপক্ক? এসব প্রশ্নের ইতিবাচক উত্তর পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না। এ কারণেই হয়ত প্রাক্তন কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রধানের নেতৃত্বাধীন অর্থ মন্ত্রণালয় জনাব মনসুরের সঙ্গে একমত হতে পারেননি। ব্যাংকিং খাত সংস্কার করতেও তিনি ব্যর্থ হয়েছেন। 

 

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের মূল কাজ হলো একটি দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও ব্যাংকিং ব্যবস্থার সুশৃঙ্খলা রক্ষা করা। এ কথাটিকে ভাঙলে দেখা যায় যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান কাজ হছে- মুদ্রা প্রচলন ও নিয়ন্ত্রণ, মুদ্রানীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংরক্ষণ, ব্যাংকিং ব্যবস্থার তদারকি ও নিয়ন্ত্রণ, ঋণ নিয়ন্ত্রণ, ইত্যাদি। মুদ্রানীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রেও উদ্ভাবনী কিছু দেখাতে পারেননি আহসান এইচ মনসুর। তার সময়ে দেয়া বাংলাদেশ ব্যাংকের সব কয়টি মুদ্রানীতি আগের গুলোর ধারাবাহিকতা মাত্র। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের দ্বায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তিনি অনেক উদ্যোগই নিয়েছেন তবে তার কোনটিতেই সফল হননি সারাজীবন ধরে বিভিন্ন দেশের অর্থনীতি নিয়ে কাজ করা আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের এই সাবেক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা।

 

৭ মার্চ ২০২৬

কলাবাগান, ঢাকা।

লেখকঃ অর্থনীতি বিশ্লেষক

সব খবর

আরও পড়ুন

ব্রয়লার মুরগির দাম কেজি ২০০ টাকা ছাড়াল

এক সপ্তাহে বেড়েছে ৫০-৬০ টাকা ব্রয়লার মুরগির দাম কেজি ২০০ টাকা ছাড়াল

গ্যাস সংকটে ১৫ দিনের জন্য বন্ধ চার রাষ্ট্রায়ত্ত ইউরিয়া সার কারখানা

কৃষিখাতে বিপর্যয়ের শঙ্কা গ্যাস সংকটে ১৫ দিনের জন্য বন্ধ চার রাষ্ট্রায়ত্ত ইউরিয়া সার কারখানা

জিডিপির প্রবৃদ্ধি পাঁচ বছরে সর্বনিম্ন

অর্থবছর ২০২৪-২৫ জিডিপির প্রবৃদ্ধি পাঁচ বছরে সর্বনিম্ন

নতুন গভর্নরের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ জানালো টিআইবি

নতুন গভর্নরের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ জানালো টিআইবি

৬৫ উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় বেড়েছে ৭৯ হাজার ৮৩৪ কোটি টাকা

ইউনূস সরকারের ‘অপচয়ী’ পুনর্মূল্যায়ন ৬৫ উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় বেড়েছে ৭৯ হাজার ৮৩৪ কোটি টাকা

জুলাই-পরবর্তী সময়ে চাঁদাবাজি বেড়েছে ২০–৫০ শতাংশ: ডিসিসিআই

আর্থিক খাত নিয়ে গভীর উদ্বেগ জুলাই-পরবর্তী সময়ে চাঁদাবাজি বেড়েছে ২০–৫০ শতাংশ: ডিসিসিআই

আগের ঋণের চাপ কীভাবে সামাল দেবে বিএনপি সরকার?

আগের ঋণের চাপ কীভাবে সামাল দেবে বিএনপি সরকার?

রমজানে নিত্যপণ্যের দামের চাপে পিষ্ট সাধারণ মানুষ

ইফতার থেকে কাঁচাবাজার আগুন সর্বত্র রমজানে নিত্যপণ্যের দামের চাপে পিষ্ট সাধারণ মানুষ