রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংক ব্যাপক অনিয়ম, আর্থিক জালিয়াতি ও প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলার কারণে নতুন করে আলোচনায় এসেছে। সম্প্রতি ব্যাংকটির নীলফামারীর সৈয়দপুর শাখায় প্রায় ৬৬ কোটি টাকা আত্মসাৎ ও পাচারের ঘটনা উদ্ঘাটিত হয়েছে, যা ব্যাংকের ইতিহাসে অন্যতম বড় কেলেঙ্কারি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। অভ্যন্তরীণ বিশেষ নিরীক্ষা ও তদন্ত প্রতিবেদনে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পিত জালিয়াতির চিত্র উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, জাল ভাউচার, আরটিজিএস, ইএফটি, চেক ক্লিয়ারিং এবং কৃত্রিম লেজার এন্ট্রির মাধ্যমে ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ধাপে ধাপে অর্থ সরানো হয়। সৈয়দপুর শাখার সিনিয়র অফিসার মো. আলিমুল আল রাজি তমাল ও রংপুর সার্কেলের তৎকালীন জিএম স্বপন কুমার ধরকে মূলহোতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। মোট ১৩ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ মিলেছে।
তদন্তে দেখা যায়, অভিযুক্ত কর্মকর্তা বিভিন্ন সহকর্মীর আইডি-পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে ১৩২ কোটির বেশি টাকার কাল্পনিক ডেবিট-ক্রেডিট এন্ট্রি তৈরি করেন। এর মধ্যে প্রায় ৪২ কোটি ৮৫ লাখ টাকা হিসাববহির্ভূত অবস্থায় থেকে যায়। বর্তমানে প্রধান অভিযুক্ত তমাল পলাতক।
প্রতিবেদনে তদারকির ঘাটতি, দৈনিক রিকনসিলিয়েশন না করা এবং কোর ব্যাংকিং সফটওয়্যারে নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতাকে বড় কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আঞ্চলিক ও প্রধান কার্যালয়ের নজরদারির ব্যর্থতাও তুলে ধরা হয়েছে।
এদিকে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আনোয়ারুল ইসলামের বিরুদ্ধে পছন্দের কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বদলি ও পদায়নের অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, তার ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তারাই বিতর্কিত লেনদেনের সঙ্গে জড়িত। তবে এমডি অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নির্দিষ্ট অঙ্ক বা দায় নির্ধারণ করা যাবে না এবং কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।
অন্যদিকে, চেয়ারম্যান নিয়োগেও নীতিমালা লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে। জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী বর্তমান চেয়ারম্যান সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদের বয়স ৭৫ বছরের বেশি, যা নির্ধারিত বয়সসীমার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। তিনি বলেন, সরকারই তাকে দায়িত্ব দিয়েছে।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, এত বড় অঙ্কের দুর্নীতি দীর্ঘদিন অগোচরে থাকা ব্যবস্থাপনাগত ব্যর্থতার প্রমাণ। স্বচ্ছ তদন্ত ও দায় নির্ধারণ ছাড়া ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফিরবে না।
বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে এমন অনিয়ম কেবল আর্থিক ক্ষতিই নয়, জনগণের আস্থাকেও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।