দেশের গণমাধ্যম খাতে গত দেড় বছরে নজিরবিহীন অস্থিরতা, চাকরিচ্যুতি, হামলা-মামলা ও ‘মব’ সহিংসতার ঘটনা বেড়েছে বলে জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটির গবেষণা বলছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সাংবাদিকদের জন্য নিরাপদ ও স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ‘কর্তৃত্ববাদ পতন-পরবর্তী দেড় বছর: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি’ শীর্ষক প্রতিবেদনে টিআইবি জানায়, এ সময়ে অন্তত ১৮৯ জন সাংবাদিক চাকরিচ্যুত হয়েছেন এবং ২৯টি গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পর্যায়ে বড় ধরনের রদবদল ঘটেছে। দায়িত্ব পালনকালে হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন ৬ জন সাংবাদিক।
তবে সংশ্লিষ্ট সাংবাদিক সংগঠন ও পেশাজীবী মহলের দাবি, বাস্তব পরিস্থিতি টিআইবির পরিসংখ্যানের চেয়েও অনেক বেশি উদ্বেগজনক। তাদের হিসাব অনুযায়ী, গত দেড় বছরে প্রায় ১,০০০ সাংবাদিক চাকরিচ্যুত হয়েছেন—এর মধ্যে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন বিটিভিতে ৮০ জন এবং বেসরকারি চ্যানেল একাত্তর ও ডিবিসিতে ৬০ জনের বেশি। এছাড়া সারা দেশে অন্তত ৮ জন সাংবাদিক হত্যার শিকার হয়েছেন এবং অর্ধশতাধিক সাংবাদিক বর্তমানে কারাগারে আছেন।
সোমবার রাজধানীতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে টিআইবি জানায়, সরকার সরাসরি নিয়ন্ত্রণ আরোপ না করলেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ও প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তায় ‘মব’ সহিংসতার মাধ্যমে গণমাধ্যম কার্যালয়, সম্পাদকীয় নীতি ও সাংবাদিকদের ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে। প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাকে সংস্থাটি নজিরবিহীন হিসেবে উল্লেখ করেছে।
আগস্ট ২০২৪ থেকে ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত গণমাধ্যমকর্মীদের বিরুদ্ধে ৪৯৭টি হয়রানির ঘটনায় অন্তত ১,১০৪ জন সাংবাদিক ক্ষতিগ্রস্ত হন। বিভিন্ন মামলায় ২০৪ জন সাংবাদিককে আসামি করা হয়েছে এবং অন্তত ৩০ জন গ্রেপ্তার হয়েছেন।
অন্যদিকে সাংবাদিক সংগঠনগুলোর অভিযোগ, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনার’ প্রায় ৩০০ সাংবাদিকের নামে ষড়যন্ত্রমূলক মিথ্যা হত্যা মামলা দেওয়া হয়েছে। ১,০০০ সাংবাদিককে মবের ভয় দেখিয়ে আত্মগোপনে থাকতে বাধ্য করা হয়েছে। প্রায় ২০০ সাংবাদিকের অ্যাক্রেডিটেশন কার্ড বাতিল এবং অর্ধশতাধিকের ব্যাংক হিসাব তলব বা জব্দ করার ঘটনাও ঘটেছে।
জাতীয় প্রেস ক্লাব, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (ডিইউজে), বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইউজে) ও বিভিন্ন প্রেস ক্লাব দখল, অফিস ভাঙচুর, লুটপাট ও কাগজপত্র পোড়ানোর অভিযোগও উঠেছে। এমনকি সংগঠনের নির্বাচিত কমিটিকে পাশ কাটিয়ে শতাধিক সদস্যকে বহিষ্কার বা স্থগিত করার কথাও জানানো হয়েছে।
চার সাংবাদিক—শাকিল আহমেদ, ফারজানা রুপা, মোজাম্মেল বাবু ও শ্যামল দত্ত—১৫ মাসেরও বেশি সময় ধরে কারাগারে রয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। কারাগারে তাদের চিকিৎসা ও মানবিক পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
সাংবাদিক আনিস আলমগীরের ঘটনাকে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরে টিআইবি জানায়, তাকে প্রথমে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে এবং পরে দুর্নীতি দমন কমিশনের মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে—যা সাংবাদিকদের ওপর ‘আইনি চাপ’ সৃষ্টির প্রবণতার দৃষ্টান্ত।
টিআইবি বলছে, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে এখন চারটি ‘হাতিয়ার’ ব্যবহৃত হচ্ছে—হামলা, মামলা, হুমকি ও মব। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া তথ্য, অপপ্রচার, রাজনৈতিক ট্যাগ এবং এআই-নির্ভর ডিপফেইকের ব্যবহার পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে।
রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারসের সূচকেও বাংলাদেশের অবনতি হয়েছে। টিআইবির মতে বাস্তবে স্বাধীনভাবে সাংবাদিকতা করার পরিবেশ এখনও নিশ্চিত হয়নি। গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সুপারিশ ও সাংবাদিক সুরক্ষা আইন বাস্তবায়নে উদ্যোগের অভাবকেও বড় ঘাটতি হিসেবে দেখছে সংস্থাটি।
সার্বিকভাবে টিআইবি মনে করছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আইনের শাসন ও নিরাপত্তা নিশ্চিতে দুর্বলতা এবং রাজনৈতিক সহিংসতার সংস্কৃতি গণমাধ্যমের স্বাধীনতাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।