দীর্ঘ ২৮ বছর পর অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (শাকসু) নির্বাচনে ভোটার হিসেবে নারীদের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য হলেও প্রার্থী হিসেবে তাদের অংশগ্রহণ আশঙ্কাজনকভাবে কম। কেন্দ্রীয় সংসদের মোট ২৩টি পদের বিপরীতে ৯৭ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যার মধ্যে নারী মাত্র সাতজন—শতকরা হিসাবে প্রায় ৭ দশমিক ২ শতাংশ। অথচ মোট ভোটারের প্রায় ৩৫ দশমিক ৬ শতাংশই নারী শিক্ষার্থী।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি শুধু সংখ্যাগত বৈষম্য নয়; বরং বিশ্ববিদ্যালয় রাজনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণে দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সংকটের প্রতিফলন।
নির্বাচন সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় সংসদে ভিপি, জিএস, এজিএসসহ ১৮টি সম্পাদকীয় ও পাঁচটি সদস্য পদে মোট ২৩টি পদ রয়েছে। এর মধ্যে ছাত্রী বিষয়ক সম্পাদক পদে চারজন নারী প্রার্থী থাকলেও বাকি গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্বের পদগুলোতে নারীদের উপস্থিতি প্রায় নেই। প্রথম দিকে ১৫ জন নারী মনোনয়নপত্র তুললেও শেষ পর্যন্ত জমা দিয়েছেন মাত্র সাতজন।
ক্যাম্পাস সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নারী শিক্ষার্থীরা একদিকে পড়াশোনা ও গবেষণায় বেশি মনোযোগী, অন্যদিকে রাজনীতিতে যুক্ত হলে সামাজিক ও পারিবারিক চাপ, নিরাপত্তার শঙ্কা এবং সাইবার বুলিংয়ের মুখোমুখি হতে হয়। শাবিপ্রবি ফটোগ্রাফি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি রুবাইয়া নাসরিন বলেন, রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হলে মেয়েদের ভালো চোখে দেখা হয় না, বরং নানা ধরনের ব্যক্তিগত আক্রমণের শিকার হতে হয়।
আইন ও মানবাধিকার সম্পাদক পদে প্রার্থী তাছমিমা মাহফুজ জেরিন বলেন, অনেক নারী শিক্ষার্থী ইচ্ছাকৃতভাবে সামনে আসতে চান না। তাঁর মতে, শাকসু ধীরে ধীরে শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন না হয়ে দলীয় রাজনীতির একটি কাঠামো হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যা নারীদের আরও দূরে সরিয়ে দিচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক নজরুল ইসলাম মনে করেন, পরিবার ও সমাজের রক্ষণশীল মানসিকতা এখনও বড় বাধা। পাশাপাশি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচনে নারী প্রার্থীদের বিরুদ্ধে অনলাইন ট্যাগিং, স্লাট-শেমিং ও ব্যক্তিগত আক্রমণের ঘটনাগুলোও নারীদের নিরুৎসাহিত করছে।
পলিটিক্যাল স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক জায়েদা শারমিন বলেন, নারী প্রার্থী হলে এক ধরনের বুলিং প্রায় অবধারিত। দীর্ঘদিন ছাত্র সংসদ নির্বাচন না হওয়ায় ক্যাম্পাসে সহনশীল রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অর্থনৈতিক বাস্তবতা—প্রচারণায় টাকা-পয়সার বিষয়টি নারীদের জন্য বাড়তি চ্যালেঞ্জ।
হল সংসদের ক্ষেত্রেও চিত্র ভিন্ন নয়। মেয়েদের তিনটি হল মিলিয়ে মোট ২৭টি পদের বিপরীতে প্রার্থী হয়েছেন ৩১ জন। তবে অধিকাংশ পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা নেই, অনেকেই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হচ্ছেন। দলীয় প্যানেল ঘোষণা না হলেও বেশিরভাগ প্রার্থী নির্দিষ্ট রাজনৈতিক সংগঠনের সমর্থিত বলে জানা গেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, নেতৃত্বে নারীর অনুপস্থিতি শুধু নারী শিক্ষার্থীদের নয়, সামগ্রিকভাবে ছাত্ররাজনীতির প্রতিনিধিত্ব ও বিশ্বাসযোগ্যতাকেও প্রশ্নের মুখে ফেলছে। জাকসু ও রাকসু নির্বাচনের অভিজ্ঞতাও দেখিয়েছে—নিরাপত্তাহীনতা ও হয়রানির সংস্কৃতি ভাঙতে না পারলে বিশ্ববিদ্যালয় রাজনীতিতে নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা কঠিন।
২০ জানুয়ারি অনুষ্ঠেয় শাকসু নির্বাচন সেই সংকট কতটা মোকাবিলা করতে পারে, তা নিয়েই এখন প্রশ্ন উঠছে।