সর্বশেষ

পাঁচ ব্যাংক একীভূত করার খবর, শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকের প্রতি আস্থা নেই গ্রাহকের!

প্রকাশিত: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ১১:৪৫
পাঁচ ব্যাংক একীভূত করার খবর, শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকের প্রতি আস্থা নেই গ্রাহকের!
পাঁচ ব্যাংক একীভূত করার খবর

বেশ কিছুদিন থেকেই শরিয়াহভিত্তিক পাঁচ ইসলামী ব্যাংক একীভূত করার খবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে। এই পাঁচটি ব্যাংক বেশ সমস্যাগ্রস্ত। এরই মধ্যে ১৭ সেপ্টেম্বর, বুধবার খবর এলো--- সমস্যাগ্রস্ত শরিয়াহভিত্তিক বেসরকারি পাঁচটি ব্যাংককে একীভূত করার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। খুব শীঘ্রই এসব ব্যাংকে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হবে।

 

তবে এই প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার আগেই গ্রাহকদের মধ্যে আতঙ্ক ও হতাশা চরমে পৌঁছেছে। জমানো টাকা তুলতে না পেরে শাখায় শাখায় প্রতিদিন দেখা যাচ্ছে গ্রাহকের কান্না, ক্ষোভ আর অপেক্ষার দীর্ঘশ্বাস। হতাশাগ্রস্ত গ্রাহকেরা ইতিমধ্যেই আস্থা হারিয়েছেন শরিয়াহভিত্তিক ইসলামী ব্যাংকগুলোর উপর। অনেক গ্রাহক এই পাঁচ ব্যাংকে টাকা জমা রেখে প্রায় সর্বস্ব হারাতে বসেছেন। ব্যাংকের কর্মকর্তা - কর্মচারীরাও পাচ্ছেন না নির্দিষ্ট বেতন। কিন্তু এসব ব্যাপারে নেই সরকারের কোন পদক্ষেপ।

 

ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, ঢাকার দিলকুশা শাখার গ্রাহক আমিনুর রহমান। তিনি জানালেন, আগে প্রতিদিন অল্প অল্প টাকা দিলেও এখন একেবারেই বন্ধ হয়ে গেছে। সর্বোচ্চ তিন হাজার টাকা দিয়ে গ্রাহককে বিদায় করা হচ্ছে।

 

তিনি বলেন, ‘আমি নিজের টাকাই তুলতে পারছি না, এই কষ্ট কাকে বলব?’ তাঁর কণ্ঠে ক্ষোভ আর হতাশা। তিনি বলেন, ‘লাখ টাকার জায়গায় মাত্র তিন হাজার টাকা দিয়ে আমি কী করব? আমার প্রয়োজন মিটবে না।’

 

সেই একই চিত্র ইউনিয়ন ব্যাংকের হাটখোলা শাখায়। শাখা ব্যবস্থাপক অনুপস্থিত। তবে অন্য এক কর্মকর্তা জানান, বাংলাদেশ ব্যাংকের সহায়তা বন্ধ থাকায় এক মাস ধরে গ্রাহকদের এক টাকাও ফেরত দেওয়া যাচ্ছে না। প্রতিদিন ২০ থেকে ৩০ জন গ্রাহক এসে খালি হাতে ফিরছেন। কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও মাসের শেষে নিজেদের বেতন তুলতে পারছেন না।

 

গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের মতিঝিল শাখার এক কর্মকর্তা জানান, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের সহায়তা বন্ধ হওয়ার পর আমরা একেবারেই ফেঁসে গেছি। গ্রাহকরা প্রতিদিন লাইনে দাঁড়িয়ে অপমান-গালি দিয়ে যাচ্ছেন।’

 

এ চিত্র শুধু ঢাকা নয়, সারা দেশেই। অবস্থা এতটাই নাজুক যে স্কুল শিক্ষক আবদুল কাদের ১৮ বার ইউনিয়ন ব্যাংকে গিয়ে নিজের এক লাখ ২৭ হাজার টাকা থেকে এক হাজার টাকাও তুলতে পারেননি। সাদ্দাম হোসেন ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকে দীর্ঘদিন ধরে টাকার জন্য ঘুরলেও একটি টাকাও পাননি।

 

গ্রাহকদের ভোগান্তি যেন এখন মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নিয়েছে। চিকিৎসা খরচ, সন্তানের স্কুলের বেতন কিংবা ব্যবসার জরুরি প্রয়োজনে জমা টাকা তুলতে না পেরে অনেকে ধারদেনায় ডুবে যাচ্ছেন। কিছু শাখায় বাগবিতণ্ডা এমনকি হাতাহাতির ঘটনাও ঘটছে।

 

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অসহযোহিতা, অনিয়ম ও দুর্বল ব্যবস্থাপনার খেসারত দিচ্ছেন সাধারণ গ্রাহকরা। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এরই মধ্যে ১৪টি পর্ষদ বিলুপ্ত করে, প্রায় ৫২ হাজার কোটি টাকা নতুন ছাপিয়ে তারল্য সহায়তা দিয়েছিল। কিন্তু তা দিয়ে সংকট কাটেনি। বরং বড় অঙ্কের আমানতকারীরা এখনও এক টাকাও ফেরত পাচ্ছেন না।

 

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুসারে, একীভূত হতে যাওয়া পাঁচ ব্যাংকের মোট আমানত ১ লাখ ৪৭ হাজার ৩৬৮ কোটি টাকা এবং ঋণ এক লাখ ৯০ হাজার ৪৮৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণ এক লাখ ৪৬ হাজার ৯১৮ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণ করা ঋণের ৭৭ শতাংশ। মূলধনে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৪৫ হাজার ২০৩ কোটি টাকা। গ্রাহক সংখ্যা ৯২ লাখ এবং কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন ১৫ হাজারের বেশি।

 

এই চরম হতাশার মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান শুনিয়েছেন আশার বাণী। তিনি বলেন, আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। গ্রাহকদের টাকার সর্বোচ্চ সুরক্ষা দিতেই কাজ করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। মার্জার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কোনো ব্যাংকই কিন্তু বন্ধ হচ্ছে না। যেহেতু সাময়িকভাবে এই ব্যাংকগুলোর মালিকানা রাষ্ট্রের কাছে চলে আসবে, রাষ্ট্রই তাদের আমানতের সুরক্ষা প্রদান করছে। তাই আমানতকারীদের হতাশ হওয়ার কিছুই নেই।

 

অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ মন্তব্য করেছেন, ‘ব্যাংক খাতের ৮০ শতাংশ অর্থ লুট হয়ে গেছে। এ খাত পুনর্গঠনে প্রয়োজন ৩৫ বিলিয়ন ডলার।’

 

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, প্রতি প্রান্তিকেই রেমিট্যান্স প্রবাহ এবং রিজার্ভ বৃদ্ধির প্রতিবেদন প্রকাশ করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। যদি এতোই অর্থনীতির উন্নতি সাধিত হচ্ছে, তাহলে এই সাধারণ মানুষের ক্ষুদ্র আমানত ফেরত দিতে কেন ব্যবস্থা নিচ্ছে না কেন্দ্রীয় ব্যাংক? আসলে বাস্তবতাটা কোনে দিকে যাচ্ছে সেটিই এখন দেখার বিষয়।

সব খবর

আরও পড়ুন

জাতিসংঘের মূল্যায়নে দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি বাংলাদেশে

প্রবৃদ্ধি পূর্বাভাস কমাল বিশ্বব্যাংক জাতিসংঘের মূল্যায়নে দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি বাংলাদেশে

ভারত বয়কটের ডাক দিয়ে ভারত থেকে আমদানি বেড়েছে সবচেয়ে বেশি

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রথম অর্থবছর (২০২৪-২৫) ভারত বয়কটের ডাক দিয়ে ভারত থেকে আমদানি বেড়েছে সবচেয়ে বেশি

রপ্তানি কমতে কমতে ঋণাত্মক ধারায় চলছে দেশের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি

অর্থবছরের প্রথমার্ধ শেষ রপ্তানি কমতে কমতে ঋণাত্মক ধারায় চলছে দেশের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি

‘ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক অধ্যাদেশ’ নিয়ে এনজিও খাতের উদ্বেগ

‘ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক অধ্যাদেশ’ নিয়ে এনজিও খাতের উদ্বেগ

ডিসেম্বর মাসে মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়ালো ৮.৪৯ শতাংশ

খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধিই প্রধান অনুঘটক ডিসেম্বর মাসে মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়ালো ৮.৪৯ শতাংশ

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে লেনদেন শুরু

টাকা তুলতে চরম ভোগান্তি সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে লেনদেন শুরু

১২০০ টাকার এলপিজির জন্য গুণতে হচ্ছে ২০০০ টাকা

সরকারের উদাসীনতায় ভোক্তার নাভিশ্বাস ১২০০ টাকার এলপিজির জন্য গুণতে হচ্ছে ২০০০ টাকা

অর্থনীতির শুভ বছর আসবে কবে?

অর্থনীতির শুভ বছর আসবে কবে?