চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি) একের পর এক শিক্ষক হেনস্তার ঘটনায় ক্যাম্পাসে গভীর উদ্বেগ ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। ‘সাধারণ শিক্ষার্থী’ ব্যানারে সংঘটিত এসব ঘটনায় জড়িতদের বড় একটি অংশের সঙ্গে ছাত্রশিবিরের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে। অভিযোগের তীর শুধু অভিযুক্তদের দিকেই নয়, ঘটনার পরও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় প্রশ্নের মুখে পড়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
২০২৫ সালের ৪ জুলাই উপাচার্যের কক্ষে ঢুকে তাঁকে শাসানোর ঘটনায় বিষয়টি সর্বাধিক আলোচনায় আসে। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, সেদিন উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতারের উদ্দেশে বলা হয়, “আপনি নিজ যোগ্যতায় বসেননি, আপনাকে আমরা বসিয়েছি।” একই দিনে সংস্কৃত বিভাগের সহকারী অধ্যাপক কুশল বরণ চক্রবর্তীকে প্রশাসনিক ভবনে তিন ঘণ্টা অবরুদ্ধ করে রাখা হয়। এর আগে ২০২৪ সালের ২৩ অক্টোবর ইতিহাস বিভাগের শিক্ষক রন্টু দাশকে হেনস্তার মুখে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়। সর্বশেষ ১০ জানুয়ারি আইন বিভাগের শিক্ষক হাসান মোহাম্মদ রোমানকে ধাওয়া দিয়ে ধরে প্রক্টর কার্যালয়ে সোপর্দ করার ঘটনা ঘটে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে অনুসন্ধানে জানা গেছে, এসব ঘটনার নেতৃত্বে থাকা ব্যক্তিদের অনেকেই চবি শাখা শিবিরের বর্তমান বা সাবেক নেতাকর্মী কিংবা শিবির-সমর্থিত ছাত্রসংগঠনের সঙ্গে যুক্ত। সাম্প্রতিক ঘটনায় নেতৃত্বে থাকা কয়েকজন এবারের চাকসু নির্বাচনে শিবির-সমর্থিত ‘সম্প্রীতির শিক্ষার্থী জোট’ প্যানেল থেকে নির্বাচিত হয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক পরিচয় আড়াল করতে ‘সাধারণ শিক্ষার্থী’ ব্যানার ব্যবহার করে শিক্ষক হেনস্তাকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক চট্টগ্রাম মহানগরের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আখতার কবির চৌধুরী বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় জ্ঞানচর্চার জায়গা। এখানে ‘মব’ সংস্কৃতি ভয়াবহ দৃষ্টান্ত স্থাপন করছে। তাঁর মতে, রাজনৈতিক প্রশ্রয় থাকায় ভুক্তভোগী শিক্ষকরা অভিযোগ জানাতে ভয় পাচ্ছেন, আর প্রশাসনের নীরবতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে।
চাকসুর ভিপি ও চবি শাখা শিবিরের সভাপতি ইব্রাহিম রনি অবশ্য এসব ঘটনাকে ‘শিক্ষার্থীদের প্রতিরোধ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর দাবি, যাদের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীরা অবস্থান নিয়েছে, তারা অতীতে শিক্ষার্থীদের ক্ষতি করেছেন। তদন্ত প্রতিবেদন আসার আগেই ‘শিক্ষার্থীরা তাদের কাজ করছে’এমন বক্তব্য দিয়ে তিনি কার্যত বিচারপ্রক্রিয়ার বাইরে শাস্তিকে যুক্তিযুক্ত করার চেষ্টা করেছেন, যা নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে।
ভুক্তভোগী শিক্ষক হাসান মোহাম্মদ রোমান তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, জুলাই সহিংসতাকালে তিনি কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন না। প্রক্টর হোসেন শহীদ সরওয়ার্দীও স্পষ্ট করেছেন, সহকারী প্রক্টররা শিক্ষার্থী বহিষ্কার বা মামলার বাদী হতে পারেন না; এসব সিদ্ধান্ত প্রাতিষ্ঠানিক কমিটির মাধ্যমে হয়।
তবু সবচেয়ে গুরুতর প্রশ্ন থেকে যায় প্রশাসনের ভূমিকায়। ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার ও উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) জানিয়েছেন, শিক্ষক হেনস্তার বিষয়ে তারা ‘লিখিত অভিযোগ পাননি’। কিন্তু একাধিক প্রকাশ্য ঘটনার পরও কেন স্বতঃপ্রণোদিত তদন্ত হয়নি, এই প্রশ্নের জবাব মেলেনি। শিক্ষকদের নাম প্রকাশে অনীহার মধ্যেই স্পষ্ট, প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তা ‘মব জাস্টিস’-কে উৎসাহিত করছে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপদ পরিবেশকে ভেঙে দিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো শিক্ষক অপরাধ করলে আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় বিচার হওয়াই নিয়ম। কিন্তু দলীয় পরিচয়ের আড়ালে শিক্ষক হেনস্তা চলতে থাকলে চবি শুধু শিক্ষার পরিবেশই হারাবে না, সমাজে ভয়ংকর দৃষ্টান্তও স্থাপন হবে।