সর্বশেষ

নতুন বছরে বইয়ের গন্ধ নেই, আছে দুর্নীতির ধোঁয়া

এনসিটিবির কারসাজিতে ১ জানুয়ারি বই পাচ্ছে না কোটি শিক্ষার্থী

প্রকাশিত: ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৭:০০
এনসিটিবির কারসাজিতে ১ জানুয়ারি বই পাচ্ছে না কোটি শিক্ষার্থী

নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু হতে আর মাত্র এক দিন বাকি। অথচ ২০২৬ শিক্ষাবর্ষে মাধ্যমিক স্তরের এক কোটির বেশি শিক্ষার্থী এবারও ১ জানুয়ারি নতুন বই হাতে পাচ্ছে না। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) হিসাব অনুযায়ী, মাধ্যমিক স্তরের প্রায় ১৮ কোটি ৩২ লাখ পাঠ্যবইয়ের মধ্যে এখনো প্রায় ৩ কোটি ৮৯ লাখ বই মুদ্রণ বাকি রয়েছে। ফলে ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণির সব শিক্ষার্থী বছরের প্রথম দিনে পূর্ণাঙ্গ পাঠ্যবই পাচ্ছে না যা অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে শিক্ষাব্যবস্থায় অবহেলা ও সংকটকে আবারও নগ্নভাবে সামনে এনেছে।

 

এনসিটিবি জানায়, প্রাথমিক ও ইবতেদায়ি স্তরের বই শতভাগ মুদ্রণ ও সরবরাহ শেষ হলেও মাধ্যমিক স্তরের বই নিয়ে চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে। অষ্টম শ্রেণির অবস্থা সবচেয়ে শোচনীয়—প্রয়োজনীয় বইয়ের অর্ধেকের কিছু বেশি মুদ্রণ হলেও সরবরাহ হয়েছে মাত্র এক-পঞ্চমাংশের কাছাকাছি। সপ্তম শ্রেণিতেও মুদ্রণ ও সরবরাহের অগ্রগতি সন্তোষজনক নয়।

 

এই সংকটের পেছনে মূল কারণ হিসেবে উঠে এসেছে দরপত্র প্রক্রিয়ায় অনিয়ম, পুনঃদরপত্রে দীর্ঘসূত্রতা এবং কাগজ সরবরাহে সিন্ডিকেট বাণিজ্য। বছরের শুরুতেই নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী বই উপজেলা পর্যায়ে পৌঁছানোর লক্ষ্য থাকলেও মে মাসে দরপত্র আহ্বানের পরই প্রক্রিয়া জটিল হয়ে পড়ে। অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ও সুবিধাভোগী কয়েকটি প্রেসকে কাজ পাইয়ে দিতে গিয়ে দরপত্র বাতিল ও পুনঃদরপত্র করা হয়, যার ফলে সময় নষ্ট হয় কয়েক মাস।

 

বিশেষ করে এনসিটিবির সদস্য ড. রিয়াদ চৌধুরীর নেতৃত্বে একটি প্রভাবশালী বলয়ের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, নির্দিষ্ট দুটি বড় প্রেসকে একচেটিয়া কাজ দিতে অস্বাভাবিকভাবে কম দরে দর নির্ধারণ করা হয়। এর ফলে অন্যান্য প্রেস লোকসান সামাল দিতে নিম্নমানের কাগজ ব্যবহারের দিকে ঝুঁকছে, যা বইয়ের গুণগত মান নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে।

 

আরও গুরুতর অভিযোগ হলো কাগজের মান নির্ধারণে কৌশলী কারসাজি। শুরুতে এনসিটিবি কাগজের বাস্টিং ফ্যাক্টর, জিএসএম, অপাসিটি এবং অপটিক্যাল ব্রাইটনিং এজেন্ট (ওবিএ) নিষিদ্ধসহ এমন কঠোর শর্ত আরোপ করে, যা দেশের কোনো পেপার মিলের পক্ষেই একসঙ্গে পূরণ করা প্রায় অসম্ভব। পরে ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণির দরপত্র বাতিল হওয়ার পর হঠাৎ করেই সেই মান শিথিল করা হয়। এতে স্পষ্ট হয়, নির্দিষ্ট কয়েকটি প্রেসকে সুবিধা দিতেই মানদণ্ড বদলানো হয়েছে।

 

প্রেস মালিকদের অভিযোগ, কাগজ কেনায় এনসিটিবি মাত্র পাঁচটি পেপার মিলের কাগজ অনুমোদন দিচ্ছে। টনপ্রতি ৬ থেকে ৭ হাজার টাকা কমিশনের বিনিময়ে এই সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করছে কাগজ সরবরাহ। শুধু মাধ্যমিক স্তরের বই ছাপাতেই প্রায় ৬৫ হাজার টন কাগজ প্রয়োজন, যার মাধ্যমে প্রায় ৪৫ কোটি টাকা কমিশন বাণিজ্য হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

 

গত বছর কাগজ আমদানিতে ২৮ শতাংশ শুল্ক ছাড় দিয়ে ১০ হাজার টন কাগজ আমদানির ঘটনায়ও বড় ধরনের দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। সে ঘটনায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অনুসন্ধান চালালেও সংশ্লিষ্ট কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা রহস্যজনকভাবে রেহাই পান। যদিও চেয়ারম্যান ও সচিব পর্যায়ে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, সদস্য ড. রিয়াদ চৌধুরী এখনো বহাল রয়েছেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয় একাধিকবার তাকে সরানোর ফাইল পাঠালেও তা আটকে থাকার অভিযোগ রয়েছে।

 

এনসিটিবির চেয়ারম্যান দাবি করেছেন, মান রক্ষার্থে যাচাই-বাছাই করায় দেরি হয়েছে এবং জানুয়ারির মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে শতভাগ বই সরবরাহ সম্ভব হবে। তবে শিক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, বছরের শুরুতে বই না পাওয়া শিক্ষার্থীদের পাঠক্রমে সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং প্রতিবছর একই অজুহাতে দেরি হওয়া প্রশাসনিক ব্যর্থতারই প্রমাণ।

 

সব মিলিয়ে, নতুন শিক্ষাবর্ষের শুরুতেই পাঠ্যবই সংকট দেখিয়ে দিচ্ছে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নিয়ম করে ১ জানুয়ারি সকল শিক্ষার্থী বই পেলেও অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে এসে দায়িত্বহীনতা, সিন্ডিকেট ও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে এনসিটিবির বই বিতরণ ব্যবস্থা এক সমাপ্তিহীন সংকটে আটকে গেছে। শিক্ষার্থীদের অধিকার যেখানে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাওয়ার কথা, সেখানে পরপর দুই বছর তাদেরই সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে।

সব খবর

আরও পড়ুন

আত্মীয় নিয়োগের অভিযোগে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে দুদকের হানা

ভিসি-প্রোভিসিদের ভয়াবহ দুর্নীতি আত্মীয় নিয়োগের অভিযোগে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে দুদকের হানা

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে খুলে ফেলা হলো সরস্বতী পূজার শুভেচ্ছা ব্যানার

সনাতন ধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থীদের মাঝে ক্ষোভ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে খুলে ফেলা হলো সরস্বতী পূজার শুভেচ্ছা ব্যানার

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে একের পর এক শিক্ষক হেনস্তার পরও নীরব প্রশাসন

‘সাধারণ শিক্ষার্থী’ নাম দিয়ে শিবিরের মব চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে একের পর এক শিক্ষক হেনস্তার পরও নীরব প্রশাসন

ঢাবির কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে ছাত্রীদের ‘প্রবেশ নিষিদ্ধ’

সিদ্ধান্ত কে দিলো শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন ঢাবির কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে ছাত্রীদের ‘প্রবেশ নিষিদ্ধ’

এইচএসসি নিয়ে ‘অতীব জরুরি’ নির্দেশনা

এইচএসসি নিয়ে ‘অতীব জরুরি’ নির্দেশনা

নেপথ্যে ৫ হাজার কোটি টাকার গাইড বাণিজ্য

প্রতিবছর পাঠ্যবই বিলম্বে ছাপা নেপথ্যে ৫ হাজার কোটি টাকার গাইড বাণিজ্য

অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তায় শিক্ষা খাত

বছর শেষে বাংলাদেশ অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তায় শিক্ষা খাত

প্রাথমিকে নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতি, অসন্তোষ-অস্থিরতার শঙ্কা

প্রাথমিকে নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতি, অসন্তোষ-অস্থিরতার শঙ্কা