অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার পর শিক্ষা খাতে প্রত্যাশিত সংস্কার বা স্থিতিশীলতা তো আসেনিই, বরং প্রশাসনিক ব্যর্থতা, সিদ্ধান্তহীনতা এবং নেতৃত্বের শূন্যতায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। রুটিন কাজেও ব্যর্থতার নজির তৈরি হয়েছে, যার সবচেয়ে দৃশ্যমান উদাহরণ সময়মতো বিনা মূল্যের পাঠ্যবই বিতরণ করতে না পারা।
দেড় দশকের বেশি সময় ধরে বছরের শুরুতেই প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন বই তুলে দেওয়ার যে ধারাবাহিকতা ছিল, তা ইউ্নূস সরকারের আমলে ভেঙে গেছে। এনসিটিবি ১৫ জানুয়ারির মধ্যে সব বই সরবরাহের প্রতিশ্রুতি দিলেও জানুয়ারি শেষেও ৮৬ লাখের বেশি বই সরবরাহ বাকি ছিল। প্রাথমিক স্তরে বই পৌঁছালেও মাধ্যমিকে ঘাটতি থেকেই গেছে। গত বছরও শিক্ষার্থীদের তিন মাস অপেক্ষা করতে হয়েছিল। শিক্ষাবিদদের মতে, এটি কেবল সরবরাহ ব্যবস্থার ত্রুটি নয়; শিক্ষার ধারাবাহিকতা ও শেখার গতি সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এমন একটি রুটিন কাজ ব্যর্থ হওয়া শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতার স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়। দরপত্র, ছাপা ও বিতরণের পরিকল্পনা অনেক আগেই সম্পন্ন হওয়ার কথা থাকলেও তা হয়নি। ফলে শিক্ষাবর্ষের শুরুতেই শিক্ষার্থীরা অনিশ্চয়তায় পড়েছে।
শুধু বই বিতরণ নয়, নীতিনির্ধারণেও দেখা গেছে অস্থিরতা। শিক্ষা খাতে সংস্কারের প্রত্যাশা তৈরি হলেও বাস্তবে কোনো শিক্ষা কমিশন গঠন হয়নি। অন্য খাতে কমিশন হলেও শিক্ষার মতো মৌলিক খাত উপেক্ষিত থেকেছে। মেয়াদের শেষ প্রান্তে এসে একটি পরামর্শক কমিটি গঠন করা হলেও নির্বাচনের আগে প্রতিবেদন জমা দিলেও তা বাস্তবায়নের সুযোগ নেই যা পুরো প্রক্রিয়াকে কার্যত আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত করেছে।
গোড়াতেই দেখা গেছে প্রশাসনিক দুর্বলতা। এইচএসসি ও সমমানের স্থগিত পরীক্ষাগুলো শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের মুখে বাতিল করে ‘ভিন্ন পদ্ধতিতে’ ফল প্রকাশের সিদ্ধান্ত শিক্ষা ব্যবস্থার নীতিগত ভিত্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন সিদ্ধান্ত দীর্ঘমেয়াদে পরীক্ষার বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট করে এবং শিক্ষাঙ্গনে বিশৃঙ্খলার সংস্কৃতি তৈরি করে।
এর পর থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘মব’ সংস্কৃতি, শিক্ষক হেনস্তা, পদত্যাগ ও প্রশাসনিক চাপের ঘটনা বেড়েছে। শিক্ষকদের ওপর দায় চাপিয়ে সমস্যার সমাধান খোঁজার প্রবণতা শিক্ষা পরিবেশকে আরও নাজুক করেছে।
শিক্ষাক্রম নিয়েও দেখা গেছে পিছু হটা। দায়িত্ব নিয়েই পুরোনো শিক্ষাক্রমে ফিরে যাওয়ার ঘোষণা দেওয়া হলেও ভবিষ্যৎ রূপরেখা নেই। ২০২৭ সাল থেকে পরিমার্জিত শিক্ষাক্রম চালুর কথা বলা হলেও এখন পর্যন্ত কোনো কমিটি বা কাঠামো গঠন হয়নি। যখন বিশ্ব দক্ষতা ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার দিকে এগোচ্ছে, তখন বাংলাদেশ আবারও পুরোনো কাঠামোয় আটকে পড়ছে যা ভবিষ্যৎ মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
প্রশাসনিক নেতৃত্বহীনতাও সংকটকে বাড়িয়েছে। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরে দীর্ঘদিন মহাপরিচালক নেই, নায়েম ও এনসিটিবিতেও নিয়মিত প্রধানের অভাব। গুরুত্বপূর্ণ সংস্থাগুলো কার্যত স্থবির অবস্থায় চলছে। কর্মকর্তাদের ভাষায়, সিদ্ধান্ত গ্রহণে ধীরগতি ও সমন্বয়হীনতা প্রকট।
উচ্চশিক্ষায়ও অনিশ্চয়তা কাটেনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাত কলেজ আলাদা করার সিদ্ধান্ত নতুন জটিলতা তৈরি করেছে। নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের কাঠামো এখনো চূড়ান্ত হয়নি। একইভাবে ইউজিসির পরিবর্তে উচ্চশিক্ষা কমিশন গঠনের উদ্যোগও ঝুলে আছে।
সবচেয়ে মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের অবসর সুবিধা নিয়ে। ২০২১ সালের পর থেকে অনেকেই অবসর ভাতা পাননি। হাজার হাজার কোটি টাকার বরাদ্দ চাওয়া হলেও কার্যকর সমাধান আসেনি। বোর্ড গঠনও হয়নি পূর্ণাঙ্গভাবে।
কিছু বিচ্ছিন্ন পদক্ষেপ—বেতন গ্রেড উন্নয়ন বা নীতিমালা সংশোধন—থাকলেও সামগ্রিক চিত্র হতাশাজনক। শিক্ষাবিদদের মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে অন্তত একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ প্রত্যাশিত ছিল। সেটিও দেখা যায়নি। ফলে শিক্ষা খাতে সংকটের ভার বেড়েছে, আর ভবিষ্যৎ প্রজন্ম পড়েছে অনিশ্চয়তার মুখে।