২০২৫ সালজুড়ে শিক্ষা খাত কাটিয়েছে একের পর এক অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের নানা দাবিতে আন্দোলন, শিক্ষা সংস্কার ও উন্নয়ন পরিকল্পনার অনুপস্থিতি, শেখার ঘাটতি—সব মিলিয়ে বছরটি ছিল খাতটির জন্য আরেকটি অস্থির অধ্যায়।
শিক্ষার্থীরা সারা বছরই শেখার ঘাটতির সংকটে ভুগেছে। এর পাশাপাশি শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্কের টানাপোড়েন, নতুন জাতীয় শিক্ষাক্রম নিয়ে অনিশ্চয়তা, বিনা মূল্যের পাঠ্যপুস্তক বিতরণে বিলম্ব এবং পাবলিক পরীক্ষায় হতাশাজনক ফলাফল শিক্ষা খাতের প্রধান উদ্বেগ হিসেবে সামনে এসেছে।
শিক্ষাবিদ ও গবেষকদের মতে, ধারাবাহিক সরকারগুলো শিক্ষা খাতকে অবহেলা করে এসেছে এবং ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দায়িত্ব নেওয়া অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও সেই ধারা বদলায়নি। তাঁদের সঙ্গে একমত পোষণ করে সরকারি কর্মকর্তারাও বলছেন, আগামী ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে যে সরকার গঠিত হবে, তার ওপরই শিক্ষা খাতের ভবিষ্যৎ অনেকাংশে নির্ভর করবে।
শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হওয়ার পরও শিক্ষা খাত ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে অস্থিরতা এবং সব স্তরে শিক্ষার্থীদের শেখার ঘাটতি কাটিয়ে ওঠা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থেকেছে।
অন্তর্বর্তী সরকার এ পর্যন্ত ১১টি সংস্কার কমিশন গঠন করলেও শিক্ষা খাত সংস্কারের জন্য কোনো কমিশন গঠন করা হয়নি।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের এমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমেদ বলেন, ২০২৫ সাল শিক্ষা খাতের জন্য খুব একটা সন্তোষজনক ছিল না। তিনি বলেন, “শিক্ষা খাতে সংস্কার ও উন্নয়নের যে প্রত্যাশা ছিল, তার কোনোটিই বাস্তবায়িত হয়নি। ধারাবাহিক সরকারগুলো শিক্ষা খাতকে অবহেলা করেছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও সেই প্রবণতা অব্যাহত ছিল।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বলেন, জুলাই আন্দোলনের পর একটি হালনাগাদ ও প্রাসঙ্গিক শিক্ষানীতি এবং শিক্ষা কমিশনের প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। তিনি বলেন, “গত এক বছরে শিক্ষা খাতে প্রত্যাশিত শিক্ষার পরিবেশ ও ফলাফল আমরা দেখিনি।”
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা অধ্যাপক বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দার বলেন, সামগ্রিকভাবে দেশে অস্থিরতা বিরাজ করায় শিক্ষা খাতেও তার প্রভাব পড়েছে। তিনি বলেন, “শিক্ষক আন্দোলনসহ নানা কারণে শিক্ষা খাতে পরিস্থিতি সবসময় মসৃণ ছিল না।”
২০২৫ সালজুড়ে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন আন্দোলনে উত্তাল ছিল রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা। একাধিকবার এসব আন্দোলনে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে।
জানুয়ারিতে ইবতেদায়ী মাদ্রাসা জাতীয়করণের দাবিতে শিক্ষকরা রাজধানীতে মাসব্যাপী আন্দোলন করেন। একই সময়ে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকরা দশম গ্রেডের দাবিতে আন্দোলনে নামেন।
ফেব্রুয়ারিতে বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের দাবিতে এবং এমপিওভুক্ত বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা বেতন বৃদ্ধি ও জাতীয়করণের দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন। এসব আন্দোলন বছরজুড়েই চলতে থাকে, যার ফলে শিক্ষার্থীদের শেখার ক্ষতি হয়।
ডিসেম্বরে বেতন বৃদ্ধি ও পদোন্নতির দাবিতে দেশের বিভিন্ন সরকারি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষক বার্ষিক পরীক্ষা বর্জন করেন। কোথাও কোথাও অভিভাবক ও অন্যান্য কর্মচারীদের সহায়তায় প্রধান শিক্ষকরা পরীক্ষা নিতে বাধ্য হন।
২৩ ডিসেম্বর সরকার প্রজ্ঞাপন জারি করে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের বেতন দশম গ্রেডে উন্নীত করে। তবে প্রায় ৬৫ হাজার ৫৬৭টি বিদ্যালয়ের মধ্যে এখনো প্রায় ৩২ হাজার বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে।
সহকারী শিক্ষকদের বেতন ১৩তম গ্রেড থেকে ১১তম গ্রেডে উন্নীত করার ঘোষণা দিলেও এ বিষয়ে এখনো কোনো প্রজ্ঞাপন জারি হয়নি। উপদেষ্টা বিধান রঞ্জন বলেন, প্রাথমিক স্তরে কিছু আন্দোলন হলেও উচ্চশিক্ষা স্তরের তুলনায় প্রাথমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো তুলনামূলকভাবে ভালো ছিল।
উচ্চশিক্ষা স্তরে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত সাত সরকারি কলেজ—ঢাকা কলেজ, ইডেন মহিলা কলেজ, বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ, সরকারি তিতুমীর কলেজ, কবি নজরুল সরকারি কলেজ, সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ ও সরকারি বাংলা কলেজ—এর শিক্ষার্থীরা জানুয়ারি থেকে ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠার দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যান।
একই সময়ে মধ্যবর্তী কলেজগুলোর শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের একটি অংশ প্রস্তাবিত বিশ্ববিদ্যালয়ের কাঠামোর বিরোধিতা করে আন্দোলন করেন।
ঢাকা কলেজ, আইডিয়াল কলেজ ও সিটি কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে একাধিক সংঘর্ষ রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কে যান চলাচল ব্যাহত করে এবং জনদুর্ভোগ বাড়ায়।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ২২ ডিসেম্বর ছয়জন ডিন দায়িত্ব পালনে অপারগতা জানিয়ে পদত্যাগ করেন। ফেসবুক পোস্ট ঘিরে শুরু হওয়া ওই আন্দোলনে শিক্ষার্থীরা আওয়ামী লীগপন্থী ‘ফ্যাসিস্ট’ শিক্ষকদের আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ তোলে।
এপ্রিল মাসে পলিটেকনিক শিক্ষার্থীরা চাকরি, পদোন্নতি ও মানসম্মত উচ্চশিক্ষার দাবিতে সারা দেশে সড়ক, মহাসড়ক ও রেলপথ অবরোধ করেন।
সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বহিরাগতদের হামলার প্রতিবাদে কয়েক দিন রেললাইন ও সড়ক অবরোধ করেন।
জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড ২০২৫ সালের শুরুতে সময়মতো পাঠ্যপুস্তক সরবরাহ করতে ব্যর্থ হওয়ায় তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে। এপ্রিল মাসে সব শিক্ষার্থী বই পেলেও ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের সব বই এখনো ১ জানুয়ারি পর্যন্ত সরবরাহ করা সম্ভব হয়নি। শেখার ক্ষতি কমাতে ২৮ ডিসেম্বর ২০২৬ সালের বই অনলাইনে প্রকাশ করা হয়।
২০২৪ সালের সরকার বদলের পর অন্তর্বর্তী সরকার ২০২২ সালের শিক্ষাক্রম বাতিল করে ২০১২ সালের শিক্ষাক্রমে ফিরে যায় এবং ২০২৬ সাল থেকে পরিমার্জিত শিক্ষাক্রম চালুর ঘোষণা দেয়। পরে তা পরিবর্তন করে ২০২৭ সাল থেকে নতুন শিক্ষাক্রম চালুর কথা বলা হয়।
বোর্ডের প্রধান সম্পাদক মুহাম্মদ ফতিহুল কাদির বলেন, নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়ন দীর্ঘ প্রক্রিয়ার বিষয়। তিনি বলেন, “২০২৭ সাল থেকে সব বই প্রস্তুত করে নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়ন সম্ভব নাও হতে পারে।”
অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ সাত কলেজের আন্দোলন, পাঠ্যপুস্তক বিতরণে অনিশ্চয়তা, শিক্ষক বেতন বৈষম্য ও অবকাঠামোগত দুর্বলতাকে বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেন।
তিনি বলেন, “শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং অভ্যুত্থানের পর শুরু হওয়া ‘মব মানসিকতা’ এখনো কাটেনি।”
২০২৫ সালে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাসের হার ছিল ৬৮ দশমিক ৪৫ শতাংশ—যা ১৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাসের হার দাঁড়ায় ৫৮ দশমিক ৮৩ শতাংশ। শহর ও গ্রামাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের ফলাফলে বৈষম্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
প্রাথমিক ও অনানুষ্ঠানিক শিক্ষার মানোন্নয়নে গঠিত সরকারি পরামর্শ কমিটির সুপারিশও বাস্তবায়িত হয়নি বলে অভিযোগ করেন কমিটির প্রধান মনজুর আহমেদ।
উপদেষ্টা বিধান রঞ্জন জানান, শেখার ঘাটতি কমাতে মধ্যাহ্নভোজ কর্মসূচি পুনরায় চালু এবং বিশেষ মূল্যায়ন কার্যক্রম নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, “দেশে প্রকৃত সাক্ষরতার হার ৫০ শতাংশেরও নিচে, যদিও সরকারি হিসেবে সাত বছর বয়সী জনগোষ্ঠীর সাক্ষরতার হার ৭৭ দশমিক ৯ শতাংশ।”