সর্বশেষ

নতুন ঋণের গতি থামছে না

ইউনূস সরকারের শেষ ১৫ মাসেই ঋণ বেড়েছে ২.৬০ লাখ কোটি টাকা

প্রকাশিত: ৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৯:৩০
ইউনূস সরকারের শেষ ১৫ মাসেই ঋণ বেড়েছে ২.৬০ লাখ কোটি টাকা

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রায় ১৫ মাসে দেশি-বিদেশি মিলিয়ে সরকারের মোট ঋণ বেড়েছে ২ লাখ ৬০ হাজার ২৫৭ কোটি টাকা। বাজেট বাস্তবায়ন, ঘাটতি মেটানো এবং বৈদেশিক মুদ্রার চাপে ধারাবাহিক ঋণগ্রহণের ফলে এই ঋণভার দ্রুত বেড়েছে বলে জানিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ। সম্প্রতি চূড়ান্ত করা পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ঋণ পরিশোধ চললেও নতুন ঋণের গতি থামছে না।

 

অর্থ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষে (জুন ২০২৫) সরকারের মোট পুঞ্জিভূত ঋণ ছিল ২১ লাখ ৪৪ হাজার ৩৪ কোটি টাকা। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিক শেষে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২১ লাখ ৪৯ হাজার ৪৪ কোটি টাকায়। অর্থাৎ মাত্র তিন মাসেই ঋণ বেড়েছে ৫ হাজার ১০ কোটি টাকা।

 

মোট ঋণের ৫৬ শতাংশ অভ্যন্তরীণ এবং ৪৪ শতাংশ বৈদেশিক। অভ্যন্তরীণ ঋণের বড় অংশই ব্যাংক খাত থেকে নেওয়া। জুন শেষে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণের পরিমাণ ছিল ৭ লাখ ৭৪ হাজার ৯০৯ কোটি টাকা, যা সেপ্টেম্বর শেষে বেড়ে হয়েছে ৭ লাখ ৭৭ হাজার ৭২৯ কোটি টাকা। তিন মাসে বৃদ্ধি ২ হাজার ৮২০ কোটি টাকা। ট্রেজারি বন্ড, ট্রেজারি বিল, বাংলাদেশ ব্যাংক ও ‘সুকুক’—এসব উৎস থেকে এই ঋণ নেওয়া হয়েছে।

 

অন্যদিকে ব্যাংক-বহির্ভূত ঋণ সামান্য কমলেও সঞ্চয়পত্রে ঋণ বেড়েছে। জুলাই-সেপ্টেম্বরে সঞ্চয়পত্রে সরকারের দায় বেড়েছে ১ হাজার ৯৪৫ কোটি টাকা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উচ্চ সুদে সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ নেওয়া সরকারের ভবিষ্যৎ সুদ ব্যয় আরও বাড়াবে।

 

সবচেয়ে বড় উদ্বেগ তৈরি করেছে বৈদেশিক ঋণ। অর্থ বিভাগের হিসাবে সেপ্টেম্বর শেষে বৈদেশিক ঋণ ৯ লাখ ৫১ হাজার ৮৬৯ কোটি টাকা। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে এ পরিমাণ প্রায় ১১ লাখ ২৯ হাজার ২০ কোটি টাকা—দুই প্রতিষ্ঠানের হিসাবে পার্থক্য প্রায় ১ লাখ ৭৭ হাজার কোটি টাকা। এ অমিল ঋণের প্রকৃত চিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।

 

কোভিড-পরবর্তী সময় থেকে বৈদেশিক ঋণ দ্রুত বেড়েছে। মাত্র তিন বছরে বিদেশি ঋণ প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে বলে সরকারি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২১-২২ থেকে ২০২৪-২৫ পর্যন্ত প্রায় ৯.৮২ বিলিয়ন ডলার বাজেট সহায়তা ঋণ নিয়েছে সরকার, যার বড় অংশ সরাসরি বাজেট ঘাটতি পূরণে ব্যয় হয়েছে। প্রকল্প ঋণের পরিবর্তে দ্রুত ছাড়যোগ্য বাজেট সহায়তা ঋণের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে।

 

টাকার অবমূল্যায়নও ঋণের বোঝা বাড়িয়েছে। কয়েক বছর আগে যেখানে প্রতি ডলার ছিল ৮৫ টাকা, এখন তা ১২২ টাকার কাছাকাছি। ফলে একই ডলার ঋণের বিপরীতে টাকায় দায় অনেক বেশি হচ্ছে।

 

ঋণ বৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে সুদ পরিশোধের চাপও। চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে সুদ বাবদ ব্যয় ২৭ শতাংশ বেড়ে ৩১ হাজার ৬২৯ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। বিদেশি ঋণের সুদ পরিশোধ বেড়েছে ৮০ শতাংশ—যা আর্থিক ঝুঁকির বড় ইঙ্গিত বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

 

অর্থ বিভাগ বলছে, ঋণ-জিডিপি অনুপাত এখনো ঝুঁকিসীমার নিচে থাকলেও তা ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলোর ঋণের বিপরীতে সরকারের সার্বভৌম গ্যারান্টি রয়েছে ১ লাখ ১১ হাজার ৪৩১ কোটি টাকা, যা ভবিষ্যতে অতিরিক্ত দায় সৃষ্টি করতে পারে।

 

বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজস্ব আদায় বাড়ানো, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে দক্ষতা না বাড়ালে ঋণনির্ভর বাজেট কাঠামো দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিকে চাপে ফেলতে পারে।

সব খবর

আরও পড়ুন

ভারতের মার্কিন শুল্ক কমায় চাপে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি

ভারতের মার্কিন শুল্ক কমায় চাপে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি

শ্রমিকদের অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতিতে অচল চট্টগ্রাম বন্দর

বিদেশিদের কাছে বন্দর ইজারা শ্রমিকদের অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতিতে অচল চট্টগ্রাম বন্দর

নির্বাচনের আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইউনূস সরকারের ‘গোপন’ শুল্ক চুক্তি

স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ নির্বাচনের আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইউনূস সরকারের ‘গোপন’ শুল্ক চুক্তি

বিদেশিদের কাছে ইজারা দেওয়ার প্রতিবাদে চট্টগ্রাম বন্দরে ২৪ ঘণ্টার কর্মবিরতি

অচল আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম বিদেশিদের কাছে ইজারা দেওয়ার প্রতিবাদে চট্টগ্রাম বন্দরে ২৪ ঘণ্টার কর্মবিরতি

কমতে কমতে তলানিতে বিদেশি বিনিয়োগ

ক্ষতবিক্ষত বেসরকারি খাত কমতে কমতে তলানিতে বিদেশি বিনিয়োগ

বেতন বৃদ্ধির বাস্তবতা: কার স্বস্তি, কার চাপ

বেতন বৃদ্ধির বাস্তবতা: কার স্বস্তি, কার চাপ

দোসর খোঁজার নামে বিপর্যস্ত বেসরকারি খাত

বিনিয়োগে ইতিহাস সর্বোচ্চ মন্দা দোসর খোঁজার নামে বিপর্যস্ত বেসরকারি খাত

ব্যয়সাশ্রয়ী নীতির ঘোষণা দিয়ে উল্টো পথে অন্তর্বর্তী সরকার

ব্যয়সাশ্রয়ী নীতির ঘোষণা দিয়ে উল্টো পথে অন্তর্বর্তী সরকার